Image description

ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংশোধনীতে আইনের আওতা ও শাস্তির বিধান বাড়ানো হচ্ছে। নতুন এই যুগোপযোগী আইনে ই-কমার্স খাতকে যুক্ত করা হচ্ছে। নতুন আইনে নিবন্ধন ছাড়া কোনো ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠান ব্যবসা চালাতে পারবে না। অপরাধ প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের ক্ষমতা হাতে পাচ্ছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। পাশাপাশি সেবা খাতের পরিধি বৃদ্ধি, পণ্য মজুতকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি এবং সামগ্রিক বাজার সুরক্ষায় আরো কঠোর পদক্ষেপের পথ উন্মুক্ত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই আইন কার্যকর হলে ই-কমার্স খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রতারণা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে এবং ভোক্তারা আরো বেশি সুরক্ষিত হবেন।

জানা গেছে, বিদ্যমান ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ যুগোপযোগী করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬ প্রণয়নের কাজ চলছে। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবিত আইনের খসড়ার ওপর একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর খসড়াটি সবার মতামতের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। সংশ্লিষ্ট সবার মতামতের পর এটি ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, ভোক্তা অধিকার আইন যত শক্তিশালী হবে, ভোক্তারা তত বেশি লাভবান হবেন। দুই বছর ধরে এ বিষয়ে কাজ চলছে। ডিজিটাল প্রতারণা বন্ধে আলাদা প্রতিষ্ঠান করার কথা থাকলেও আমরা বলেছিলাম, ভোক্তা সংরক্ষণ আইনের মাধ্যমেই এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সংশোধিত আইনে বিষয়টি যুক্ত করা হলে ই-কমার্স খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রতারণা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। পাশাপাশি, আইনের আওতা এবং শাস্তির বিধান বৃদ্ধি করা একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ।

আইনের খসড়া থেকে জানা গেছে, গতানুগতিক ব্যবসার পাশাপাশি বর্তমান সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ই-কমার্স খাতের ব্যবসা। কিন্তু এটি আইনের আওতাভুক্ত না হওয়ায় অধিদপ্তরে প্রতারিত বা সেবা বঞ্চিত ভোক্তারা অভিযোগ করলেও তার বিচার করা যাচ্ছিল না। ফলে সংশোধিত আইনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ই-কমার্স ব্যবসায়।

জানা গেছে, শুধু ই-কমার্স ব্যবসাই নয়, অনলাইন মাধ্যমে জুয়া, বেটিংয়ের সাইটগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে ভোক্তা অধিদপ্তর। ৪১ এর ক ধারায় বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ কোনো পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রয়ের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং অনলাইন জুয়া, বেটিংয়ের আয়োজনে দণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিক্রেতা বা মার্কেটপ্লেস কর্তৃক কোনো আইন দ্বারা নিষিদ্ধ কোনো পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রয়ের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলে বা কোনো অনলাইন জুয়া, বেটিংয়ের আয়োজন করলে অথবা আয়োজনে সহায়তা করলে উক্ত প্রতিষ্ঠানকে দুই বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৩ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করতে পারবে ভোক্তা অধিদপ্তর।

জানা গেছে, পণ্যের মজুত ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ থাকছে নতুন আইনে। এছাড়া যেকোনো পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রয়ের জন্য অসত্য বিজ্ঞাপন বা ঘোষণা বা তথ্য প্রচার দ্বারা ক্রেতাকে প্রতারিত করা হচ্ছে কি না তারও তদারকি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে অধিদপ্তর। পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন, পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত করতে পারবে সংস্থাটি, যেখানে প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করতে বাধ্য থাকবে।

জানা গেছে, ধারা ২১ ক ধারায় ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন, নিবন্ধন স্থগিত ও বাতিলের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। এই ধারায় পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রয়কারী ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভিত্তিক সব ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা শুরুর আগে অধিদপ্তরের অধীনে নির্ধারিত শর্তে ও পদ্ধতিতে নিবন্ধিত হতে হবে। নির্ধারিত সময় পর এর নবায়নের শর্তও যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হলে কোম্পানি কার্যক্রম বন্ধ বা স্থগিতের ক্ষমতা যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির হাতে।

জানা গেছে, আইনে সর্বোচ্চ জরিমানার পরিমাণ পর্যাপ্ত না হওয়ায় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে শাস্তির উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। তাই জরিমানার পরিমাণ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে খসড়া আইনে। আইনের ৩৭ ধারা অনুযায়ী, এক বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ২ লাখ টাকা বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। আগে এই ধারায় কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান ছিল।

একইভাবে ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা বা সেবার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারলে এক বছরের কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডের বিধান রাখা হচ্ছে। এছাড়া ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি (ডিবিআইডি) প্রদর্শন না করে কেউ ব্যবসা করলেও একই জরিমানা গুনতে হবে।

পণ্য মজুত করলে বড় ধরনের শাস্তির বিধান যুক্ত করা হচ্ছে। এজন্য যুক্ত হচ্ছে নতুন ধারা। ৪৩ক ধারা অনুযায়ী বাজারে সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পণ্য বা ওষুধ অবৈধভাবে মজুত বা সংরক্ষণ করলে তিনি অনূর্ধ্ব দুই বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।