চুল কাটার জন্য বাবার কাছ থেকে ১০০ টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১২ বছর বয়সী মো. রায়হান। এরপর কেটে গেছে প্রায় ৭ মাস। এই দীর্ঘ সময়ে ছেলের কোনো খোঁজ পাননি বাবা নাজিম উদ্দিন। অবশেষে স্থানীয় একটি মাহফিলের মাঠে বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে ছেলে রায়হানের। তবে ৭ মাস পর সন্তানকে ফিরে পেলেও সে আর আগের মতো হাঁটতে পারে না। কারণ তার ডান পা নেই।
রায়হানের বাড়ি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় গ্রামের নয়া পাড়ায়। তার পিতা নাজিম উদ্দিন পেশায় একজন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক। দীর্ঘদিন আগে রায়হানের মায়ের সঙ্গে তার বাবার বিচ্ছেদ হয়। নিখোঁজের আগে সে তার সৎ মায়ের সঙ্গে বসবাস করত বলে জানা গেছে।
পরিবারের অভিযোগ, নিখোঁজ হওয়ার পর রায়হান কক্সবাজারে গিয়ে একটি চক্রের কবলে পড়ে। মূলত ওই চক্রের সদস্যরা তাকে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে নিয়ে কৌশলে ডান পা কেটে তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করেছে। বর্তমানে রায়হান শারীরিকভাবে পঙ্গু হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছে পরিবারটি।
মো. রায়হান অভিযোগ করে বলে, আমি চুল কাটার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছিলাম। সেখান থেকে পালিয়ে কক্সবাজার চলে যায়। এরপর কিছু ছেলের সঙ্গে ট্রেনের ছাদে করে কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়েছিলাম। কিছু লোক আমাকে চারপাশে বাগান এবং মাঝখানে একটি ঘর- এমন একটি জায়গায় নিয়ে যায়। সেখানে আমার মতো আরও অনেক ছেলে-মেয়ে ছিল। একদিন রাতে আমি সেখানে তাদের সঙ্গে ঘুমিয়েছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার একটি পা নেই। তখন আমি এর কারণ জানতে চাইলে তারা আমাকে জানায়, আমি নাকি ট্রেনে এক্সিডেন্ট করেছি।
সে আরও বলে, তারা আমাকে প্রতিদিন ভিক্ষা করাত এবং ভিক্ষার টাকা একটি প্লাস্টিকের ব্যাংকে জমা রাখত। একপর্যায়ে তারা আমাকে বাড়ি থেকে ঘুরে আসার জন্য একটি গাড়িতে তুলে দেয়। এরপর আমি চুনতি মাহফিলে চলে যায়। সেখানেই আমার বাবার সঙ্গে দেখা হয়েছে। আমার সঙ্গে সেখানে যারা ছিল তাদের মধ্যে অনেকের পা এবং হাত ছিল না। সেখানে আমাদের সঙ্গে ২ জন পুরুষ ও একজন মহিলা ছিল। ওই মহিলার নাম ছিল সালমা।
শিশু রায়হানের বরাত দিয়ে পিতা নাজিম উদ্দিন বলেন, রায়হান একটি হেফজখানায় পড়ত। সে ওইখানে বেশি দুষ্টামি করত, তাই তাকে আমার সঙ্গে পানের ক্ষেতে কাজ করতে নিয়ে যেতাম। প্রায় ৭ মাস আগে তাকে আমি ১০০ টাকা দিয়ে চুল কাটার জন্য সেলুনে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সে ওই টাকা দিয়ে কক্সবাজার চলে যায়। সেখানে তার সঙ্গে কিছু ছেলের পরিচয় হয়। পরবর্তীতে তারা রায়হানকে কমলাপুর রেলস্টেশনে নিয়ে যায়। সেখানে তার এক পা কেটে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানো হয়। এমনকি ভিক্ষা করার জন্য চক্রটি তাকে একটি হুইলচেয়ারও কিনে দিয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, মাহফিলে আমাদের পার্শ্ববর্তী এক লোক রায়হানকে দেখতে পেয়ে আমাকে খবর দেয়। এরপর আমি তাড়াতাড়ি সেখানে গিয়ে তাকে খুঁজে নিই এবং দুজনেই কান্নায় ভেঙে পড়ি। ওই সময় দেখলাম, তার একটি পা নেই। এরপর তাকে বাড়িতে নিয়ে এসেছি। চক্রের সদস্যরা তাকে এতদিন আটকে রেখেছিল। হঠাৎ করে সে ৩৫০ টাকা বাস ভাড়া দিয়ে চলে এসেছে। তবে সে নিখোঁজ হওয়ার পর অভাবের কারণে থানায় জিডি বা অভিযোগ করিনি।
স্থানীয় মানবাধিকার কর্মী দেলোয়ার হোসেন রশিদী বলেন, ছেলেটাকে দেখে আমি খুবই মর্মাহত হয়েছি। আমার এই বয়সে এমন ঘটনা খুবই নজিরবিহীন। ছেলেটির ভাষ্য অনুযায়ী, একটি চক্র তার জীবনটা শেষ করে দিল। আমি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি সরকার এবং প্রশাসনকে এ ঘটনাটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিনীত আবেদন জানাচ্ছি।
লোহাগাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক বলেন, শিশুটি ৭ মাস আগে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেও তার পরিবার থানায় কোন অভিযোগ কিংবা জিডি করেনি। তার পরিবার জানিয়েছেন, সে নাকি কক্সবাজার ১ মাস ছিল। এরপর সেখান থেকে কমলাপুর নেওয়া হয়েছিল। তাই আমরা তাদেরকে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছি।
প্রসঙ্গত, রায়হান নিখোঁজ হওয়ার পর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর তার সন্ধান চেয়ে একটি ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করেন। এমন একটি ভিডিও বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই ভিডিওতে শিশু রায়হানকে বলতে শোনা যায়, জায়গা সংক্রান্ত বিরোধের মামলায় তার বাবা বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। আমার সৎ মা আমাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। তাই আমি ট্রেনে করে এখানে চলে এসেছি। আমার একজন ছোট ভাই ছিল তাকেও বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।