Image description

স্বামী মারা যাওয়ার পর দেবরের সঙ্গে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক নারী ও তার পরিবারের কাছ থেকে ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা ও এক ভরি স্বর্ণালংকার নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরে ‘বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে’ দাবি করে কাবিননামা দেওয়া হলেও তাতে নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে—এমন অভিযোগে কক্সবাজারের চকরিয়ার সুমি আক্তার পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারি মামলা করেছেন।

ঘটনাটি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের মরংঘোনা এবং কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া এলাকার বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার বাদী সুমি আক্তার দুই সন্তানের জননী। তার অভিযোগ, স্বামী মারা যাওয়ার পর শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে মালয়েশিয়াপ্রবাসী দেবর আজিজুর রহমানের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। শুরুতে দুই সন্তান থাকার কারণে তিনি এতে রাজি ছিলেন না। পরে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ ও বোঝানোর পর পরিবারকে রাজি করানো হয়।

আদালতে দাখিল করা অভিযোগে সুমি উল্লেখ করেন, ২০২১ সালের ২৯ নভেম্বর কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়ায় হাসিনা বেগমের বাসায় পরিবারের সদস্য ও অভিযুক্তদের উপস্থিতিতে কথিত বিয়ের কাবিননামা সম্পাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় কাবিননামায় বাদী ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে বলা হয়, বর আজিজুর রহমান মালয়েশিয়া থেকে স্বাক্ষর করে কাবিননামা পাঠিয়ে দেবেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়, বিয়ের বিষয়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে ২ লাখ টাকা, ৭০ হাজার টাকা, ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং এক ভরি স্বর্ণালংকার নেওয়া হয়। মামলায় এসবের আর্থিক মূল্যসহ মোট ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।

মামলার বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় তিন মাস পর সুমিকে এমন একটি কাবিননামা দেওয়া হয়, যাতে আজিজুর রহমানের স্বাক্ষর রয়েছে বলে তাকে জানানো হয়। এমনকি মোবাইল ফোনে আজিজুর রহমানও কাবিননামায় স্বাক্ষর করার কথা স্বীকার করেছেন বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কথাবার্তা ও আচরণে সন্দেহ তৈরি হলে সুমি কাবিননামার মূল বালাম দেখতে চান। এ সময় ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল তাকে আরও একটি কথিত কাবিননামার নকল দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

বাদীর দাবি, এরপর তিনি সংশ্লিষ্ট কাজীর কাছে গিয়ে মূল বালাম দেখতে চাইলে কাজী তা না দেখিয়ে সেখান থেকে চলে যান।

মামলায় ৫ নম্বর আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে কাজি মোহাম্মদ নূর এলাহী, নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার, ১৬ নম্বর পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়ন, চকরিয়া, কক্সবাজারকে। এদিকে সুমি ও তার পরিবারের অভিযোগ, কাবিননামায় কাজীর স্বাক্ষর ও সিল নিয়ে গুরুতর অসংগতি রয়েছে।

কাজি মোহাম্মদ নূর এলাহী এর আগে দাবি করেছেন, তার স্বাক্ষর নকল করে তার ছেলে ওই বিয়ে পড়িয়েছেন। 

কাজির এমন বক্তব্যের পর প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে—কাবিননামায় যদি সত্যিই তার স্বাক্ষর জাল করা হয়ে থাকে, তাহলে কে সেই স্বাক্ষর ব্যবহার করল, কোথায় কাবিননামা তৈরি হলো এবং কার মাধ্যমে কথিত বিয়ের রেজিস্ট্রেশন দেখানো হলো?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মামলার নথি অনুযায়ী কাজী মোহাম্মদ নূর এলাহী ১৬ নম্বর পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার। অন্যদিকে সুমির শ্বশুরবাড়ি চকরিয়ার কোনাখালী ইউনিয়নের মরংঘোনা এলাকায়।

তাই প্রশ্ন উঠছে—পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর ব্যবহার করে কোনাখালী এলাকায় কথিত নিকাহ ও কাবিননামা কীভাবে সম্পন্ন হলো?

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিকাহ রেজিস্টারের বালাম বই, কাবিননামার সিরিয়াল, রেজিস্ট্রেশন নম্বর, স্বাক্ষর, সিল এবং নিকাহ পড়ানো ব্যক্তির পরিচয় যাচাই করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

মামলার অভিযোগে সুমি আরও দাবি করেছেন, কাবিননামা ও টাকা-স্বর্ণের বিষয় নিয়ে তিনি সোচ্চার হওয়ার পর তাকে আসামিদের বসতবাড়িতে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট বিকেলে পরিবারের সদস্যরা চকরিয়া থানা পুলিশের সহযোগিতায় তাকে ওই বাড়ি থেকে উদ্ধার করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

সুমির অভিযোগ, প্রতারণার কারণে শুধু আর্থিক ক্ষতিই হয়নি; তিনি তার দুই সন্তান এবং প্রয়াত স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি ও পারিবারিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

ঘটনার প্রতিকার চেয়ে সুমি আক্তার কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতে ফৌজদারি মামলা করেছেন। মামলায় আজিজুর রহমান, জিয়াউর রহমান, নূর নাহার বেগম, হাসিনা বেগম ও কাজী মোহাম্মদ নূর এলাহীকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ৪৬৬/৪৬৭/৪৬৮/৪০৬/৪২০/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে আদালতে অভিযোগ করা মানেই আসামিরা দোষী—এমন নয়। অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচার ও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

সুমির আইনজীবী অ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম চৌধুরী বলেন, বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান। মামলার মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং ভুক্তভোগীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এদিকে স্থানীয়দের প্রশ্ন—একজন নারীর বিয়ে হয়েছে কি না, কাবিননামা আসল না জাল, কাজীর স্বাক্ষর কে ব্যবহার করেছে, নিকাহ কোথায় ও কার মাধ্যমে হয়েছে এবং টাকা-স্বর্ণ নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা কতটুকু—এসবের উত্তর মিলবে তদন্তেই।

বিশেষ করে নিকাহ রেজিস্টারের মূল বালাম বই, সংশ্লিষ্ট কাবিননামা, স্বাক্ষর ও সিলের ফরেনসিক যাচাই এবং কথিত নিকাহর প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি নেওয়া হলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।