৩০ কেজি চাল। দাম মাত্র ৪৫০ টাকা। হতদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির এই চাল অনেকের সংসারে খাবারের বড় ভরসা। প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে চাল পাওয়ার এই সুবিধা পরিবারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা। কিন্তু মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরজানাজাত ইউনিয়নে এই কর্মসূচি এখন নানা প্রশ্ন ও অভিযোগে জর্জরিত।
সুবিধাভোগীর তালিকায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম, কোথাও একই পরিবারের চারজন পর্যন্ত কার্ডধারী, আবার তালিকায় মৃত ব্যক্তি ও সৌদিপ্রবাসীর নাম। অভিযোগ— প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় অনেক পরিবার চাল পাচ্ছে না, অথচ তাদের নামেই বরাদ্দ করা চাল অন্য কেউ তুলে নিচ্ছে।
ডিলার নিয়োগ ও পরিবর্তনের প্রক্রিয়াতেও অস্বচ্ছতা। শুরুতে তানিয়া আক্তার নামে একজনকে ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও পরে স্থগিত করা হয়। এরপর কী প্রক্রিয়ায় এবং কার সিদ্ধান্তে বেশিরভাগ মাসে খলিল নামের এক ব্যক্তিকে দিয়ে চাল বিতরণ করা হলো, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন উঠেছে শিবচর উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলামের ভূমিকা নিয়ে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও অলিখিত ডিলারের সঙ্গে যোগসাজশে তালিকায় অনিয়ম করা হয়েছে এবং সুযোগ তৈরি হয়েছে বরাদ্দের চাল আত্মসাতের।
সরকারি হিসাবে ৯০০ সুবিধাভোগী: উপজেলা খাদ্য অফিসের তথ্যমতে, চরজানাজাত ইউনিয়নে আগস্ট মাসে ৯০০ নারী-পুরুষ খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ছিলেন। পুরুষের সংখ্যা ৪৮৭ এবং নারী ৪১৩ জন। এ মাসে তাদের মধ্যে ৫৩২ টন চাল বিতরণ করা হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সুবিধাভোগীদের একটি অংশ চাল না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
মৃত ব্যক্তির নামে কার্ড, চাল গেল কোথায়: চরজানাজাতের শাহিদা বেগমের স্বামী সাইদ ব্যাপারী দুই বছর আগে মারা গেছেন। কিন্তু খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকায় এখনো রয়েছে তার নাম। অথচ ডিলার ও তালিকাকারীদের তথ্যমতে, চাল দেওয়া হয়েছে সবাইকে। তাহলে সাইদ ব্যাপারীর নামে বরাদ্দ করা চাল গেল কোথায়— এ প্রশ্ন শাহিদা বেগমের। তিনি বলেছেন, ‘ছেলে-সন্তান নিয়ে অনেক কষ্টে আছি। ন্যায্যমূল্যে চাল দিয়েছিল, সেই চাল দিয়ে মোটামুটি সংসার ভালোই চলত। স্বামী মরে যাওয়ার পর সেই চাল আর আমরা পাই না। কারা যেন নিয়ে যায়।’ তিনি স্বামীর নামে থাকা কার্ড তার নামে বরাদ্দের আর্জি জানিয়েছেন।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, অর্ধশতাধিক পরিবার চাল পায়নি। এর মধ্যে লিটন ব্যাপারী, সালমা, রুবেল মিয়া, মহসিন ব্যাপারীসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডের পরিবার রয়েছে।
এক পরিবারের চারজনের নামে কার্ড: কর্মসূচির তালিকা নিয়ে বেশি আলোচনা একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে কার্ড থাকা ঘিরে। স্থানীয়দের দাবি, ইউনিয়নের মইজুদ্দিন উকিলকান্দি গ্রামের দুই ভাই শহিদুল ও সোহেল মিয়া দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে প্রবাসী। তাদের নামেও রয়েছে কার্ড। তবে তাদের মা রুমি বেগম বললেন, ‘আমরা ৮-৯ মাস ধরে চাল পাই না। আমার ছেলেরা বিদেশ থাকে। শুনছি, ছেলের নামে চালের কার্ড আছে তালিকায়। বাপুরে, কারা যেন চাল নিয়ে যায়, আমরা জানি না।’
জাবেদ আলী মাদবরেরকান্দির দেলোয়ার ব্যাপারীও এই ন্যায্যমূল্যের চাল পান। তার দুই মেয়ে রুমা ও সুমা এবং এক আত্মীয়ও চাল পেতেন। তবে বর্তমানে দেলোয়ার ও তার আত্মীয় চাল পেলেও মেয়েরা কয়েক মাস ধরে পাচ্ছেন না। দেলোয়ার ব্যাপারী বললেন, ‘চেয়ারম্যানকে পাইলে আমার চাল দেওয়াই লাগত। যেহেতু চেয়ারম্যান নাই, এ কারণে আমি কার কাছে গিয়ে বলব? এখন তো সব নেতা-পেতারা করে।’ একই পরিবারের চারজন কীভাবে চাল পেলেন জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘এলাকায় মাদবর সালিশি করি, এ কারণে আমাকে দিয়েছে।’
অসুস্থ রুবেলের বরাদ্দের চালও অন্যজনের নামে: রুবেল মিয়া জানিয়েছেন, তার ঘরে দুদিন ধরে চাল নেই। তিনি অসুস্থ। যা টাকা আয় করেন, তা ওষুধ কিনতেই চলে যায়। সরকারি চাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন। এর আগেও কয়েক মাস চাল পাননি। তিনি অভিযোগ করেন, চালের তালিকায় নাম থাকলেও তার বরাদ্দের চাল অন্য একজন তুলে নিচ্ছেন।
খাদ্য কর্মকর্তা-ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ: স্থানীয় কয়েকজন বলেছেন, প্রকৃত অসহায়দের চাল না দিয়ে ডিলার ও খাদ্য কর্মকর্তা সেগুলো আত্মসাৎ করে বিক্রি করে দিয়েছেন। তবে চাল বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করে শিবচর উপজেলা কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘নামগুলো স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য ও ডিলাররা তৈরি করেছেন। এখানে আমাদের কোনো হাত নেই।’ তবে ডিলার নিয়োগের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘ওই ইউনিয়নে কোনো ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তাই খলিল নামের ওই ব্যক্তিকে দিয়ে বিতরণ করা হয়েছে।’
চরজানাজাতের ইউপি সদস্য মোতালেব মেম্বার এ বিষয়ে বলেছেন, ‘যদি এরকম কেউ চাল না পেয়ে থাকে, আমাদের কাছে বললে আমরা সেটি দেখব।’
তবে চাল বিতরণকারী ডিলার খলিলুর নিরভল বলেছেন, ‘তালিকা করেছেন খাদ্য কর্মকর্তা, ইউপি মেম্বার ও চেয়ারম্যানরা। এ বিষয়ে আমি জানি না।’
মিলমালিক ওবাইদুর রহমান বলেছেন, ‘আমাকে যেভাবে তালিকা দেওয়া হয়েছে, আমি সেভাবেই এখান থেকে চাল পাঠিয়েছি।’
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির বিতরণ কার্যক্রম তদারকির জন্য চরজানাজাত ইউনিয়নে ট্যাগ অফিসার হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন অজয় দাস। কিন্তু মাঠপর্যায়ের তার উপস্থিতি কম। মাসে তিন দিন ধরে চাল বিতরণ করা হয়, কিন্তু তিনি গেছেন মাত্র এক দিন। নিজেই বলেছেন, ‘আমি শুক্রবার এক দিন শুধু ভিজিট করতে পেরেছি।’
শিবচর উপজেলার খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা জাকির হোসাইন বলেছেন, ‘এসব তথ্য আছে উপজেলা কর্মকর্তার কাছে, আমার কাছে না।’
চরজানাজাত ইউনিয়নের ইউপি সচিব আব্দুল হালিম এসব বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। ‘এসব দায়িত্ব ডিলার ও খাদ্য কর্মকর্তাদের। আমাদের না। তাদের কাছে গেলে তথ্য ভালো পাবেন’— বলেছেন তিনি।
তবে মাদারীপুর জেলা খাদ্য কর্মকর্তা মো. মোশারফ হোসেন বললেন, ‘যদি কেউ চাল বিতরণে অনিয়ম করে থাকে, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’