ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহজনিত দুর্যোগের পর পুনর্গঠনে ঋণের পরিবর্তে পর্যাপ্ত অনুদানভিত্তিক আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ওপর নতুন করে ঋণের বোঝা চাপিয়ে পুনর্গঠন করা উচিত নয়।
শাহ জানান, গত আগস্টের ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহজনিত দুর্যোগে অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ৬ হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দুর্যোগের পর নেপালের পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে প্রয়োজন হতে পারে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থ।
জাতিসংঘে শাহ বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান ০.১ শতাংশেরও কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশটি ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে পড়ছে। হিমবাহ, পাহাড়ি ঢাল, নদী ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নেপালের মতো দেশের পুনর্গঠনে শুধু ঋণের ওপর নির্ভর করা নতুন অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করবে। তাই লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডসহ আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন দ্রুত ও সহজে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর কাছে পৌঁছানোর আহ্বান জানান তিনি।
তিনি একই সঙ্গে নেপাল, ভারত ও চীনের মধ্যে ‘হিমালয়ান ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স ম্যাকানিজম’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। এর আওতায় স্যাটেলাইট তথ্য বিনিময়, হিমবাহ হ্রদ পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সীমান্তপাড়ের সমন্বয়ের কথা বলেছেন তিনি।
এর এক দিন আগে জাতিসংঘের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালও আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন দ্রুত ও সহজ করার আহ্বান জানান। তিনি লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডকে আরও পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য করার দাবি জানান।
বন্যার ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় নেপাল জাতিসংঘের লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার চেয়েছে। তবে এই অর্থ এখনো চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়নি। এর আগে নেপালের অন্য একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে একই তহবিল থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার অনুমোদিত হয়েছিল। ফলে আগের অর্থায়ন ও আগস্টের বন্যার জন্য চাওয়া নতুন ২০ মিলিয়ন ডলারকে আলাদা বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তার অংশ হিসেবে ২৩ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাংক নেপালের জরুরি বন্যা মোকাবিলা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সেবা পুনরুদ্ধারে সর্বোচ্চ ১৭০ মিলিয়ন ডলার জরুরি অর্থায়ন দেওয়ার ঘোষণা দেয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই অর্থ সরকারের তাৎক্ষণিক সাড়া এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সেবা পুনরুদ্ধারে ব্যবহার করা হবে।
আজ নিউ ইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। বৈঠকে আলবানিজ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নেপাল এবং নিখোঁজ অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। নেপালের পুনরুদ্ধারে অস্ট্রেলিয়ার সহায়তার বিষয়টিও বৈঠকে উঠে আসে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রও চলতি সপ্তাহে নেপালের বন্যা পুনরুদ্ধারে ৩১ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে বন্যা-পরবর্তী সময়ে নেপালের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মোট সহায়তার পরিমাণ ৩৬ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নেপালের বর্তমান দাবির মূল বিষয় হলো—দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠনে নতুন ঋণের পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক সহায়তা, দ্রুত জলবায়ু অর্থায়ন এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তি ও তথ্যভিত্তিক সহযোগিতা।