ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনের সংগ্রহশালা সংস্কারের পর সেখানে নতুন করে জায়গা পেয়েছে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের একক কোনো ছবি রাখা হয়নি। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, আগরতলা মামলা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন কিংবা ৭ মার্চের ভাষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কোনো ছবিতেও তাকে দেখা যায়নি। যদিও ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সালের সময়ের কিছু ছবি ও পেপার কাটিংয়ে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি রয়েছে।
সংগ্রহশালায় ঢুকতেই দেখা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ১৯৫ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীর তালিকা। পাশাপাশি রয়েছে ডাকসুর বিভিন্ন সময়ের সম্পাদক ও নেতৃবৃন্দের তথ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি।
সংগ্রহশালার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে বিগত ১৭ বছরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও আন্দোলনের স্মারক। আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি, বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড, মোদি-বিরোধী আন্দোলন, ২৮ অক্টোবরের ঘটনা, শাপলা চত্বরসহ বিভিন্ন ঘটনার ছবি ও নথি এখানে স্থান পেয়েছে। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাষ্ট্রস্বীকৃত শহীদের তালিকাও রাখা হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে ডাকসুর ভূমিকারও আলাদা উপস্থাপন রয়েছে। জুলাইয়ের আন্দোলনে আহত শিক্ষার্থী ও আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের ছবি, জুলাই-পরবর্তী ডাকসুর বিভিন্ন প্রকাশনা এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন পত্রিকা ও বইও সংগ্রহশালায় রাখা হয়েছে।
বিশেষভাবে নজর কাড়ে গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি নিয়ে প্রকাশিত বইয়ের ব্রেইল সংস্করণ। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীসহ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্যও ইতিহাসকে সহজলভ্য করার উদ্যোগ হিসেবে এটি রাখা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগ্রহশালায় রয়েছে আলাদা একটি অংশ। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠ, ১১ জন কমান্ডার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর এবং বীরউত্তমদের ছবি রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও মুক্তিযোদ্ধা মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদের ছবিও রাখা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ের নানা দুর্লভ ছবিও রয়েছে এখানে। মুক্তিযোদ্ধাদের নামাজ পড়ার দৃশ্য, রাজাকারদের আটক করার ছবি, নারী মুক্তিযোদ্ধা রুবি ও সিতারা বেগমের ছবি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুমি ও ক্রিকেটার জুয়েলের ছবিও স্থান পেয়েছে। ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের ঐতিহাসিক মুহূর্তের ছবিও রয়েছে।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে সংগ্রহশালায়। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনের বিভিন্ন স্মারকের পাশাপাশি রয়েছে তমদ্দুন মজলিসের স্মৃতি, ভাষাশহীদদের প্রতিকৃতি এবং প্রথম শহীদ মিনারের ছবি। ঐতিহাসিক আমতলার সেই বিখ্যাত আমগাছের একটি অংশও সংরক্ষণ করা হয়েছে এখানে।
রবিবার দুপুরে ডাকসু ভবনের নিচতলায় সংস্কার করা সংগ্রহশালাটির উদ্বোধন করেন শিক্ষার্থী সংসদের মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা। এ সময় ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি দেখা যায়। এর মধ্যে একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) একটি অনুষ্ঠানের ছবি। সেখানে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’।
আরেকটি ছবিতে ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি গ্রুপ ছবিতে জিন্নাহকে দেখা যায়। ওই সম্মেলনেই ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাসকারী মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্রের দাবি সংবলিত প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছিল। অন্য ছবিটি ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে জিন্নাহর ছবি সংবলিত পাকিস্তানের ডন পত্রিকার একটি প্রতিবেদনের পেপার কাটিং।
সংগ্রহশালায় আবদুল হামিদ খান ভাসানী, এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, এম এ জি আতাউল গণি ওসমানী, নবাব সলিমুল্লাহ, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ছবি রয়েছে। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো একক বা গুরুত্বপূর্ণ ছবি সংগ্রহশালায় রাখা হয়নি। সেখানে ১৯৭৪ সালে তার দুই ছেলের বিয়ের ছবি এবং বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত তিনটি পেপার কাটিং রাখা হয়েছে। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা, আগরতলা মামলা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন কিংবা ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো ছবি সেখানে চোখে পড়েনি।
১৯৪৭—১৯৭১: ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ
সংগ্রহশালার ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল অংশে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের ছবি থেকে শুরু করে সে সময়ের আন্দোলনের বিভিন্ন দৃশ্য রাখা হয়েছে। সেখানে মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ কবিতার পাশাপাশি ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক পিয়ারু সরদারের ছবিও রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের কমান্ডার, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের ছবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর মুখাবয়ব এবং সাত বীরশ্রেষ্ঠের ছবিও স্থান পেয়েছে সংগ্রহশালায়। এসব ছবির নিচের দিকে মুক্তিযুদ্ধে একটি খোদাই চিত্র রয়েছে, যেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও আছেন।
১৯৭১—১৯৮১: বঙ্গবন্ধু থেকে জিয়া
১৯৭১ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সময়ের অংশে শেখ মুজিবুর রহমানের দুই ছেলের বিয়ের ছবি এবং বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত তিনটি পেপার কাটিং বাঁধাই করে রাখা হয়েছে। ‘বাংলাদেশে কোনো বিরোধীদল নেই’ শীর্ষক সংবাদের একটি পেপার কাটিং এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের দুটি ছবিও সংগ্রহশালায় রাখা হয়েছে।
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলের ছবি হিসেবে খাল খননের দৃশ্য, খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানের একসঙ্গে একটি স্থিরচিত্র, জিয়াউর রহমানের যুদ্ধের সময়ের দুটি ছবি এবং ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যালট পেপারের একটি ছবিও সেখানে স্থান পেয়েছে।
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ১৪টি স্থিরচিত্র রাখা হয়েছে সংগ্রহশালায়। এর মধ্যে রয়েছে শহীদ নূর হোসেনের শরীরে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তিপাক’ লেখা সেই আইকনিক ছবি। এছাড়া ডাকসুর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত শহীদদের তালিকা এবং শহীদ আসাদকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যসহ আরও কয়েকটি ছবি রয়েছে।
২০০৯—২০২৪: শাহবাগ থেকে জুলাই অভ্যুত্থান
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগ আন্দোলন, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ ও সানি হত্যাকাণ্ড, ২০২০ সালের মোদীবিরোধী আন্দোলন এবং সর্বশেষ জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন ছবি সংগ্রহশালায় সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়ের বিশেষ কোনো স্থিরচিত্র সেখানে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফাতিমা তাসনিম জুমা গণমাধ্যমকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ফ্যাসিবাদের সব আইকনের ছবি এখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাই এখানে রাখা হয়নি। আর ৭২-৭৫ সালের অংশে তো তার ছবি আছে।