স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পেয়ে বিএনপি ক্ষমতা নেওয়ার পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেন তিনি। এর পর থেকেই ছুটে বেড়াচ্ছেন দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয়। আজ বরিশাল, তো কাল কিশোরগঞ্জ, পরশু হয়তো মানিকগঞ্জ। শুধু চিকিৎসা বা ব্যবস্থাপনা দেখেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না, হাঁড়ির ঢাকনা তুলে দেখছেন রোগীদের দেওয়া হচ্ছে কেমন খাবার। আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে কোথাও অনিয়ম পেলে সঙ্গে সঙ্গে নিচ্ছেন ব্যবস্থা, সমস্যা সমাধানে কর্তৃপক্ষকে দিচ্ছেন নির্দেশ।
গত সাত মাসে কম-বেশি ৪০টি হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। যার বেশিরভাগই ছিল আকস্মিক। পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই হাসপাতালে হাজির হয়ে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের অনুপস্থিতি, ওষুধ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, রোগীকে বাইরে থেকে ওষুধ বা স্যালাইন কিনতে বলা, ব্যক্তিগত ক্লিনিক পরিচালনা এবং রোগীদের হয়রানির মতো নানা সমস্যা দেখতে পেয়েছেন তিনি। কখনো তিনি খাবার চামচে নিয়ে চেখে দেখছেন, কখনোবা হাসপাতালে জনবল সংকট, রোগীদের ওষুধ, ব্যবস্থাপনাসহ নানা বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। দালালদের দৌরাত্ম্য, ট্রলি বাণিজ্যের বিষয়েও নজর রাখছেন মন্ত্রী।
গত ১৪ মার্চ স্বাস্থ্যমন্ত্রী মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সকাল সাড়ে ৮টায় হাজির হন। চিকিৎসক সংকট, চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি এবং দায়িত্ব পালনে অবহেলা দেখে প্রকাশ করেন চরম অসন্তোষ।
আবার সাতক্ষীরার তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সদর হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে দীর্ঘদিন ছুটি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত দুই চিকিৎসককে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দেন মন্ত্রী।
অন্যদিকে, নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে স্যালাইন মজুদ থাকার পরও এক রোগীকে বাইরে থেকে স্যালাইন কিনতে বলা হয়। বিষয়টি জানতে পেরে রোগীকে স্যালাইনের টাকা ফেরত দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এক চিকিৎসক ৪৫ মিনিট দেরিতে হাসপাতালে আসায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দেন নির্দেশ।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ঝটিকা সফরগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, বারবারই উঠে আসছে একই ধরনের সমস্যা। এর মধ্যে চিকিৎসক-নার্সদের অনুপস্থিতি, ওষুধ-সরঞ্জাম অব্যবস্থাপনা, অপরিচ্ছন্নতা, রোগীকে বাইরে থেকে ওষুধ/স্যালাইন কিনতে বলা, সুযোগ থাকার পরও পরীক্ষা বাইরে করতে বলা, জনবল ঘাটতি এবং জবাবদিহির অভাব অন্যতম। এসব ঘটনায় কোথাও বদলি, কোথাও সাময়িক বরখাস্ত এবং কোথাও মামলা করার নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী।
এসব আকস্মিক সফরের কারণ মন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছিল আগামীর সময়। জবাবে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে তিনি বললেন, ‘দেশের স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত চিত্র সরেজমিনে গিয়ে দেখতেই আমি হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করছি। গত এক মাসে ২৫টির বেশি হাসপাতাল পরিদর্শন করে চিকিৎসকদের শতভাগ উপস্থিতি পেয়েছি। রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, চিকিৎসকদের আচরণ ও খাবারের মানে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। পাশাপাশি বিছানার চাদর, মশারি ও হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রেও উন্নতি দেখতে পেয়েছি।’
চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে ও অনিয়ম বন্ধে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হাসপাতাল পরিদর্শনে খুশি রোগী ও তাদের স্বজনরা। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সাধারণ মানুষের প্রশংসায় ভাসছেন এই মন্ত্রী। তার এই কাজকে ভারতীয় বাংলা সিনেমা ‘ফাটাকেষ্ট’তে নায়কের অন্যায়-অবিচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের সঙ্গেও তুলনা করছেন অনেকে। তার জন্য দোয়া করেও পোস্ট দিতে দেখা গেছে অনেককে।
তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হাসপাতাল পরিদর্শন নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে পাওয়া গেল মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তার এসব কাজ দেশের রোগী এবং চিকিৎসকদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে এবং চিকিৎসকরা হুমকিতে পড়বেন— উঠে আসছে এমন আশঙ্কার কথাও। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্থ এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার ফাটাকেষ্ট মার্কা বক্তব্য দিয়ে জনগণ ও চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে যে সংঘাত উসকে দিচ্ছেন, এর পরিণতি হবে ভয়াবহ।’
পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম মনে করেন, আসল সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী না হয়ে, নিজের ব্যর্থতা আড়াল করতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রতিদিন মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে রোগী ও চিকিৎসক-চিকিৎসাকর্মীদের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হাসপাতাল পরিদর্শন নিয়ে কথা হয় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলছেন, ‘প্রতীকীভাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ কার্যক্রম চালাতে পারেন। এতে চিকিৎসাকেন্দ্রিক কিছু উন্নতিও চোখে পড়ছে। কিন্তু মন্ত্রী কতদিন, কতগুলো হাসপাতাল পরিদর্শন করবেন? বরং মন্ত্রীর ধারাবাহিক আকস্মিক পরিদর্শনে একই ধরনের অনিয়ম বারবার ধরা পড়ায় প্রশ্ন উঠছে, নিয়মিত প্রশাসনিক তদারকিতে এসব সমস্যা আগে শনাক্ত হচ্ছে না কেন! ঘাপলা কোথায়?’
স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পুরনো সিস্টেমের পরিবর্তনের ওপর জোর দিতে পরামর্শ দিলেন তিনি। অনিয়ম-দুর্নীতি হলে তাৎক্ষণিক শাস্তির পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি, জবাবদিহি ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কারের কথাও বললেন। তার মতে, এসব পর্যবেক্ষণের জন্য প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল আসবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছিলেন, ‘আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছি, তাই জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। সরকারি হাসপাতালে মানুষ যাতে মানসম্মত ও আন্তরিক সেবা পায়, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালে সেবার মান উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের প্রতিটি হাসপাতাল দালালমুক্ত করারও চেষ্টা করছেন বলে জানালেন।