বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি হিসেবে আলোচনায় আসেন। এরপর দলের কেন্দ্রীয় সাহিত্য সম্পাদক, শিক্ষা ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং দপ্তর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চলতি বছরের জন্য কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হয়েছেন। সম্প্রতি তিনি এসেছিলেন এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আলাপনে। কথা বলেছেন ছাত্ররাজনীতি এবং সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর।
এশিয়া পোস্ট: আপনি একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের সভাপতি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কেন্দ্রীয় সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন এবং বর্তমানে সেক্রেটারি জেনারেল। সব মিলিয়ে এই সময়টা কেমন কাটছে?
সিবগাতুল্লাহ সিবগা: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগের পরিস্থিতি ছিল একটি ফ্যাসিবাদী শাসনামল। তখন মানুষের কোনো মৌলিক অধিকার ছিল না। সেই কঠিন সময়েও আমাদের রাজপথে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়েছে, জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হয়েছে এবং দেশব্যাপী আন্দোলন গোছাতে হয়েছে। ফ্যাসিবাদী সরকার আমাদের খুঁজে বেড়িয়েছে, জেলে পুরেছে এবং নির্যাতন চালিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে শিবিরের ট্যাগ দিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন চালানো এবং থানায় সোপর্দ করা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। তবে এই পরিস্থিতি আমাদের জন্য নতুন ছিল না। আমরা জানতাম, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে।
বিপ্লবের পর পরিস্থিতি ভিন্ন হয়েছে। জুলাই বিপ্লবে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঐতিহাসিক ভূমিকা সাধারণ শিক্ষার্থী ও জনগণ অনুধাবন করেছেন। ফলে এখন শিবিরের প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আগে আমাদের কার্যক্রম এক ধরনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে পরিচালনা করতে হতো। এখন আমরা উন্মুক্তভাবে সবার কাছে পৌঁছাতে পারছি। দেশব্যাপী এ প্লাস সংবর্ধনা, নবীনবরণসহ বিভিন্ন শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচির মাধ্যমে আগামীর নেতৃত্বের কাছে যাওয়ার এবং তাদের সঙ্গে স্বপ্ন ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে ছাত্রশিবিরের কার্যক্রম অনেকটাই সীমাবদ্ধতার মধ্যে ছিল। উন্মুক্তভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হওয়ার পর সংগঠনের কার্যক্রমের কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না?
সিবগাতুল্লাহ সিবগা: আগের ও বর্তমান পরিস্থিতির মূল তফাত হলো, আগে সরকারের লেলিয়ে দেওয়া প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্র সরাসরি আমাদের বিরুদ্ধে ছিল, যদিও জনগণ সবসময়ই আমাদের সঙ্গে ছিল। বর্তমানে সাধারণ শিক্ষার্থী ও জনগণ উন্মুক্তভাবে আমাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন।
সংগঠনে বড় পরিবর্তন এসেছে কাজের পরিধিতে। আগে আমাদের সাংগঠনিক পরিসরের মধ্যেই বেশি ব্যস্ত থাকতে হতো। এখন সরাসরি জনপরিসরে ভূমিকা রাখতে হচ্ছে। যেমন— সম্প্রতি সরকারি চাকরিতে ভাইভার নম্বর ৪০০ করার যে চক্রান্ত হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে শিবির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। একইভাবে এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কুক্ষিগত করার চক্রান্তের বিরুদ্ধেও আমরা সোচ্চার হয়েছি। আমাদের মূলনীতি হলো, শিক্ষার্থীদের অধিকার যেন কোনোভাবেই খর্ব না হয়, সে বিষয়ে সোচ্চার থাকা।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই অভ্যুত্থানের আগে এবং পরে আপনার সাংগঠনিক দায়িত্ব ও কাজের ধরনে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে?
সিবগাতুল্লাহ সিবগা: জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আমি সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। পরবর্তীতে শিক্ষা ও প্রকাশনা সম্পাদক, দপ্তর সম্পাদক এবং চলতি বছর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।
জুলাই অভ্যুত্থানের আগের পরিস্থিতি ছিল একটি ফ্যাসিবাদী শাসনামল। তখন মানুষের কোনো মৌলিক অধিকার ছিল না। সেই কঠিন সময়েও আমাদের রাজপথে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়েছে, জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হয়েছে এবং দেশব্যাপী আন্দোলন গোছাতে হয়েছে। ফ্যাসিবাদী সরকার আমাদের খুঁজে বেড়িয়েছে, জেলে পুরেছে এবং নির্যাতন চালিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে শিবিরের ট্যাগ দিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন করা এবং থানায় সোপর্দ করা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। তবে সেই পরিস্থিতি আমাদের জন্য নতুন ছিল না। কারণ, আমরা জানতাম দীর্ঘসময় ধরে আমাদের কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে।
বিপ্লবের পর পরিস্থিতি ভিন্ন। জুলাই বিপ্লবে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঐতিহাসিক ভূমিকা সাধারণ শিক্ষার্থী ও জনগণ অনুধাবন করেছে। ফলে এখন শিবিরের প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আগে আমাদের কার্যক্রম একপ্রকার সীমাবদ্ধতার মধ্যে করতে হতো, কিন্তু এখন আমরা উন্মুক্তভাবে সবার কাছে পৌঁছাতে পারছি। দেশব্যাপী এ প্লাস সংবর্ধনা, নবীনবরণসহ নানা শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচির মাধ্যমে আগামীর নেতৃত্বের কাছে যাওয়ার এবং তাদের সঙ্গে স্বপ্ন ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন ক্যাম্পাস ও ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিজয় এসেছে। শিক্ষার্থীদের কাছে এই গ্রহণযোগ্যতা তৈরির পেছনে আপনাদের কৌশল কী ছিল?
সিবগাতুল্লাহ সিবগা: ছাত্র সংসদগুলোতে শিবিরের জয়ের পেছনে মূল কারণ হলো, সাধারণ শিক্ষার্থীরা আমাদের বিশ্বাস করেছে এবং আমরা কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছি যে আমরা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত কল্যাণ চাই।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ও আমাদের লক্ষ্য ছিল দেশে একটি মৌলিক পরিবর্তন আনা, নিজেদের কোনো দলীয় সংকীর্ণ স্বার্থ হাসিল করা নয়। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও আমরা ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মূল চাহিদাগুলো বোঝার চেষ্টা করেছি এবং সে অনুযায়ী নিজেদের পুনর্গঠন করেছি। অন্য অনেক ছাত্র সংগঠন দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকে, যা সাধারণ শিক্ষার্থীরা পছন্দ করে না। আমরা দলীয় সংকীর্ণতা পরিহার করে শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করাকেই বড় অর্জন মনে করেছি। এই সততা ও কাজের কারণেই শিক্ষার্থীরা আমাদের ওপর আস্থা রেখেছে।
বাংলাদেশে অনেক ছাত্র সংগঠন আছে, কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের কল্যাণে তাদের দৃশ্যমান বা কার্যকর কোনো কর্মসূচি নেই। তারা কেবল প্রচলিত ধারার রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ। শিবিরকে আমি ‘ইউনিক’ বা ‘ফুল প্যাকেজ’ বলি। কারণ, এখানে একজন শিক্ষার্থীর একাডেমিক ভালো ফলাফল, উচ্চশিক্ষা, ক্যারিয়ার বা উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। আমরা সারাদেশে মেধা লালন করার জন্য এ প্লাস সংবর্ধনা দিচ্ছি, ক্রেস্ট ও বই দিয়ে উৎসাহ দিচ্ছি। অন্যদের মধ্যে এই উদ্ভাবনী চিন্তা নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় অন্য অনেক সংগঠন ঠিকমতো নবীনবরণও আয়োজন করতে পারে না, অনেক সময় নিজেদের মধ্যে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা সহজেই বুঝতে পারে কারা সুশৃঙ্খল আর কারা উগ্র। তাই অন্যদের ব্যর্থতা এবং শিবিরের শিক্ষার্থীবান্ধব কাজের কারণেই এই পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: বলা হয়ে থাকে, যে দল ক্ষমতায় থাকে, তাদের ছাত্র সংগঠনই ছাত্র সংসদে জয়ী হয়। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সামনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ডাকসুসহ অন্যান্য ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আপনারা নিজেদের সম্ভাবনা কীভাবে দেখছেন?
সিবগাতুল্লাহ সিবগা: আগামী দিনে আমাদের সম্ভাবনা আরও অনেক বেশি। কারণ, এর আগে সাধারণ শিক্ষার্থীরা শিবিরকে ছাত্র সংসদ পরিচালনা করতে দেখেনি। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ইতিমধ্যে পাঁচটি ছাত্র সংসদে শিবির যেভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তা শিক্ষার্থীদের সামনে একটি দৃষ্টান্ত বা মডেল তৈরি করেছে। এখন আমাদের কাজ দেখানোর সুযোগ হয়েছে। তাই আগামীতে ডাকসুসহ অন্যান্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে শিবির অতীতের চেয়েও বিপুল জনরায় পাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, অনেকেই মনে করেন অন্তর্বর্তী সরকারে বা রাষ্ট্রযন্ত্রে বিএনপির ব্যাপক প্রভাব থাকা সত্ত্বেও প্রতিকূল পরিবেশে শিবির জয়ী হয়েছে। আর বিএনপির ইতিহাস হলো, তারা কখনো ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ পছন্দ করেনি। ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তারা ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ করে দিয়েছিল। তারা ক্যাম্পাসে গণতন্ত্রের চর্চা করে না।
এশিয়া পোস্ট: কোচিং সেন্টার, মেস কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে জোরপূর্বক সদস্য বানানোর অভিযোগ শিবিরের বিরুদ্ধে প্রায়ই তোলা হয়। আপনাদের সদস্য হওয়া প্রক্রিয়া কী আসলে?
সিবগাতুল্লাহ সিবগা: জোর করে কাউকে কোনো আদর্শে আনা যায় না বা সংগঠনে যুক্ত করা যায় না। ইসলামী ছাত্রশিবির ওপেন নীতিতে বিশ্বাস করে। আমাদের মূল পাঁচ দফার একটি হলো শিক্ষার্থীদের সমস্যার সমাধান করা। দেশের শিক্ষা বাজেটের ঘাটতি, ক্যাম্পাসের আবাসন সমস্যাসহ নানা বিষয়ে আমরা কাজ করি।
যারা আমাদের আদর্শকে ভালোবাসেন, আমাদের মূল নীতি ও মৌলিক বইপত্র পড়ে বুঝে-শুনে স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসেন, তাদেরই আমরা সংগঠনে স্বাগত জানাই। না বুঝে হুট করে শিবির করা সম্ভব নয়। ফলে জোর করে বা গোপনে সদস্য বানানোর অভিযোগটি সম্পূর্ণ অবান্তর।
এশিয়া পোস্ট: জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন কর্মসূচিতেও শিবিরের উপস্থিতি দেখা যায়। এরপরও আপনারা বলে থাকেন ছাত্রশিবির ‘লেজুড়বৃত্তি করে না। বিষয়টা যদি ব্যাখ্যা করতেন?
সিবগাতুল্লাহ সিবগা: ইসলামী ছাত্রশিবির সবসময় জাতীয় স্বার্থে নিজস্ব সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে রাজপথে নামে। অতীতে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি যখন যৌক্তিক দাবি নিয়ে রাজপথে ছিল, আমরা তাদের সমর্থন জানিয়েছি। তার মানে এই নয় যে আমরা বিএনপির অঙ্গসংগঠন হয়ে গিয়েছিলাম।
বর্তমানে সরকার যদি কোনো বিষয়ে ব্যর্থ হয় বা জনগণের অধিকার কেড়ে নিতে চায়, তাহলে তার প্রতিবাদ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এই মুহূর্তে ১১ দলসহ অন্য যারা জনগণের অধিকার আদায়ে সোচ্চার, আমরা তাদের যৌক্তিক দাবিকে সমর্থন করি। রাষ্ট্র গঠনে প্রয়োজনে তারেক রহমান বা বিএনপির যে কোনো ভালো উদ্যোগে অবদান রাখতেও শিবির প্রস্তুত।
আর জামায়াতের সঙ্গে আমাদের আদর্শগত মিল রয়েছে, যা অস্বীকার করার কিছু নেই। যেখানে আদর্শগত ও জাতীয় স্বার্থের মিল থাকে, সেখানে যৌথভাবে কাজ করা কোনো লেজুড়বৃত্তি নয়।
এশিয়া পোস্ট: জামায়াতে ইসলামীর ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক ভূমিকার প্রসঙ্গ উঠলে আপনারা সেই ঐতিহাসিক বিতর্ককে কীভাবে দেখেন?
সিবগাতুল্লাহ সিবগা: ১৯৭১ সালে পলিটিক্যালি জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এটি একটি রাজনৈতিক ইতিহাস এবং জামায়াতও সেই অবস্থান অস্বীকার করে না। তবে পরবর্তীতে যেসব বিচারিক প্রক্রিয়া হয়েছে, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত ছিল।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের বক্তব্য হলো, আমরা এই ভূখণ্ডের প্রতিটি ঐতিহাসিক অর্জনকে ওন করি এবং শ্রদ্ধা করি। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার আন্দোলন, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, হাজী শরীয়তুল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রত্যেকটি সংগ্রাম ও অধ্যায়কে শিবির নিজের ইতিহাস মনে করে ধারণ করে।
এশিয়া পোস্ট: আপনাদের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে ‘গুপ্ত সংগঠন’ কিংবা ছাত্রলীগের মধ্যে অনুপ্রবেশের অভিযোগও তোলা হয়। যেমন—ডাকসুর সাবেক জিএস এস এম ফরহাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
সিবগাতুল্লাহ সিবগা: আমাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ বা ট্যাগিং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যাদের নিজেদের কোনো গঠনমূলক কাজ নেই, তারা শিবিরের নামে নানা অপপ্রচার চালায়। ফ্যাসিবাদী ছাত্রলীগের আমলে বিভাগে বিভাগে যাকে ইচ্ছা তাকে ডেকে পদ দিয়ে দেওয়া হতো, যা ছিল স্বৈরাচারী কায়দা। তখন তো রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিল না। বর্তমানে ক্যাম্পাসে উন্মুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে, সবাই স্বাধীনভাবে কাজ করছে। এখন আর সেসব অপ্রাসঙ্গিক অভিযোগের ভিত্তি নেই।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ছাত্রদলের কর্মকাণ্ড এবং ক্যাম্পাসে তাদের ভূমিকা কীভাবে দেখছেন?
সিবগাতুল্লাহ সিবগা: বিগত ১৭ বছর ভিকটিম হিসেবে ছাত্রদলের অনেক সুযোগ ছিল ক্যাম্পাসে একটি ইতিবাচক পরিবেশ গড়ে তোলার। কিন্তু তারা কেবল বিএনপির লেজুড়বৃত্তি করছে।
সরকারি একটি পদে থাকা উপদেষ্টা যখন ভাইভায় ৪০০ নম্বর বাড়ানোর কথা বললেন, তখন ছাত্রদল সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থে একটি প্রতিবাদও করল না। তারা দলীয় এজেন্ডার বাইরে শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারছে না।
ছাত্রলীগের মতো তারাও যদি সাধারণ শিক্ষার্থীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বলপ্রয়োগ ও লাঠিসোঁটার রাজনীতি করতে চায়, তাহলে তা তাদের চরম ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যাবে। তাদের উচিত অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া।
এশিয়া পোস্ট: সম্প্রতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব সংঘাতের কারণ কী বলে মনে করেন?
সিবগাতুল্লাহ সিবগা: এই সহিংসতার দায় সম্পূর্ণ ছাত্রদলের। আপনারা দেখবেন, ডাকসুতে তারা মব সৃষ্টি করে হামলা চালিয়েছে ও ভাঙচুর করেছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে হলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনে ছাত্রদল হামলা চালিয়েছে, যেখানে শিবির ছাড়াও ছাত্রশক্তি, ছাত্র ফেডারেশনসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা আক্রান্ত হয়েছে।
তারা এখনও জোরজবরদস্তি করে হলে সিট দখল ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রাশেদ খান কিংবা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসিরউদ্দিন নাসির যেসব মন্তব্য বা উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন, তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থি।
সাইবার নিরাপত্তা আইন সংশোধনের নামে সরকার ও তাদের অঙ্গসংগঠন মানুষের বাক্স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাইছে, যার বিরুদ্ধে আমরা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ রাজনীতিবিমুখ। আধুনিক প্রেক্ষাপটে ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ আপনি কেমন দেখছেন?
সিবগাতুল্লাহ সিবগা: একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব রাজনীতি ও তথ্যপ্রযুক্তি অনেক এগিয়ে গেছে। ৯০-এর দশকের পুরোনো মারামারির রাজনীতি দিয়ে তরুণদের আকৃষ্ট করা সম্ভব নয়।
তরুণ সমাজ রাজনীতিবিমুখ নয়, বরং তারা পুরোনো ও অপচর্চার রাজনীতির প্রতি বিমুখ। শিবির একটি বিশ্বমানের মডেল উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে, যেখানে পড়াশোনা, মেধা চর্চা ও প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। অন্য সংগঠনগুলো যদি নিজেদের সংশোধন করে শিক্ষার্থীবান্ধব মডেলে না আসে, তাহলে তারা সাস্টেইন করতে পারবে না।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ইসলামী ছাত্রশিবিরের মূল অবদান কী ছিল বলে মনে করেন? এর ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কারা?
সিবগাতুল্লাহ সিবগা: জুলাই অভ্যুত্থানে শিবিরের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল। গ্রাউন্ড লেভেল থেকে শুরু করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ধাপে শিবির সক্রিয় ছিল। বিশেষ করে আন্দোলন যখন স্থবির হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে ছিল, তখন ঐতিহাসিক ৯ দফা ঘোষণা করে আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করার পেছনে শিবিরের অবদান ছিল অপরিসীম।
এই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ, যারা বাক্স্বাধীনতা ও স্বৈরাচার থেকে মুক্তি পেয়েছে। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফ্যাসিবাদী শক্তি আওয়ামী লীগ এবং তাদের পেছনের আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমান সরকারের প্রায় সাত মাসের কার্যক্রমকে আপনারা কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
সিবগাতুল্লাহ সিবগা: বর্তমান সরকারের মূল ব্যর্থতা হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থতা এবং মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হওয়া। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দফায় দফায় দাম বাড়ানোর ফলে বাজারে চরম মুদ্রাস্ফীতি ঘটেছে, কলকারখানা বন্ধ হচ্ছে এবং বাসভাড়াসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষি কার্ডের নামে সামান্য সুবিধা দিয়ে ১৮ কোটি মানুষের পকেট কাটা হচ্ছে। তাছাড়া স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন বা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের মতো জুলাই সনদের মূল সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন না করে তারা জনগণের প্রত্যাশা ভঙ্গ করছে।
এশিয়া পোস্ট: জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) প্রায়ই শিবিরের ‘বি-টিম’ বলে গুঞ্জন তোলা হয়। বিষয়টিতে সত্যতা কতটুকু?
সিবগাতুল্লাহ সিবগা: এটি একটি ভিত্তিহীন প্রচার। ইসলামী ছাত্রশিবির ছাত্রজীবনে শিক্ষার্থীদের নীতি-নৈতিকতা ও যোগ্যতায় গড়ে তোলে। ছাত্রজীবন শেষে অনেকে জামায়াতে যোগ দেয়, কেউ হয়তো এনসিপি বা অন্য কোনো সংগঠনে যায়। চার-পাঁচ বছর আগে কেউ শিবির করেছে বলেই আজ তার সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য শিবির দায়ী থাকবে—বিষয়টি এমন নয়। শিবির সরাসরি ছাত্রদের নিয়ে এবং তাদের কল্যাণে ফোকাস রেখে কাজ করে।
এশিয়া পোস্ট: ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় পাঁচ দশকের পথচলায় ছাত্রশিবিরের সবচেয়ে বড় অর্জন এবং বড় ব্যর্থতা কী?
সিবগাতুল্লাহ সিবগা: শিবিরের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, আমরা একটি চরিত্রবান, সৎ ও যোগ্য মানুষদের কাফেলা তৈরি করতে পেরেছি, যারা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সততার সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
আর আমাদের ব্যর্থতা বা শিক্ষার জায়গা হলো, বিগত স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে আমরা অনেক বাধা অতিক্রম করতে পারিনি। তবে সেই প্রতিকূলতা থেকে শিক্ষা নিয়েই আমরা আজ আরও শক্তিশালী ও পরিপক্ক হয়ে রাজপথে সফল হয়েছি।
এশিয়া পোস্ট: যারা ইসলামী ছাত্রশিবিরকে পছন্দ বা সমর্থন করেন না, তাদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
সিবগাতুল্লাহ সিবগা: যারা শিবিরকে সমর্থন করেন না, তাদের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, আপনারা অবশ্যই আমাদের সমালোচনা করবেন, তবে তা যেন যৌক্তিক হয়। যে কোনো গঠনমূলক সমালোচনাকে শিবির সাদরে গ্রহণ করে এবং প্রয়োজনে নিজেদের সংশোধন করে।