হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গনে যাত্রী ও স্বজনদের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ, সিএনজি চালক ও গাড়ির দালালদের দৌরাত্ম্য, এলোমেলো গাড়ি পার্কিং এবং অনিয়ন্ত্রিত লোকসমাগমে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের প্রবেশপথে থাকা এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) চেকপোস্টে যথাযথ নজরদারি না থাকায় নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গত ৭ আগস্ট বিমানবন্দর নিরাপত্তা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সভায় উত্থাপিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এপিবিএনের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন যাত্রীর সঙ্গে সর্বোচ্চ দুজন স্বজন ভেতরে প্রবেশের অনুমতি থাকলেও নজরদারির অভাবে ৮ থেকে ১০ জন পর্যন্ত ক্যানোপিতে প্রবেশ করছেন। এতে ক্যানোপি লোকে-লোকারণ্য হয়ে প্রতিনিয়ত বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। প্রবেশ গেটে চেকপোস্ট থাকলেও কারা প্রবেশ করছে, তার যথাযথ জবাবদিহি না থাকায় নিরাপত্তা হুমকিও তৈরি হচ্ছে।
জাতীয় কমিটির ওই সভায় এসব সমস্যা নিরসনে সুপারিশের পাশাপাশি তা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে এক মাস পার হলেও এপিবিএনের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে বাস্তবসম্মত কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গনে বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা হুমকি এখনও বিদ্যমান।
অভিযোগ অস্বীকার করে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশের পুলিশ সুপার রেজাউল করিম বলেন, যাত্রীর সঙ্গে দুজন প্রবেশের ব্যাপারে তারা চেষ্টা করেন। তবে একটি গাড়ি তল্লাশি করতে ৪ থেকে ৫ মিনিট সময় লাগে। এতে পেছনে আরও গাড়ির সারি তৈরি হয়। গাড়িতে অনেক সময় নারী ও বৃদ্ধ থাকেন। তাদের নামিয়ে দিতেও খারাপ লাগে। এছাড়া নিয়মিত অভিযান চালিয়ে উপদ্রব করা লোকজনকে আটক করা হয়।
বিমানবন্দর নিরাপত্তা সভায় যা বলা হয়েছিল
গত ৭ আগস্ট বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদর দফতরে বিমানবন্দর নিরাপত্তা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় গোয়েন্দা তথ্য উপস্থাপন করা হয়।
গোয়েন্দা তথ্যে বলা হয়েছে, বিমানবন্দরের প্রবেশমুখে এপিবিএনের একাধিক নিরাপত্তা চৌকি রয়েছে। সাধারণ যাত্রী, দর্শনার্থী এবং বিমানবন্দরে আসা লোকজনকে যথাযথ জিজ্ঞাসাবাদ ও নিরাপত্তা যাচাই করার দায়িত্ব থাকলেও তারা সেই দায়িত্ব পালন করেন না। এ কারণে যাত্রীর স্বজন ছাড়াও বহিরাগত ও অনুমোদনহীন লোকজন হরহামেশাই বিমানবন্দরে প্রবেশ করছে। এতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি শৃঙ্খলা ও সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
এছাড়া ওই সভায় বেবিচকের নিজস্ব গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানবন্দরের ল্যান্ডসাইডে ট্রাফিক জ্যাম, ক্যানোপিতে অনিয়ন্ত্রিত লোকসমাগম, ভিক্ষুকের উপদ্রব এবং অবৈধ লাগেজ র্যাপারের হয়রানি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এর ফলে বিমানবন্দর এলাকার যাত্রী হয়রানি এবং শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। অথচ ল্যান্ডসাইডের নিরাপত্তা বিধানসহ এসব কার্যকলাপ বন্ধের জন্য এপিবিএন দায়িত্বপ্রাপ্ত। তাদের দায়িত্বে অবহেলা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।
ওই সভায় এপিবিএনকে এসব বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। যাত্রীর সঙ্গে দুজনের বেশি যেন প্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরাপত্তা হুমকি যেন তৈরি না হয়, সে জন্য চেকপোস্ট পরিচালনা ও বহিরাগতদের প্রবেশ ঠেকানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
সরেজমিনে দেখা গেলো ভিন্ন চিত্র
জাতীয় কমিটির সভায় নির্দেশনা দেওয়ার পরও সরেজমিনে বিমানবন্দর ঘুরে এর বাস্তবায়নের ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। যাত্রীর সঙ্গে তিন থেকে চারজন, কখনও সাত থেকে আটজন স্বজনকেও ক্যানোপিতে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। আগমনী যাত্রীর সঙ্গে ক্যানোপির ভেতরেই গাড়ি ভর্তি লোকজনও উঠছেন। সবকিছু এপিবিএন সদস্যদের সামনেই ঘটলেও এ বিষয়ে কাউকে কোনো কথা বলতে দেখা যায়নি।
বিমানবন্দরে এপিবিএনের চেকপোস্ট ও ডিউটি পোস্ট রয়েছে। তবে তাদের সামনে সবকিছু ঘটলেও তারা নির্বিকার থাকেন বলে সরেজমিনে দেখা গেছে।
বহির্গমন ক্যানোপিতে আব্দুল আহাদ নামের এক যাত্রীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি সৌদি আরব যাচ্ছেন। তাকে বিদায় জানাতে স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, মা, বাবার সঙ্গে আরও দুই প্রতিবেশী এসেছেন। একটি হাইয়েস গাড়ি ভাড়া করে তারা বিমানবন্দরে এসেছেন।
বিধিনিষেধের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা এটা জানি না। কেউ আমাদের বলেনি। প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে বসে আছি। কেউ তো এ বিষয়েও কিছু বললোও না।’
একইভাবে আশরাফুল নামের আরেক যাত্রীর সঙ্গে পাঁচজন এসেছেন বিদায় জানাতে। বিধিনিষেধের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি সম্পর্কে জানি না। যদি জানতাম, অবশ্যই নিয়ম মানতাম।’
বিমানবন্দর গোলচত্বর থেকে ভেতরে ঢুকতেই বিরূপ পরিবেশ চোখে পড়ে। বিমানবন্দরের দুই পাশের রাস্তার উঁচু ডিভাইডারে কেউ খাবার খাচ্ছেন, কেউ বসে সিগারেট টানছেন। তারা যাত্রী, স্বজন নাকি বাইরের লোক, এ বিষয়ে কেউ জিজ্ঞাসাও করছেন না। অথচ এর পাশেই রয়েছে এপিবিএনের চেকপোস্ট।
আগমনী অর্থাৎ টার্মিনাল ১ ও ২ এলাকায় গেলে দেখা যায়, কে কাকে ঠেলে সামনে যাবে, যেন সেই প্রতিযোগিতা চলছে। গ্রিন চ্যানেল কিংবা তারও ভেতরে যাওয়ার জন্য সবাই ব্যস্ত। একই অবস্থা বহির্গমনেও। দুই তলায় গেলে সেখানেও শত শত মানুষকে বিক্ষিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। পুরো বিমানবন্দরজুড়েই যাত্রী ও স্বজনদের এমন অবস্থান চোখে পড়ে।
ফ্লাইট নামলেই দৌড়ঝাঁপ
ফ্লাইট নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় যাত্রীদের স্বজনদের দৌড়াদৌড়ি। ফ্লাইট নামছে এমন খবর পেলেই যে যেখানে থাকেন, সেখান থেকে ক্যানোপির ভেতরে চলে আসেন। তাদের চাপাচাপিতে পরিস্থিতি এমন হয় যে ছেড়ে দিলে তারা কোথায় যাবেন, সেটিও বলা কঠিন। অথচ এই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করার কথা এপিবিএনের। কিন্তু তারা এতে ভ্রুক্ষেপও করেন না।
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা বলেন, আগে ক্যানোপির ভেতরে কারও প্রবেশাধিকার ছিল না। এখন ভেতরে প্রবেশের সুযোগ থাকায় সবাই সেখানে আসতে চান। যাত্রীর স্বজনদের কেউ বাধা দেওয়ার মতোও সেখানে নেই। অথচ ক্যানোপির পাশেই বেঞ্চে বসে থাকেন এপিবিএন সদস্যরা।
বিমানবন্দরে আসা লোকজন বলছেন, বিমানবন্দরে আগের মতো পরিবেশ নেই। আগেও লোকজন এসেছেন, কিন্তু একটি শৃঙ্খলা ছিল। এখন কোনো শৃঙ্খলা নেই। প্রবাসী যাত্রীদের বসার জায়গা থাকলেও সেখানে খুব বেশি লোকজন যান না। আবার কম লোকের ব্যবস্থার কারণে বাইরে বিক্ষিপ্তভাবে বসেন। এ কারণে বিমানবন্দরের কোনো সৌন্দর্য নেই। হাজার হাজার লোকের প্রতিদিন উপস্থিতিতে সায়েদাবাদ বা গাবতলীর মতোই অবস্থা।
ক্যানোপিতে হরহামেশাই প্রবেশ, নিরাপত্তা হুমকি
বিমানবন্দরের ক্যানোপিতে হরহামেশাই মানুষ প্রবেশ করছে। অবস্থা এমন যে কে যাত্রীর স্বজন আর কে অন্য লোক, তা বোঝার উপায় নেই। এতে নিরাপত্তা হুমকি তৈরি হচ্ছে। যাত্রীর স্বজন ছাড়াও গাড়ির দালাল, সিএনজি চালক এমনকি বিমানবন্দর দেখতে আসা ব্যক্তিরাও ভেতরে ঢুকে পড়েছেন। বের হওয়ার গেটসংলগ্ন শত শত মানুষের এমন ভিড় দেশের প্রধান বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম বলেন, যাত্রীকে নিতে পরিবারের লোকজন আসবেন। কিন্তু একসঙ্গে সবাই ক্যানোপির ভেতরে প্রবেশ করায় সেখানে আর নিরাপত্তা বলতে কিছু থাকে না। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ ধরনের সংরক্ষিত এলাকার ভেতরে শত শত মানুষের কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই প্রবেশ নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। তাই এর বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বিমানবন্দর যেন সিএনজি স্ট্যান্ড
বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গন যেন সিএনজি স্ট্যান্ডে পরিণত হয়েছে। যাত্রী নিয়ে এসে নামানোর পর সিএনজিগুলো বিমানবন্দরের বহির্গমন ও আগমনী ক্যানোপির বিভিন্ন স্থানে এলোমেলোভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এরপর ডেকে ডেকে যাত্রী তোলা হয়। ক্যানোপির বাইরেও কার পার্কিং ও এর আশপাশজুড়ে থাকে সিএনজি।
যাত্রী নিয়ে সিএনজি প্রবেশের পর দ্রুত চলে যাওয়ার নির্দেশনা থাকলেও কর্তব্যরত এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশের সদস্যরা এগুলো দেখেও তাদের সরতে বলেন না।
বিমানবন্দরের আগমনী ক্যানোপি ২-এ যাত্রী নিতে একের পর এক গাড়ি প্রবেশ করছে। গাড়িগুলো সারিবদ্ধ থাকার কথা থাকলেও এর কোনো বালাই নেই। ক্যানোপির ভেতরেই এলোমেলোভাবে গাড়ি রাখার ফলে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেও আগে থেকে দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজিগুলো যাত্রী নেওয়ার জন্য ডাকাডাকি করছে। এলোমেলোভাবে গাড়ির সারির কারণে যাত্রীরাও ঠিকমতো বের হতে পারছেন না।
অথচ ক্যানোপির এক পাশে এপিবিএন সদস্যরা খোশগল্পে ব্যস্ত। তারা নির্ধারিত স্থানে নির্ভার বসে আছেন। একদিকে দুই-তিনটি সিএনজি দাঁড় করিয়ে রাখা, এলোমেলো গাড়ি এবং যাত্রীর স্বজনদের এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে যাত্রীরা যে সুন্দরভাবে বের হবেন, তার কোনো বালাই নেই। আবার অনেকেই মালামাল হারানোর ভয়ে ট্রলির ওপর থাকা মালামাল শক্ত করে ধরে আছেন।
ক্যানোপি ছাড়াও ওপরের বহিরাঙ্গনের ক্যানোপিতেও একই অবস্থা লক্ষ্য করা যায়। যাত্রী নামানোর পর বের হয়ে যাওয়ার রাস্তায় সিএনজি চালকরা সিএনজি দাঁড় করিয়ে যাত্রী খুঁজছেন। আগমনী ও বহির্গমন ক্যানোপির বাইরে পুরো বিমানবন্দরজুড়েই তাদের এক ধরনের অবস্থান দেখা যায়।
বিমানবন্দরের এসব বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে বিমানবন্দরের সদস্য নিরাপত্তা এয়ার কমোডর আসিফ ইকবাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সভায় পরিষ্কারভাবে নিরাপত্তা বিষয়ে কার কী দায়িত্ব, তা বলে দেওয়া হয়েছে। অথচ এই কমিটির সভার এক মাস পার হয়ে যাওয়ার পরও যদি বাস্তবায়ন না করে, তবে আর কী বলার আছে। তবে বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।