ঢাকার টঙ্গীতে আসন্ন বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে তাবলিগের বিরোধ নতুন করে সামনে আসছে। বাংলাদেশে তাবলিগের দুটি অংশ। এর একটি শুরায়ে নেজাম (মাওলানা জুবায়েরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত)। অন্যটি বিশ্ব মার্কাজ নিজামুদ্দিন (ভারতের মাওলানা সাদ কান্ধলভির অনুসারী)। এরমধ্যে আগামী বছরের জানুয়ারিতে দুই পর্বে ইজতেমা আয়োজনের অনুমতি পেয়েছে জুবায়েরপন্থিরা। তবে সাদপন্থিদের বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন বিশ্ব ইজতেমা ঘিরে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। সংঘাতের আশঙ্কাও করা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে জুবায়েরপন্থিদের আগামী ৮ থেকে ১০ জানুয়ারি প্রথম পর্ব এবং ১৫ থেকে ১৭ জানুয়ারি দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমা আয়োজনের অনুমতি দিয়েছে সরকার। অন্যদিকে এখনও অনুমতি না পাওয়া সাদপন্থিরা সংবাদ সম্মেলন করে দ্রুত তাদের পক্ষের ইজতেমার তারিখ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। তবে ইজতেমা মাঠে সাদপন্থিদের কার্যক্রম ও প্রবেশ নিষিদ্ধের দাবিতে সোচ্চার হেফাজতে ইসলাম ও কওমি আলেমদের একটি বড় অংশ।
তাবলিগের উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখনও ইজতেমার অনুমতি না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ সাদপন্থিরা। তারা চান, অন্যান্যবারের মতো যেন সমতার ভিত্তিতে জুবায়েরপন্থিদের মতো তাদেরও ইজতেমার সুযোগ দেওয়া হয়। বিশেষ করে মাওলানা সাদের বাংলাদেশে আসা নিয়ে কোনো জটিলতা দেখতে চান না তারা।
এর মধ্যেই গত ১২ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে সম্মেলনের আয়োজন করে ওলামা-মাশায়েখ বাংলাদেশ নামের একটি সংগঠন। সেখানে হেফাজত আমিরের উপস্থিতিতে ইজতেমা মাঠে সাদপন্থিদের প্রবেশ নিষিদ্ধের জোর দাবি জানানো হয়। হেফাজতের নায়েবে আমির আবদুল আউয়াল হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘সাদ বাংলাদেশে পা রাখলে কেটে দুই টুকরো করে দেওয়া হবে।’
হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর পক্ষে পাঠ করা লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘মাওলানা সাদ যত দিন একনিষ্ঠ তওবা করে, শুরায়ি নেজাম মেনে দেওবন্দের মুরুব্বিদের কাছে আত্মসমর্পণ না করবেন, তত দিন তাকে বাংলাদেশে আসতে দেওয়া যাবে না। টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা আলেমদের তত্ত্বাবধানে শুরায়ি নেজাম দ্বারা পরিচালিত হবে। কাকরাইল মারকাজের কার্যক্রম ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে চলবে।’

১২ সেপ্টেম্বরের সমাবেশ থেকে ইজতেমা ময়দানে সাদপন্থিদের প্রবেশ বন্ধ, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ইজতেমাকেন্দ্রিক হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচারসহ আট দফা দাবি জানায় ওলামা-মাশায়েখ বাংলাদেশ। তবে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের হত্যাকাণ্ডের জন্য জুবায়েরপন্থিদের দায়ী করে আসছে সাদপন্থিরা।
শুরায়ে নেজামের মুখপাত্র হাবিবুল্লাহ রায়হান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘শুরায়ে নেজামের অধীনে জানুয়ারিতে দুই পর্বে ইজতেমার তারিখ ঘোষণা করেছে সরকার। সাদপন্থিদের জন্য এখন পর্যন্ত তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। এরপরও যদি তারা জোর করে ইজতেমা করতে চায়, তাহলে সাদপন্থিরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। আগের মতো হামলা করার নীলনকশা বাস্তবায়ন করবে।’

২০১৮ ও ২০২৪ সালে সংঘর্ষের ঘটনা উল্লেখ করে হাবিবুল্লাহ রায়হান বলেন, ‘এত কিছুর পরও যদি সাদপন্থিরা ইজতেমা করতে চায়, সেক্ষেত্রে আলেম-ওলামা, ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা তাদের সিদ্ধান্ত নেবেন।’
সাদপন্থিদের মুখপাত্র মোহাম্মদ সায়েম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘টঙ্গীর ইজতেমার ময়দান তাবলিগের নয়। এটি সরকারের। সরকারের ময়দানে উভয় পক্ষ ইজতেমা করব। আমরা অন্য কোথাও ইজতেমা করব না, এখানেই করব। টঙ্গী ছাড়া আমাদের অন্য কোনো অপশন নেই।’
সাদপন্থিদের পক্ষ থেকে কোনো বিশৃঙ্খলার সুযোগ নেই বলেও জানান মোহাম্মদ সায়েম। তিনি বলেন, ‘জুবায়েরপন্থিরা সারা বছর ইজতেমা করলেও আমাদের আপত্তি নেই। আমরা শুধু বছরে একটা ইজতেমা করতে চাই।’
আলোচনায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রজ্ঞাপন
ইজতেমা নিয়ে ২০২৫ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। সেখানে সাদপন্থিদের পরবর্তী বছর থেকে টঙ্গীতে ইজতেমা না করার শর্তে ওই বছরের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই প্রজ্ঞাপনকে সূত্র ধরে সাদপন্থিদের ইজতেমা মাঠে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সরব শুরায়ে নেজাম। তবে সাদপন্থিরা ওই প্রজ্ঞাপনকে আলাপ-আলোচনা ছাড়াই সরকারের চাপিয়ে দেওয়া শর্ত হিসেবে দেখছেন।
হাবিবুল্লাহ রায়হান বলেন, ‘২০২৫ সালের পর সাদপন্থিরা টঙ্গী ময়দানে ইজতেমা করতে পারবে না। এই শর্তের ভিত্তিতে সে বছর তাদের ইজতেমা করার অনুমোদন দেওয়া হয়। শর্ত মেনে তারা ওই বছর ইজতেমা করেছে। এখন তো তাদের ইজতেমা করার প্রশ্ন আসে না।’

মোহাম্মদ সায়েম অবশ্য বলছেন, প্রজ্ঞাপনটি সম্পূর্ণ একপক্ষীয়, ভুয়া ও প্রতারণামূলক। তিনি বলেন, ‘ওই প্রজ্ঞাপনের বিষয়ে আমরা একমত নই। এটির প্রতিবাদ জানিয়ে তখনই আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে চিঠি দিয়েছি। সেটি আমলে নিয়ে পরে তারা আমাদের টঙ্গী মাঠ বুঝিয়ে দিয়েছে।’
বিভক্তির শুরু যেভাবে
ভারতের মাওলানা সাদ কান্ধলভীর একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ২০১৭ সালে বিশ্ব ইজতেমার আয়োজক তাবলিগ জামাতের নেতাদের মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়। এরপর থেকে বাংলাদেশে দুই গ্রুপ আলাদা হয়ে দুই পর্বে ইজতেমা আয়োজন করেছে।

এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে ২০১৭ সালের নভেম্বরে ঢাকার কাকরাইল মসজিদে উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়। পরের বছর কাকরাইল মসজিদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ হয়।
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে টঙ্গীর ইজতেমা ময়দান ও সংলগ্ন এলাকায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে উভয় পক্ষ। এতে একজন নিহত হয়েছেন, আহত হন তিন শতাধিক। ২০২৪ সালেও ইজতেমার মাঠ দখলকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের সংঘর্ষে তিনজন নিহত হন। আহত হন কমপক্ষে ৫০ জন।