কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমকে হত্যার ঘটনায় আটক তুহিনের বিরুদ্ধে এর আগেও মোটরসাইকেল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। ওই ঘটনায় থানায় অভিযোগ করতে গেলে মামলা না নিয়ে শুধু সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন তৎকালীন ভুক্তভোগী আসাদুল্লাহ সোহাগ নামে এক যুবক। তার অভিযোগ, তুহিনের মাথার ওপর কোনো এক রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতার হাত রয়েছে—পুলিশের এমন বক্তব্যের কারণে তখন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) তুহিনকে অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডে আটকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জিডির কপি শেয়ার করে এসব অভিযোগ করেন আসাদুল্লাহ সোহাগ। তিনি লিখেছেন, চোর তুহিন থেকে আজকে সে খুনি তুহিন! সে আমাকেও একইভাবে ডেকে এনে কৌশলে আমার বাইকটি নিয়ে যায়। ওর বিরুদ্ধে যখন আমি মামলা করতে গিয়েছিলাম, তখন সদর দক্ষিণ থানার পুলিশ আমার মামলা না নিয়ে শুধু একটা জিডি (GD) নিয়েছিল। কিন্তু ওর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো আমাদের বলেছিল।
তিনি বলেন, ওর মাথার ওপর নাকি কোনো এক রাজনৈতিক দলের বড় নেতার হাত আছে, তাই ওকে যেন কিছু না করা হয়! আমি সেদিন চুপ ছিলাম, কিন্তু আজ বলব দেশের পুলিশের শুধু পোশাকই পরিবর্তন হয়েছে, চরিত্র নয়! টাকা ছাড়া এই দেশে কোনো কিছুর বিচার পাওয়া যায় না। আমার বাইক চুরি গেছে, সেটা নিয়ে আমার আক্ষেপ নেই। কিন্তু আমি মনে করি, ছোট অপরাধ পার পেয়ে গেলেই অপরাধীরা পরবর্তীতে বড় অপরাধ করার সাহস পায়।সেদিন যেই নেতার পাওয়ার দেখিয়ে ওকে আইন থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, আজ ওকে কীভাবে বাঁচাবেন?
এদিকে সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া ওই অভিযোগপত্রেও তুহিনের বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের তথ্য রয়েছে। অভিযোগপত্রে বাদী হিসেবে মরিয়ম আক্তার (৩৫) বিবাদী হিসেবে মো. তুহিন হোসেনসহ অজ্ঞাতনামা আরও দুই থেকে তিনজনের নাম উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ঘটনাটি ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল রাত আনুমানিক ৯টার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানাধীন সালমানপুর এলাকার অলি মিয়ার দোকানের সামনে ঘটে। তুহিন মরিয়ম আক্তারের ছেলে সোহাগের পূর্বপরিচিত। তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল এবং তুহিন আগে থেকেই সোহাগের সঙ্গে যোগাযোগ ও চলাফেরা করতেন। ২৭ মার্চ ২০২৫ সোহাগ কুমিল্লা পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের সিটি বাইক থেকে ২ লাখ ৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি সুজুকি মনোটন মোটরসাইকেল কেনেন। পরে তুহিন প্রায়ই মোটরসাইকেলটি নিয়ে চালাতেন।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ২৬ এপ্রিল রাত আনুমানিক ৯টার দিকে তুহিন সোহাগকে ফোন করে মোটরসাইকেলটি চান। পরে সোহাগ ঘটনাস্থলে গিয়ে তুহিনকে মোটরসাইকেলটি দেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে একটি দোকানে গিয়ে বসেন। কিছুক্ষণ পর তুহিন সোহাগকে জানান, তার মোটরসাইকেলটি আর তার কাছে নেই। এরপর মোটরসাইকেলটি ফেরত দেওয়া হয়নি। পরে সোহাগ মোটরসাইকেলটি উদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। বিষয়টি সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জানিয়ে আলোচনা করতেও সময় লাগে। এরপর তিনি থানায় এসে অভিযোগ করেন।
এ বিষয়ে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ থানার সার্কেল সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘গতকাল থেকে জিডির কপিটা আমরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি। কিন্তু গতকাল অপ্রতীম হত্যা মামলা নিয়ে তদন্তের কাজ করায় জিডির কপিটা সম্পূর্ণভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে তদন্তের স্বার্থে এটি নিয়ে আমরা আরও ভালোভাবে যাচাই করব।’
তিনি বলেন, তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সন্ধ্যার পর অপর দুজনকে আটক করে পুলিশ। শনিবার বিকেল ৩টার দিকে তুহিনকে আটক করা হয়।
এর আগে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে অপ্রতীমকে হত্যার ঘটনায় আটক তুহিনের বাড়ি থেকে অপ্রতীমের মায়ের আইফোন উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় তুহিনের সঙ্গে আনাস ও ফাহিমকেও আটক করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্য দুজনকে আটক করা হয়।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল থেকে নিখোঁজ ছিল কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম। শনিবার দুপুর ১টার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা এলাকায় একটি নির্জন স্থান থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অপ্রতীমের মা ড. নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি কোটবাড়ি-গন্ধমতী এলাকায় ভাড়া থাকতেন।
অপ্রতীম নিখোঁজ হওয়ার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসহ আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে পুলিশ। ফুটেজে অপ্রতীমের সঙ্গে তুহিনকে দেখা যায়। পরে তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আনাস ও ফাহিমকে আটক করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।