Image description
 

‘গুপ্ত’ শব্দটি ঘিরেই এখন পুলিশের বিভিন্ন স্তরে চলছে তুমুল আলোচনা। বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএসএ) গত ৯ আগস্টে দেওয়া বিবৃতিতে পুলিশ বাহিনীর ভেতরে ও বাইরে ঘাপটি মেরে থাকা ‘গুপ্ত ও ফ্যাসিস্টদের দোসরদের’ বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়। সংগঠনটির দাবি, এসব ব্যক্তি অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও নামধারী সাংবাদিকদের কাছে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহ করছেন। তবে ‘গুপ্ত’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তালিকা বা পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

এ অস্পষ্টতাই পুলিশের ভেতরে নতুন উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ‘গুপ্ত’ শব্দটি ভবিষ্যতে কোনো কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করার অনানুষ্ঠানিক ট্যাগে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে পদোন্নতি, পদায়ন, সার্ভিস রেকর্ড যাচাই ও সাম্প্রতিক বাধ্যতামূলক অবসরের প্রেক্ষাপটে এ নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, শব্দটি ব্যক্তিগত শত্রুতার বলি বানানোর হাতিয়ার হয়ে পদায়ন-পদোন্নতিতে নতুন মানদণ্ড হতে পারে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ‘গুপ্ত’ শব্দটির অভিধানগত অর্থের চেয়ে এর রাজনৈতিক ইঙ্গিত নিয়েই উদ্বেগ বেশি। কারণ, বাহিনীতে রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে বঞ্চনা ও পদোন্নতি আটকে দেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে অন্তত ২০০ কর্মকর্তার ক্যারিয়ার ধ্বংসের অভিযোগ রয়েছে। ফলে ‘গুপ্ত’ শব্দটি সম্ভাব্য নতুন ‘ট্যাগিং সংস্কৃতি’র পূর্বাভাস হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।

 

বিবৃতির এক শব্দে তোলপাড়

বিপিএসএর সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, পুলিশ বাহিনীর বাইরে ও ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা ‘গুপ্ত ও ফ্যাসিস্টদের দোসররা’ দেশ-বিদেশে থাকা অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও নামধারী সাংবাদিকদের কাছে মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছেন। এসব তথ্য যাচাই না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরঞ্জিতভাবে প্রচার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়।

কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশের বিরুদ্ধে অপতথ্য ও অপপ্রচারের প্রতিবাদ করাই বিবৃতির মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু ‘গুপ্ত’ কারা—এ প্রশ্নের উত্তর না থাকায় বাহিনীর ভেতরে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা কি ‘গুপ্ত’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন, এমন তালিকা তৈরি হচ্ছে কি না এবং ভবিষ্যতে পদায়ন-পদোন্নতিতে তা বিবেচনায় নেওয়া হবে কি না—এসব প্রশ্ন ঘুরছে। কোনো সুনির্দিষ্ট তদন্ত বা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, নাকি রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যক্তিগত আনুগত্য পরীক্ষার এটি অনানুষ্ঠানিক হাতিয়ার—তা নিয়েও চলছে বিশ্লেষণ।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থেকে ডিআইজি সমমানের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অপতথ্য বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তা প্রমাণ করা সম্ভব। কিন্তু ‘গুপ্ত’র মতো অস্পষ্ট পরিচয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেললে ব্যক্তিগত বিরোধ ও গ্রুপিংয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

 

পদোন্নতি-পদায়নে টানাপোড়েন

পুলিশে পদোন্নতিসহ নানা বিষয়ে হতাশা নিয়ে গত ৩ আগস্ট ‘আমার দেশ’-এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিপিএসএ জানায়, পদোন্নতি ও পদায়ন-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। একইসঙ্গে পেশাদারিত্ব, জবাবদিহি ও সদস্যদের কর্মস্পৃহা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। এতে বাহিনীর ভেতরের অসন্তোষের বিষয়টি সামনে আসে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুলিশের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের বড় কারণ পদোন্নতি, আকর্ষণীয় পদে পদায়ন ও ক্ষমতার প্রভাব। অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতির জন্য ২৬ জন ডিআইজির সার্ভিস রেকর্ড ও এসিআর যাচাই-বাছাই শুরু হলে ব্যাচভিত্তিক কোন্দল নিয়েও গুঞ্জন তৈরি হয়।

পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, ‘গুপ্ত’ কোনো আইনি বা শৃঙ্খলামূলক পরিভাষা নয়। অথচ বাহিনীর ভেতরে একটি অদৃশ্য তালিকা তৈরির আলোচনা চলছে। তালিকায় কার নাম আছে কেউ জানে না, তবে এটি পদোন্নতির দৌড় থেকে কাউকে ছিটকে দেওয়ার অস্ত্র হতে পারে। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ইউটিউব চ্যানেলে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত তথ্য ও ব্যাচভিত্তিক কোন্দল নিয়ে চর্চা হচ্ছে, যা অভ্যন্তরীণ বলয়গুলো প্রতিপক্ষ ঘায়েলে ব্যবহার করছে।

গত ২৯ আগস্ট রাজারবাগে পুলিশ টেলিকম অডিটোরিয়ামে ত্রৈমাসিক সম্মেলনেও গ্রুপিংয়ের একটি ছোট উদাহরণ সামনে আসে। সেখানে এক প্রভাবশালী এসপি পুলিশপ্রধান আলী হোসেন ফকিরের সঙ্গে এমন ভঙ্গিতে কথা বলেন, যা কর্মকর্তাদের কাছে শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীর জন্য অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। এতে পুলিশপ্রধান ছাড়াও সিনিয়র কর্মকর্তাদের অনেকে অসন্তুষ্ট হন বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, গত মাসে পুলিশ সদর দপ্তর ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতির উপযুক্ত প্রায় ৩৫০ অতিরিক্ত ডিআইজির তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এদের মধ্যে অন্তত ২০ জন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সুবিধাভোগী ছিলেন। তারা নিয়মিত পদোন্নতি পেয়েছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে কয়েকজন আওয়ামী প্রভাবশালী বিপ্লব কুমার সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অথচ ২১, ২২ ও ২৪ ব্যাচের অন্তত ১০ কর্মকর্তা আওয়ামী সরকারের সময়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে ডাম্পিং স্থানে পোস্টিংয়ে ছিলেন। এমন পরিস্থিতি দেখে তৎকালীন বঞ্চিত কর্মকর্তারা হতভম্ব ও নির্বাক।

 

‘গুপ্ত’ কি নতুন ট্যাগ

কর্মকর্তাদের একাংশের আশঙ্কা, অতীতে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে পদোন্নতি ও পদায়নের যে অভিযোগ ছিল, ‘গুপ্ত’ শব্দটি তার নতুন কোনো রূপ হয়ে উঠতে পারে। তাদের ভাষ্য, দুর্নীতি, অপপ্রচার বা রাজনৈতিক সহিংসতায় সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আইন ও বিধি অনুযায়ী তদন্ত এবং ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফ্যাসিস্টের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অস্পষ্ট কোনো ট্যাগ ব্যক্তিগত বিরোধ মেটানো বা পদোন্নতি ঠেকানোর হাতিয়ার হলে তা বাহিনীতে নতুন অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

গত ১০ দিনে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘গুপ্ত’ শব্দটি ঘিরে ব্যাচভিত্তিক তালিকা তৈরির আলোচনা শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ওসি থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন সারির কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে আমার দেশ। রাজধানীতে দায়িত্বরত একজন অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা বলেন, আমি যখন পুলিশে যোগ দিয়েছিলাম, তখন থেকেই গ্রুপিং ছিল। কিন্তু ‘গুপ্ত’ শব্দটি নতুন। একজন এসপি বলেন, মনে হচ্ছে, বাহিনীতে একটি অদৃশ্য তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তালিকায় কে আছে, তা কেউ জানে না। তবে যাদের নাম থাকবে, তাদের হয়তো চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নিতে হতে পারে।

কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী আমলে দলীয় আনুগত্য প্রমাণ করতে না পারলে গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে যাওয়ার সুযোগ মিলত না; ভুলবশত কেউ ভেটিং পার হয়ে গেলেও তাকে দ্রুত সরিয়ে দেওয়া হতো। এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে, ক্ষমতার পালাবদলের পর একই কায়দায় নতুন তালিকা তৈরি হতে পারে, যেখানে ‘গুপ্ত’ ট্যাগে আওয়ামী সরকারের আমলে সুবিধাভোগী নন, এমন অনেক কর্মকর্তাও চিহ্নিত হতে পারেন।

 

অবসর ও ওএসডি ঘিরেও উৎকণ্ঠা

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিভিন্ন প্রশাসনিক কারণে ১৯৯ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ১৪২ জনকে ওএসডি বা বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং পলায়নের অভিযোগে ৯৩ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অতিরিক্ত আইজিপি থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার নানাবিধ যুক্তিসঙ্গত কারণে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হচ্ছে। এ প্রক্রিয়া আরো কিছুদিন চলবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই সরকারের গত সাত মাসে তিন দফায় বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্তত সাতজন ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা ছিল না কিংবা আওয়ামী সরকারের সময়ে তৎকালীন বিএনপি ও জামায়াতের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের অভিযোগও ছিল না। এদের মধ্যে একাধিক নারী কর্মকর্তাও রয়েছেন। তাদের কেউ কেউ শক্তিশালী গ্রুপিংয়ের কারণে অবসরে গেছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। এই ধরনের গ্রুপিংয়ের বলি আরো কেউ হন কি না—এটাই এখন দেখার বিষয় বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।

বিশ্লেষক লে. কর্নেল (অব.) দিদারুল আলম বলেন, প্রায় দুই লাখ সাত হাজার সদস্যের এই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে বিভক্ত করা হলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলায়। বিএনপির নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের আমলে পুলিশকে একটি পেশাদার, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।