বিদায়ী অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু জাতীয় আয় বেড়েছে। তবে প্রবৃদ্ধির এই ইতিবাচক সূচকের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় একটি বড় দুর্বলতা থেকে গেছে। চড়া বাজারে খাওয়া-পড়া আর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচ বা ভোগ ব্যয় মেটাতেই মোট অর্থের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে। এর ফলে জাতীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগ কমে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। একইভাবে সরকারের ভোগ ব্যয়ও আগের তুলনায় বেড়েছে। যার প্রভাবে দেশজ ও জাতীয় সঞ্চয়ের অনুপাত ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় হিসাবের সাময়িক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে অর্থনীতির এমন চিত্র উঠে এসেছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৬১ লাখ ২০ হাজার ২০৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে চলতি বাজার মূল্যে সরকারি ও বেসরকারি ভোগে ব্যয় হয়েছে ৪৮ লাখ ১১ হাজার ৬৩৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে দেশের জিডিপির বিপরীতে মোট ভোগ ব্যয়ের হার দাঁড়িয়েছে ৭৮ দশমিক ৬২ শতাংশ। অর্থাৎ জিডিপির প্রায় পাঁচ ভাগের চার ভাগই চলে যাচ্ছে ভোগে, যার বেশিরভাগই যাচ্ছে বেসরকারি বা ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয় মেটাতে।
বিবিএসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, টাকার অঙ্কে দেশের ভোগ ব্যয় প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের মোট ভোগ ব্যয় ছিল ৩৩ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৮ লাখ ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খরচের পরিমাণ ছিল ৪৩ লাখ ২ হাজার ৯২৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। সবশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চলতি বাজার মূল্যে ভোগের আর্থিক আকার দাঁড়িয়েছে ৪৮ লাখ ১১ হাজার ৬৩৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে গত তিন অর্থবছরের ব্যবধানে দেশের মোট ভোগ ব্যয় বেড়েছে ১৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬৩৯ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপণ্যের চড়া দামের কারণে সাধারণ মানুষকে একই পরিমাণ পণ্য কিনতে আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। একইভাবে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাজ চালানো, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া এবং সরকারের প্রতিদিনের বিভিন্ন পরিচালন ব্যয় মেটানোর জন্য সরকারি ভোগ ব্যয়ও আগের তুলনায় বেড়েছে। এই বাড়তি খরচের চাপ সঞ্চয়ের ওপরও পড়ছে। যার কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, যা টেকসই স্থায়ী মূলধন গঠনের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
৭৩ শতাংশই বেসরকারি বা ব্যক্তিগত ভোগ: নিত্যদিনের বাজার-সদাই, পোশাক-আশাক, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ এবং যাতায়াতের পেছনে মানুষ যে টাকা ব্যয় করে, বিবিএসের ভাষায় সেটাকে বলা হয় ‘বেসরকারি ভোগ ব্যয়’। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মোট জিডিপির সিংহভাগই চলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের এই ব্যক্তিগত ভোগ মেটানোর পেছনে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মানুষের মোট ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ লাখ ৬৪ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা। ভোগের আর্থিক হিসাব অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে ব্যক্তিগত বা বেসরকারি ভোগ ব্যয় দেশের মোট জিডিপির ৭২ দশমিক ৯৫ শতাংশ দখল করে রেখেছে। অর্থাৎ জিডিপির প্রায় ৭৩ শতাংশ ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয়ে যাচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে দেশের মানুষের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক দৈনন্দিন খরচের খাতা। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যক্তিগত বা বেসরকারি ভোগ ব্যয়ের মোট আর্থিক পরিমাণ ছিল ৩০ লাখ ৭৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খরচের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ লাখ ৮ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকায়। পরবর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত বার্ষিক হিসাবে মানুষের ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয়ের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯ লাখ ৮২ হাজার ৯৬১ কোটি টাকা।
সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মানুষের মোট ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ লাখ ৬৪ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন অর্থবছরের ব্যবধানে ভোগ ব্যয় বেড়েছে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার ২৯১ কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয় ছিল দেশের মোট জিডিপির ৬৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সেই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ দশমিক ১৩ শতাংশে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও বেড়ে হয় ৭২ দশমিক ২২ শতাংশ এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপির ৭২ দশমিক ৯৫ শতাংশ অংশ দখল করে রেখেছে ভোগ ব্যয়।
এদিকে বিবিএসের তথ্য বলছে, অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেও ভোগের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি কমেছে। তথ্য অনুযায়ী, চলতি বাজার মূল্যে ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয় ১২ দশমিক ১০ শতাংশ বাড়লেও স্থির মূল্যে, অর্থাৎ মূল্যস্তরের পরিবর্তনের প্রভাব বাদ দিলে, ভোগ ব্যয়ের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি কমেছে। স্থির মূল্যে ভোগ ব্যয়ের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নেমেছে ৪ দশমিক ৫২ শতাংশে। অর্থাৎ চলতি দামের হিসাবে ভোগ ব্যয়ের বৃদ্ধি ১২ দশমিক ১০ শতাংশ হলেও মূল্যস্তরের পরিবর্তনের প্রভাব বাদ দিলে প্রকৃত ভোগ ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৫২ শতাংশ।
ক্রমাগত বেড়েই চলেছে সরকারি ভোগ ব্যয় দেশের প্রশাসনিক কাজ সচল রাখা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনা-সংক্রান্ত বিভিন্ন ব্যয়ের সরকারি ভোগ ব্যয়ও টাকার অঙ্কে বেড়েছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকারের চূড়ান্ত ভোগ ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৫৪ হাজার ৪১৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারি ভোগ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৫ হাজার ৫৬০ কোটি ৫০ লাখ টাকায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারের ভোগ ব্যয় ছিল ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারি ভোগ ব্যয়ের আকার দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৭৪০ কোটি ২০ লাখ টাকা। অর্থাৎ তিন অর্থবছরের ব্যবধানে রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের ভোগ ব্যয় বেড়েছে ৯২ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চলতি মূল্যে সরকারি ভোগ ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ, যা আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। তবে জিডিপির অনুপাতে সরকারি ভোগ ব্যয়ের হার আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোগ ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের চড়া দাম। পণ্যের দাম বাড়ার কারণে মানুষকে একই পরিমাণ পণ্য কিনতে আগের তুলনায় বেশি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধিও ভোগ ব্যয় বাড়ার অন্যতম কারণ। একটি দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদার সামগ্রিক পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, যা জাতীয় ভোগ ব্যয় বাড়ায়। এ ছাড়া সরকারি ভোগ ব্যয়ের আর্থিক আকার বৃদ্ধির পেছনে সরকারের পরিচালন ও প্রশাসনিক ব্যয়ের পরিবর্তনও ভূমিকা রাখে।
কমছে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ: আয়ের প্রায় সিংহভাগ অংশ ভোগ বা দৈনন্দিন খরচের পেছনে চলে যাওয়ায় জিডিপির তুলনায় ভোগের অংশ বাড়ছে। এর বিপরীতে কমছে দেশজ ও জাতীয় সঞ্চয়ের অনুপাত। বিবিএসের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় হিসাব পরিসংখ্যানের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট জিডিপির বিপরীতে সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ উভয়ের অনুপাতই আগের বছরের তুলনায় কমেছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, জিডিপির বিপরীতে দেশের অভ্যন্তরীণ দেশজ সঞ্চয়ের হার ধারাবাহিকভাবে কমেছে। জিডিপির তুলনায় দেশজ সঞ্চয়ের অনুপাত ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ২৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে এই দেশজ সঞ্চয়ের হার আরও কমে দাঁড়ায় ২১ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমেছে ২১ দশমিক ৩৮ শতাংশে। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে দেশজ সঞ্চয়ের অনুপাত কমেছে ০ দশমিক ৬০ শতাংশ। আর তিন অর্থবছরের ব্যবধানে কমেছে ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
এদিকে, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা বৈদেশিক আয় যুক্ত করার পরও দেশের সামগ্রিক জাতীয় সঞ্চয়ের হার নিম্নমুখী রয়েছে। বিবিএসের হিসাবে, জিডিপির বিপরীতে জাতীয় সঞ্চয়ের হার ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ২৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছিল ২৮ দশমিক ৪২ শতাংশে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে এ সঞ্চয়ের হার ছিল ২৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও কমে হয়েছে ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে জাতীয় সঞ্চয় কমেছে ০ দশমিক ৭৪ শতাংশ। আর তিন অর্থবছরের ব্যবধানে কমেছে ৩ দশমিক ০২ শতাংশ।
ভোগ ব্যয়ের উচ্চ অনুপাতের বিপরীতে দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগের জিডিপি অনুপাতও কমেছে। টাকার অঙ্কে বিনিয়োগ বাড়লেও জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের হার ক্রমান্বয়ে কমেছে। বিবিএস বলছে, জিডিপির অনুপাতে সামগ্রিক বিনিয়োগের হার ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ৩০ দশমিক ৯৫ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে হয় ৩০ দশমিক ৭০ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে হয়েছে ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাবে জিডিপির বিপরীতে মোট বিনিয়োগের হার সংকুচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ, যার মধ্যে বেসরকারিভাবে ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং সরকারিভাবে ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। সেই হিসাবে তিন অর্থবছরের ব্যবধানে বিনিয়োগের হার কমেছে ৩ দশমিক ০২ শতাংশ পয়েন্ট।
বিবিএসের বিনিয়োগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের অনুপাতও কমেছে। চলতি অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৭১২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। আগের অর্থবছরে ছিল ২২ দশমিক ০৩ শতাংশ। অর্থাৎ বেসরকারি বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত কমেছে ০ দশমিক ৫০ শতাংশ পয়েন্ট। অন্যদিকে, সরকারের সাময়িক বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯১ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা। সরকারি বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৪০ শতাংশে, যা আগের বছর ছিল ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক বিকাশ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মধ্যে সুস্থ ভারসাম্য থাকা অত্যন্ত জরুরি। দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে সাধারণ মানুষের ভোগের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও জাতীয় হিসাবের হিসাবে জিডিপির প্রায় ৮০ শতাংশ ভোগ ব্যয়ে গেলে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের অনুপাতে চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের স্থবিরতা দূর করতে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন জরুরি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনে মানুষের প্রকৃত আয় ও সঞ্চয় ক্ষমতা বাড়ানো না গেলে দীর্ঘমেয়াদে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের ওপর চাপ থাকতে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের অর্থায়নে বৈদেশিক উৎসের ওপর নির্ভরতাও বাড়তে পারে।
গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন কালবেলাকে বলেন, অর্থনীতিতে ভোগের একটি অবদান আছে। চাহিদা, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সচল রাখে ভোগ। তবে জিডিপির ৭৮ দশমিক ৬২ শতাংশ ভোগে ব্যয় হওয়ার পাশাপাশি সঞ্চয় ও বিনিয়োগের হার ধারাবাহিকভাবে কমা উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, ব্যক্তি ভোগের পরিমাণ বৃদ্ধির একটি অংশ উচ্চ মূল্যস্ফীতির ফল। এটি মানুষের প্রকৃত ভোগ বা জীবনমান বৃদ্ধির প্রমাণ নয়। মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক পরিবারের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বাড়লে সঞ্চয় ক্ষমতা কমে যায়। আবার সঞ্চয় হ্রাস পেলে বিনিয়োগের জন্য দেশীয় অর্থায়ন সংকুচিত হয় এবং বিদেশি ঋণ বা পুঁজির ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে।
ড. ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান ও প্রকৃত আয় বৃদ্ধি, আমানতের আকর্ষণীয় প্রকৃত সুদ নিশ্চিত করা এবং আর্থিক খাতে আস্থা ফেরানো জরুরি। সেইসঙ্গে ব্যবসার অনিশ্চয়তা কমিয়ে অবকাঠামো, জ্বালানি ও নীতিগত পরিবেশ উন্নত করে সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বেসরকারি বিনিয়োগে রূপান্তর করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ভোগ সক্ষমতা রক্ষা এবং অপচয়মূলক সরকারি ব্যয় বিশেষভাবে কমানো প্রয়োজন।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান কালবেলাকে বলেন, চলতি মূল্যে ভোগের প্রবৃদ্ধি বা আর্থিক আকার দ্রুত বাড়ার মূল কারণ হলো চড়া মূল্যস্ফীতি। বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে একই পরিমাণ কেনাকাটা করতেই মানুষকে বাধ্য হয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। ফলে চলতি মূল্যে ভোগের খাতা বড় দেখাচ্ছে। এর ফলে মানুষের সঞ্চয় করার সক্ষমতা কমছে এবং দেশের সার্বিক বিনিয়োগে একধরনের শ্লথতা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া নিজস্ব রাজস্ব পরিস্থিতি ও ব্যয় সংকটের কারণে সরকারের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ সক্ষমতাও কমে গেছে। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। অর্থনীতিতে বিনিয়োগ না বাড়ালে দেশের ভবিষ্যৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে না।