Image description

ঢাকা ও দেশের কয়েকটি জেলার ব্যবসায়ীরা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে বোতলজাত সয়াবিন তেল পাচ্ছেন না। সরবরাহ কমে যাওয়ায় তার প্রভাব পড়ছে ভোক্তা পর্যায়েও।

কোম্পানিগুলো আবারও ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে সরকারের প্রতি। অন্যদিকে গত এক সপ্তাহে ঢাকায় খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম এরই মধ্যে বেড়ে গেছে।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, কোম্পানিগুলো চাহিদা অনুযায়ী বোতলজাত তেল সরবরাহ করছে না। ডিলাররা তাদের জানিয়েছেন, কোম্পানিগুলো আবারও দাম বাড়াতে চায়।

তবে বাজারভেদে এই সংকটের মাত্রা ভিন্ন।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে গত ৩ সেপ্টেম্বর সরকার বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা দাম লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করে।

এর আগেও প্রায় দুই মাস ধরে সরবরাহ কম ছিল। দাম সমন্বয়ের পর কিছুদিন সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলেও এখন আবার তা কমে গেছে।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ২৯ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১ দশমিক ০৫ শতাংশ বেড়ে লিটারপ্রতি ১৮৬-১৯৫ টাকা থেকে গতকাল ১৯০-১৯৫ টাকায় উঠেছে। খোলা পাম তেলের দাম বেড়েছে শূন্য দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং ১৭০-১৭২ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৭০-১৭৫ টাকা।

কোম্পানিগুলো আবারও দাম বাড়াতে চায়

গত ২০ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যসচিবকে দেওয়া এক চিঠিতে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড ভেজিটেবল ফ্যাট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, ৩ সেপ্টেম্বর দাম সমন্বয়ের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম ছিল টনপ্রতি প্রায় ১ হাজার ২৭০ ডলার। এতে বোতলজাত সয়াবিন তেলের ব্যয় পড়ছিল লিটারে প্রায় ২২১ টাকা। গত ছয় মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়ে টনপ্রতি প্রায় ১ হাজার ২০০ ডলার থেকে বর্তমানে ১ হাজার ৩২৫ ডলারে উঠেছে। এতে তেলের ব্যয় বেড়ে লিটারে প্রায় ২৩৩ টাকা হয়েছে।

সংগঠনটি বলেছে, সরকার ‘খুব অল্প সময়ের মধ্যে’ আবারও দাম সমন্বয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই আশ্বাস ও সরকারের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে দেশীয় সরবরাহ বজায় রাখতে সংগঠনের সদস্যরা উল্লেখযোগ্য লোকসান দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তারা সতর্ক করে বলেছে, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সময়মতো দাম সমন্বয় না করা হলে আমদানিকারকেরা ভোজ্যতেল আমদানিতে আগ্রহ হারাতে পারেন, যা ভবিষ্যতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ও স্বাভাবিক আমদানি নিশ্চিত করতে তারা দ্রুত দাম পুনর্নির্ধারণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

সরবরাহে ঘাটতি

ঢাকার পল্লবীর দোকানদার নুরুল আলম সিকদার জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। চলতি মাসের শুরুতে দাম বাড়ার আগেও এমন সংকট শুরু হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘আমার এক লিটারের এক কার্টন বোতল দরকার, কিন্তু পাচ্ছি মাত্র আধা কার্টন।’

চিনি ও ভোজ্যতেলের পাইকারি বাজার মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ী আবুল হাসেমও একই পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘শুধু মেঘনা গ্রুপ সরবরাহ স্বাভাবিক রেখেছে। এ অবস্থা আরও কয়েক দিন চললে বাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে।’

একটি শীর্ষস্থানীয় সুপার শপের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রায় ২০ দিন ধরে ‘আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম সরবরাহ পাচ্ছি।’

২৮ সেপ্টেম্বর ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে মীনা বাজারের আউটলেটে সরেজমিনে দেখা যায়, সয়াবিন তেল বিক্রির তাকে লেখা রয়েছে, ‘প্রতি কাস্টমার সর্বোচ্চ ২ পিস ৫ লিটারের সয়াবিন তেল কিনতে পারবেন।’

মীনা বাজারের এই আউটলেটের এক কর্মী জানান, চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। তবে এ বিষয়ে তিনি আর কোনো তথ্য জানাতে চাননি।

কারওয়ান বাজারের ভোজ্যতেলের পাইকার আবু বকর সিদ্দিক বলেন, কমে যাওয়া মুনাফার মার্জিনও সংকটের পেছনে ভূমিকা রাখছে। সর্বশেষ দাম বাড়ানোর পর এক ও দুই লিটারের বোতলে আগের তুলনায় মুনাফা কমে গেছে। ফলে অনেক খুচরা বিক্রেতা এসব পণ্য কিনতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন।

রাজশাহীর সাহেব বাজারের খুচরা বিক্রেতা অম্লান সরকার জয় বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর থেকে সরবরাহ কমেছে। ‘আমার ৫০ কার্টন প্রয়োজন হলে পাচ্ছি মাত্র ২০ কার্টনের মতো।’

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ও প্রধান হিসাব কর্মকর্তা এসএম মুজিবুর রহমান জানান, তারা বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রেখেছেন।

তিনি বলেন, ‘তবে দু-একটি বড় কোম্পানি বিভিন্ন কারণে চাহিদা মেটাতে পারছে না, যার ফলে এই সংকট তৈরি হয়েছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকটি বড় ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গত ছয়-সাত মাস ধরে তারা প্রতি লিটার বোতলজাত ভোজ্যতেল বিক্রিতে ১৮-১৯ টাকা করে লোকসান দিচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই, আমি লোকসান যতটা সম্ভব কম রেখে ব্যবসা চালাতে চাইব। সেজন্য সরবরাহ পরিস্থিতি এখন ভিন্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক।’

(দ্য ডেইলি স্টারের রাজশাহী সংবাদদাতা সোহানুর রহমান রাফি প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন)