কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা ঘিরে দলটির ‘চাঙ্গা’ নেতাকর্মীরা নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই ঝটিকা মিছিলের মতো কর্মসূচি পালন করছেন। তবে ডিসেম্বর ঘিরে দলটিকে এ ধরনের কর্মসূচি পালনে ন্যূনতম ছাড় দিতে রাজি নয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর যে কোনো ধরনের তৎপরতা ঠেকাতে পুলিশ মাঠ পর্যায়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
পুলিশের নানা স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিসেম্বর ঘিরে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যন্ত আওয়ামী লীগ, দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কোনোভাবেই তারা যাতে প্রকাশ্যে বা গোপনে কোনো তৎপরতা চালাতে না পারে, সেজন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্লক রেইড থেকে শুরু করে চেকপোস্ট এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযানও চালানো হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেছেন, শুধু ডিসেম্বরের বিষয়টি নয়, যাতে কোনো সময়েই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হতে না পারে, সেজন্য সারা দেশেই মাঠ পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো দল বা সংগঠনের কেউ যাতে কোনো ধরনের ঝটিকা মিছিল বা আইনশৃঙ্খলা বিনষ্ট করতে না পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা রয়েছে এবং পুলিশ সে অনুযায়ী কাজ করছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ ওসমান গণি কালবেলাকে বলেন, কাউকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে দেওয়া হবে না। কেউ ঝটিকা মিছিল বা এ ধরনের অপতৎপরতা চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটালে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ সূত্র এবং আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের গ্রেপ্তার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। গত জুলাইয়েও অনেক নেতা নিজের বাড়িতে অবস্থান করা শুরু করলেও চলতি সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে গ্রেপ্তার আতঙ্কে ফের আত্মগোপনে চলে গেছেন। তাদের অনেকেই দিনে এলাকায় সতর্ক অবস্থায় চলাফেরা করলেও রাতে বাসাবাড়িতে থাকছেন না।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তারের পর আদালতে তাদের জামিন আবেদনসহ আইনি বিষয় দেখভাল করা ঢাকার আদালতের বেশ কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে দলটির নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তার হলেও মাঝেমধ্যেই তাদের জামিনে মুক্তির অনুমতি মিলত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই সুযোগটা কমে এসেছে। এখন খুব একটা জামিন মিলছে না। তারা ধারণা করছেন, আগাম ডিসেম্বর পর্যন্ত হয়তো জামিনেও কড়াকড়ি হবে।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পক্ষে আইনি লড়াই করা একজন আইনজীবী কালবেলাকে বলেন, চিহ্নিত নেতাদের জামিন আগেও হয়নি। কারও কারও জামিন করা গেলেও শ্যোন অ্যারেস্টের কারণে কারাগার থেকে বের হতে পারতেন না। তবে মাঝেমধ্যে কর্মীদের বা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের জামিন হলেও সেটা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এবং দলটির সাবেক সংসদ সদস্যদের কয়েকজন দেশেই আত্মগোপনে রয়েছেন। সম্প্রতি তাদের মধ্য থেকে অবস্থান শনাক্ত করে গত ২২ সেপ্টেম্বর গুলশান থেকে চট্টগ্রাম-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরের দিনই রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় নেত্রকোনা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোশতাক আহমেদ রুহিকে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, বেশ কয়েক মাস এ ধরনের গ্রেপ্তার বন্ধ ছিল। কিন্তু কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা দেওয়ার পর নেতাকর্মী ও অনুসারীরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে তাদের অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করছিল। এ অবস্থায় পুলিশ বসে থাকতে পারে না। কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চেষ্টা করলে ন্যূনতম ছাড় দেওয়া হবে না, সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক দুই এমপিকে গ্রেপ্তার করে সেই বার্তাটাই দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে গেলে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগসহ শত শত মামলা হয়। এসব মামলার মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে অন্তত একটি মামলায় তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়। এরপরও দলটির নেতাকর্মীরা মনে করছেন, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশে ফিরবেন।
আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের অন্তত দুজন নেতা কালবেলাকে বলেছেন, তাদের নেত্রী ঘোষণা অনুযায়ী দেশে ফিরবেন। এজন্য নেতাকর্মীরা নানা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নানা কার্যক্রম চলছে। তারা মনে করছেন, ‘রাজনৈতিক’ কার্যক্রম চালাতে গেলে তাদের নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তার বা হামলার শিকার হতে পারেন, এসব বিষয় মেনেই তারা তা করছেন।
ওই নেতাদের দাবি, শুধু আওয়ামী লীগ বা অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাই নয়, সাধারণ মানুষও দিন দিন তাদের কার্যক্রমে সমর্থন জোগাচ্ছে। এতে তাদের মিছিল থেকে শুরু করে কার্যক্রমগুলো আরও দীর্ঘ হবে।
জেলা পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের পর অনেকে আত্মগোপনে এবং কেউ কেউ নিষ্ক্রিয় থাকলেও তাদের নেত্রীর ‘দেশে ফেরার’ ঘোষণায়’ প্রায় সবাই রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে তারা মনে করছেন, সক্রিয়া থাকা এতসংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থকদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো প্রায় অসম্ভব।
এদিকে মাঠ পুলিশের নানা স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের ঝটিকা মিছিলের কারণে থানার ওসিরা বেশ বিপাকে রয়েছেন। ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশ রয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দলটি যে এলাকায় তাদের অপতৎপরতা চালাবে ওই এলাকার দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাদের এর জবাব দিতে হবে। এজন্য থানা পুলিশের ওপর চাপ বেড়েছে। দৈনন্দিন থানা এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি নিজ নিজ এলাকায় আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ঠেকাতে তাদের সতর্ক অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। এ জন্য এলাকা ধরে ধরে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের তৎপরতার দিকে নজরদারি করতে হচ্ছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছোট আকারে ঝটিকা মিছিল করে আসছে। মূলত গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানের মতো এলাকায় বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী নিয়ে দলটি দীর্ঘসময় ধরে মিছিল করার পর নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর ‘শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে’ ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি রাকিবুল হাসানের নামে একটি ভয়েস রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আরও সতর্ক হয় পুলিশ প্রশাসন। আওয়ামী লীগের তৎপরতা ঠেকাতে নানা ফাঁকফোকর বেরিয়ে আসে। এরপরই আরও বেশি কঠোর হন পুলিশের কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে গুলশান থানার ওসি এবং গুলশান বিভাগের ডিসিকে তাদের পদ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসিকে। এ ঘটনার পর সব থানার পুলিশই আরও বেশি সতর্ক হয়ে গেছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অপতৎপরতা ঠেকানোর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজধানীজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর এলাকা ও এর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এমনকি ফ্লাইওভারেও চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে। যে কোনো সময়ের চেয়ে সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে চেকপোস্ট বসিয়ে বেশি নজরদারি করা হচ্ছে। বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক তৎপরতা প্রতিরোধে মোটরসাইকেলসহ সন্দেহজনক যানবাহনে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
ডিএমপির একজন কর্মকর্তা বলেন, রাজধানীতে পিকেট ডিউটি জোরদার করা হয়েছে। থানা পুলিশের মোবাইল প্যাট্রল, ফুট প্যাট্রল ও হোন্ডা প্যাট্রলের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। যে কোনো বড় ধরনের অপরাধ বা নাশকতা প্রতিরোধে থানা পুলিশের পাশাপাশি মাঠে ডিবি টিম, সিটিটিসি টিম এবং এপিবিএন টিম মোতায়েন রাখা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, ঝটিকা মিছিলের পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়তা বাড়িয়ে নিজেদের অবস্থান জানানোর চেষ্টা করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও পুলিশের সাইবার ইউনিটগুলো নজরদারি বাড়িয়েছে।
অবশ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা তৎপরতার মধ্যেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতাকর্মীদের তৎপরতাও থেমে নেই। গত রোববার কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের ‘লকডাউন’ কর্মসূচির আগে ও পরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গাড়িতে আগুন ও বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়লেও গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর ভাটারা এলাকায় ঝটিকা মিছিল করতে দেখা গেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটিকে। গতকাল শুক্রবারও মহাখালী এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ ঝটিকা মিছিল করে।
ডিএমপি কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশ বসে নেই। কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির ঝটিকা মিছিলসহ নানা অপতৎপরতার অনেকগুলোই আগেভাগে ঠেকানো হচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীর ২৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হাসান ইমনের বাসা থেকে অন্তত ৯ হাজার মুখোশ ও ককটেল তৈরির জন্য মজুত করা বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক জব্দ করা হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ঢাকা মহানগর যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম প্রিভেনশন- সাউথ) মো. তোফায়েল আহমেদ মিয়া বলেন, ঝটিকা মিছিল ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সময় যাতে মিছিলকারীদের চেহারা শনাক্ত করা না যায়, সেজন্য এসব মুখোশ মজুত করা হয়েছিল।