Image description

চার বছরের ফুটফুটে শিশু আফরোজ জাহান সাইবা নিখোঁজ হয়েছে দুই সপ্তাহের বেশি সময় পার হলো। অথচ স্বজনদের বুকফাটা আতঙ্কের মাঝেও প্রথম দুই দিন কেটেছে কেবল একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করানোর আকুতি জানিয়ে।

শিশুটির মা বিথী আক্তারের অভিযোগ, গত ৩০ আগস্ট বনানী সৈনিক ক্লাবের ফুটব্রিজের গোড়া থেকে সাইবা হারিয়ে যাওয়ার পর থানায় ছুটে যান তিনি। কিন্তু পুলিশ জিডি না নিয়ে উল্টো ধমক দিয়ে বের করে দেয়। পরদিনও তার জিডি নেওয়া হয়নি। অবশেষে ১ সেপ্টেম্বর সাইবার নানির উপস্থিতিতে জিডি নথিভুক্ত হলেও শিশুটির সন্ধান মেলেনি।

নানি শরীফা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জিডির তদন্ত কর্মকর্তা সরাসরি তাকে বলেছেন, ‘বাচ্চা খুঁজে বের করা পুলিশের কাজ নয়, আমাদের অন্যান্য কাজ আছে।’

যদিও তদন্ত কর্মকর্তা মো. বিল্লাল হোসেন এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তবে সিসিটিভি ফুটেজ না থাকায় কোনো তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

সম্প্রতি এক বেসরকারি টেলিভিশনের খবরে প্রকাশ পায়, গত ৭ মাসে দেশে প্রায় ১৬ হাজার শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে। পরবর্তীতে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাদের মধ্যে ১৪ হাজারের বেশি শিশু ফিরে এসেছে। কিন্তু নিখোঁজ থাকা প্রায় দুই হাজার শিশুর ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন মানবাধিকারকর্মীরা।

নিরাপত্তাহীনতা, প্রাণনাশের হুমকি কিংবা নিখোঁজের মতো স্পর্শকাতর ঘটনা নথিভুক্ত করতে জিডিই সাধারণ মানুষের প্রাথমিক আশ্রয়। কিন্তু অভিযোগের ঝুঁকি ও গুরুত্ব বুঝে ব্যবস্থা নেওয়ার সঠিক কোনো কাঠামো না থাকায় প্রায়ই ঘটছে মারাত্মক বিপর্যয়।

থানায় অভিযোগ না নেওয়া বা তদন্তে অবহেলার চরম মাশুল দেওয়ার একাধিক নজির রয়েছে। গত বছর ৩০ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে নিরাপত্তার আশঙ্কায় থানায় গিয়েও জিডি করতে ব্যর্থ হন মাহমুদা আক্তার নামের এক নারী। এর ঠিক আট দিন পর নিজ ঘর থেকেই উদ্ধার করা হয় তার রক্তমাখা মরদেহ।

একইভাবে সাতক্ষীরার ইসরাইল গাজী নিখোঁজের পর কালীগঞ্জ থানা জিডি না নেওয়ায় স্বজনদের ছুটতে হয়েছিল পাশের দেবহাটা থানায়। আর চট্টগ্রামের বায়েজিদ থানায় একের পর এক জিডি করে জীবনের নিরাপত্তা চেয়েও শেষ রক্ষা হয়নি আলী আকবর ওরফে ঢাকাইয়া আকবরের। গত ২৩ মে আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারাতে হয় তাকে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানার ওসির কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জিডির আইনি তাৎপর্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে সাবেক পুলিশ প্রধান নুরুল হুদা টাইমসকে বলেন, আদালতে জিডির সাক্ষ্যগত মূল্য অপরিসীম, তাই একে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। একে তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত গাফিলতি হিসেবেই দেখছেন।

অন্যদিকে, মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর পরিচালক এ এস এন নাসির উদ্দিন এলানের মতে, ভিআইপি ডিউটিসহ নানা চাপ থেকে পুলিশকে মুক্ত করে তদন্ত সংস্থাকে আলাদা করা এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এ সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র পথ।

খুলনার ডুমুরিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মুক্ত রায় চৌধুরীও নিশ্চিত করেন, নিখোঁজ হওয়ার পর সময় ক্ষেপণ না করে অভিযোগ পাওয়া মাত্রই জিডি নেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

অবশ্য পুলিশ প্রশাসন তুলে ধরছে তাদের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতার দিকটি। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৫০টি থানায় প্রতিদিন গড়ে ৩০-৪০টি এবং সারা দেশের ৬৩৯টি থানায় দৈনিক কয়েক হাজার জিডি হচ্ছে। বিশাল এই চাপ সামলানোর বিষয়ে ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. আকতার হোসেন গাফিলতির দায় অস্বীকার করে বলেন, অভিযোগের ধরন দেখেই পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নেয়।

তবে বিষয়টির সার্বিক সমাধানে পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সাড়া মেলেনি। পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন কিংবা ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) মোহাম্মদ ওসমান গণি—কারও সঙ্গেই যোগাযোগের চেষ্টা করে মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

থানায় গিয়ে হয়রানির এই চিরচেনা চিত্র আলোচনায় এসেছে জাতীয় সংসদেও। গত ২৮ এপ্রিল সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সাধারণ মানুষ যাতে জিডি বা মামলা করতে গিয়ে কোনো ভোগান্তিতে না পড়েন, সেজন্য ধাপে ধাপে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

তবে ভুক্তভোগী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কাগজের প্রতিশ্রুতি নয়, সাধারণ মানুষের জীবনের সুরক্ষায় চাই পুলিশের তাৎক্ষণিক দৃশ্যমান তৎপরতা ও সর্বোচ্চ জবাবদিহিতা।