অচেনা রাস্তায় গন্তব্য খুঁজতে গুগল ম্যাপের ওপর ভরসা করেছিলেন এক বাইকচালক। কিন্তু সেই নির্ভরতা শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে গেল বিপজ্জনক এক ধস নামা রাস্তায়। আচমকাই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাইকসহ খাদে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। দুর্ঘটনার পর আত্মীয়দের ফোন করলেও কোথায় রয়েছেন, তা স্পষ্ট করে জানাতে পারেননি। রাতভর খোঁজাখুঁজির পর শেষ পর্যন্ত মোবাইলের অবস্থান শনাক্ত করে শনিবার সকালে তাকে উদ্ধার করে পুলিশ।
ঘটনাটি পশ্চিম বর্ধমানের পাণ্ডবেশ্বরের হরিপুর এলাকার পুরনো ভাটমুড়া অঞ্চলে। উদ্ধার হওয়া বাইকচালকের নাম প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। তার বাড়ি কাঁকসায়। পেশায় তিনি কেবল অপারেটর।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সন্ধ্যায় কাজের সূত্রে বাইক নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন প্রসূন। এলাকাটি তার পরিচিত ছিল না। তাই গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য মোবাইলে গুগল ম্যাপ চালু করেছিলেন তিনি। ম্যাপের নির্দেশনা অনুসরণ করে কয়েক কিলোমিটার এগোনোর পরই ঘটে বিপত্তি।
রাস্তার একটি অংশ কিছুদিন আগেই ধসে পড়েছিল। সেটি ছিল ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেডের অধিগৃহীত এলাকা। ওই অঞ্চলে কয়লাখনি সংক্রান্ত কাজও চলছে। ধসের কারণে রাস্তার পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠলেও ম্যাপে সেটি স্বাভাবিক রাস্তা হিসেবেই দেখা যাচ্ছিল বলে জানা গেছে। সেই পথ ধরে এগিয়ে যাওয়ার সময় আচমকা বাইকটি ধসের অংশে পড়ে যায়।
দুর্ঘটনার পর কোনওভাবে আত্মীয়দের ফোন করেছিলেন প্রসূন। কিন্তু তখন তিনি স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছিলেন না। দুর্ঘটনার ধাক্কায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কোথায় রয়েছেন, সেই তথ্যও ঠিকমতো দিতে পারেননি। কখনও এক জায়গার নাম, কখনও অন্য এলাকার কথা বলছিলেন বলে পরিবারের সদস্যদের দাবি।
এর পরেই শুরু হয় তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা। পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পুলিশ ও স্থানীয়দের তরফে রাতভর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ চালানো হলেও অন্ধকারে তার সন্ধান মেলেনি।
শেষ পর্যন্ত মোবাইল ফোনের টাওয়ার অবস্থান অনুসরণ করে তার সম্ভাব্য অবস্থান চিহ্নিত করা হয়। পরদিন সকালে স্থানীয় কয়লাখনি কর্তৃপক্ষের সহায়তায় দুর্ঘটনাস্থলের কাছ থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় প্রসূনকে উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারের সময় তার শারীরিক অবস্থা যথেষ্ট খারাপ ছিল। ঠিকমতো কথা বলতেও পারছিলেন না তিনি। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য দুর্গাপুরের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
পুলিশের এক আধিকারিক জানান, দুর্ঘটনার পর আঘাতের কারণে প্রসূন ঠিকভাবে কথা বলতে পারছিলেন না। কোথায় পড়েছেন, তা জানতে চাইলেও তিনি স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। ফলে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ চালাতে হয়। পরে মোবাইলের অবস্থান শনাক্ত করেই তার কাছে পৌঁছনো সম্ভব হয়।
স্থানীয়দের দাবি, ইসিএলের অধিগৃহীত ওই রাস্তা ইতিমধ্যেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এলাকায় কয়লা উত্তোলনের কাজ শুরু হওয়ার প্রস্তুতিও চলছে। তবে রাস্তা বন্ধ থাকার বিষয়টি অনেকেরই জানা নেই। ফলে অচেনা কেউ গুগল ম্যাপের নির্দেশনা অনুসরণ করে ওই পথে ঢুকে পড়লে বিপদের সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।
ঘটনার পর ওই রাস্তা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট সতর্কবার্তা ও প্রবেশ নিষেধের ব্যবস্থা করার দাবি উঠেছে স্থানীয়দের মধ্যে। বিশেষ করে মোবাইলের মানচিত্রে রাস্তা খোলা দেখালেও বাস্তবে সেটি বিপজ্জনক বা বন্ধ থাকতে পারে। এই ঘটনায় সেই ঝুঁকিই সামনে এসেছে।
প্রসূন বর্তমানে দুর্গাপুরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি সুস্থ হয়ে উঠলে দুর্ঘটনার আগে ঠিক কীভাবে ওই রাস্তায় পৌঁছেছিলেন এবং কীভাবে বাইকটি ধসের অংশে পড়েছিল, সে সম্পর্কে আরও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যেতে পারে।