Image description

মোহাম্মদ সবুজ মিয়া পুরোপুরি সুস্থ-সবল মানুষ, থাকেন সৌদি আরবে। অথচ বাংলাদেশের সরকারি খাতায় তিনি ছিলেন ‘মৃত’। এক সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর পাসপোর্ট নবায়ন করতে গিয়ে কিশোরগঞ্জের এই প্রবাসী জানতে পারেন, তার এনআইডি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ, সরকারি খাতায় তিনি মারা গেছেন।

এনআইডি নতুন করে চালু করতে হোসেনপুর উপজেলা নির্বাচন অফিসের কথামতো তাকে দেশে ফিরে নতুন করে আঙুলের ছাপ দিতে হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় তার খরচ হয়েছে প্রায় চার লাখ টাকা।

ক্ষোভ প্রকাশ করে সবুজ টাইমসকে বলেন, ‘নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করলে ওরা আমাকে বলে, ভুলবশত নাকি এমনটা ঘটেছে। আর তাদের ভুলে আমার পকেট থেকে খসে গেছে চার লাখ টাকা।’

তবে সবচেয়ে তাজ্জব বিষয় হলো—কে আবেদন করে তাকে মৃত বানিয়ে দিল, তার কোনো প্রমাণ বা নথি নির্বাচন অফিসে নেই। সবুজ মিয়া একা নন, এই ভোগান্তির শিকার আরও অনেকে।

২০২৫ সালে ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় কিশোরগঞ্জের ১৩টি উপজেলায় ৪৬ হাজার ৬২২ জনের নাম ‘মৃত’ দেখিয়ে বাতিল করা হয়। আর চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত তাদের মধ্যে অন্তত ২২২ জন মানুষ নিজেদের ‘জীবিত’ প্রমাণ করে ভোটার তালিকায় আবার নাম তুলতে পেরেছেন।

কেউ বয়স্ক ভাতা তুলতে গিয়ে, কেউ জমির দলিল বা খতিয়ান ঠিক করতে গিয়ে, আবার কেউ পাসপোর্ট নবায়ন করতে গিয়ে প্রথম জানতে পারেন—সরকারি খাতায় তারা আর বেঁচে নেই।

নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দিতে হলে পরিবারের লোকজনের দেওয়া তথ্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও সুপারভাইজারদের কয়েক দফায় যাচাই করতে হয়।

কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক ভয়ংকর চিত্র-ভুয়া আবেদনকারী, ভুয়া তথ্য প্রদানকারী এবং জাল স্বাক্ষরের ছড়াছড়ি। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে মূল আবেদনটিই হারিয়ে ফেলেছে নির্বাচন অফিস।

মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর ‘জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস’-এর দিনে ফুটে উঠল এমন গাফিলতি আর অনিয়মের ছবি।

উত্তর মাথখলা এলাকায় ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় সবুজ মিয়াকে ‘মৃত’ দেখানো হয়েছিল।

হালনাগাদের দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষক মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া টাইমসকে জানান, তিনি নিয়ম মেনেই পরিবারের স্বাক্ষর ও স্থানীয় মেম্বারের সিলসহ আবেদন জমা দিয়েছিলেন। আবেদনপত্র হারিয়ে গেলে সে দায় নির্বাচন অফিসের।

 

হোসেনপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আলিমুল রাজি জানান, ওই আবেদনের কোনো নথি অনলাইন বা অফিসে কোথাও নেই। তবে হালনাগাদের সময় দায়িত্বে থাকা আরেক কর্মকর্তা ওসমান গনি স্বীকার করেন, নথি হারিয়ে গেলে নির্বাচন অফিস দায় এড়াতে পারে না।

জাহেরা ও আশরাফকে ‘মৃত’ বানিয়ে কার লাভ?

করিমগঞ্জের ৮৮ বছরের বৃদ্ধা জাহেরা খাতুন বয়স্ক ভাতার টাকা তুলতে গিয়ে দেখেন, তার এনআইডি কাজ করছে না।

অফিসে গিয়ে শোনেন, সরকারি নথিতে ২০২৩ সালের ২৫ জানুয়ারি তিনি নাকি মারা গেছেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, হেলাল উদ্দিন নামে এক লোক নিজেকে জাহেরার ভাই পরিচয় দিয়ে তাকে মৃত দেখানোর আবেদন করেছিলেন। অথচ জাহেরা তাকে চেনেনই না।

আবেদনপত্রে ২ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার জসিম উদ্দিনের স্বাক্ষর ছিল। তবে মেম্বার টাইমসকে জানান, ওই স্বাক্ষর তার নয়, জালিয়াতি করা হয়েছে।

অন্য শনাক্তকারী শিক্ষক কামাল উদ্দিনের দাবি, স্বাক্ষরগুলো খাঁটিই ছিল। এখন বিপদে পড়ার ভয়ে সবাই দায় এড়াতে অস্বীকার করছেন।

জাহেরার ছেলে আসাদ প্রশ্ন তোলেন, ‘সবাই যদি অস্বীকার করে, তবে আমার মাকে সরকারি খাতায় মারল কে?’

জাহেরা জানান, বাপের বাড়ির ১২ একর জমির বড় একটা অংশ তার পাওয়ার কথা। জমি থেকে বঞ্চিত করতেই তার ভাইয়েরা এমন চক্রান্ত করেছেন বলে তার সন্দেহ। তবে এ বিষয়ে তার ভাইদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

একই অভিজ্ঞতা কিশোরগঞ্জ সদরের আশরাফ উদ্দিন আসাদের। জমির খাজনা দিতে গিয়ে শোনেন, তিনি ২০১৯ সালে মারা গেছেন।

আশরাফ জানান, যিনি তাকে মৃত হিসেবে শনাক্ত করেছেন, তাকে তিনি চেনেনও না।

তদন্তে জানা যায়, নাগুয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হালিমা খাতুন নিজেকে প্রতিবেশী পরিচয় দিয়ে আশরাফকে মৃত দেখানোর আবেদনে সই করেন। সেই ফরমে কোনো জনপ্রতিনিধির নাম বা সিল ছিল না।

আশরাফের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে তার জমি দখলের চেষ্টা করছে। জমি বিক্রি করাতে না পেরে, তিনি যেন জমি কাউকে লিখে দিতে না পারেন—সে জন্যই তাকে নথিপত্রে মেরে ফেলা হয়েছে।

শিক্ষিকা হালিমা এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি। তবে তার স্বামী নাজমুল হকের দাবি, পাশের বাড়িতে তাদের ঘর থাকায় স্ত্রী প্রতিবেশী হিসেবে সই করেছিলেন। আশরাফের আত্মীয়রাই নাকি এসে মৃত্যুর খবর দিয়েছিল, আর তাদের এনআইডি না থাকায় বাধ্য হয়ে তার স্ত্রী সই করেন।

কিশোরগঞ্জ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম টাইমসকে জানান, ভুয়া তথ্যদাতাদের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন। আর নির্বাচন অফিসের কোনো কর্মীর গাফিলতি বা দুর্নীতি পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অশোক সরকার টাইমসকে জানান, ‘পুরো ঘটনাটি গভীরভাবে তদন্ত করা দরকার। একজন জ্যান্ত মানুষকে ভুয়া তথ্যে মৃত বানানো স্পষ্টত একটি ফৌজদারি অপরাধ। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পুরো সুযোগ রয়েছে।’

 

 

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোর্শেদ আলম টাইমসের কাছে স্বীকার করেন, অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে ভুয়া তথ্য ধরা সম্ভব হয় না।

তিনি বলেন, ‘কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের কারণে এটা ঘটে। আবার কখনো কিছু মানুষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে এমনটা করে থাকে।’