মানববর্জ্য ড্রেন দিয়ে শোধনাগারে (ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) যাওয়ার কথা। সেখানে শোধনের পর তরল অংশটি নদীতে ফেলার নিয়ম। কিন্তু বাস্তবে বর্জ্য শোধনাগারে পৌঁছানোর পথই নেই। প্ল্যান্টের সংখ্যাও কম। ফলে অপরিশোধিত বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি মিশছে জলাশয়ে। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ছে ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও জন্ডিস।
এ সংকট মেটাতে ২০১২ সালে মহাপরিকল্পনা নেয় ঢাকা ওয়াসা। লক্ষ্য ছিল শতভাগ স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। তখন রাজধানীর ৩০ শতাংশ এলাকা নেটওয়ার্কের আওতায় ছিল। ২০৩৫ সালের মধ্যে বাকি ৭০ শতাংশ কাভারেজের স্বপ্ন দেখানো হয়।
অথচ ১৪ বছর পর কাভারেজ উল্টো কমে দাঁড়িয়েছে ২০ শতাংশে।
এ ব্যর্থতার পরও এখন ওয়াসা ২০৩৫ সালের মধ্যে বাকি ৮০ শতাংশ কাভারেজের দাবি করছে। তবে নগরবিদরা এ পরিকল্পনাকে ভুল বলছেন। তাদের মতে, শুধু বড় শোধনাগার করলেই সমাধান হবে না। ঢাকার মতো ঘিঞ্জি শহরে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে হবে। যেখানে নেটওয়ার্কে সম্ভব সেখানে নেটওয়ার্ক, আর যেখানে সম্ভব নয় সেখানে আধুনিক সেপটিক ট্যাংক ব্যবহার করতে হবে।
২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে ২৪ হাজার ৬০০ কোটি (২ বিলিয়ন ডলার) টাকা ব্যয়ে দীর্ঘমেয়াদি ‘ঢাকা স্যুয়ারেজ মাস্টারপ্ল্যান’ প্রণয়ন করে ঢাকা ওয়াসা, যা ওয়াসার স্যুয়ারেজ মাস্টারপ্ল্যান ২০১৩ নামে পরিচিত। পুরো নগরকে পয়ঃনিষ্কাশন নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে তিন ধাপে ২০৩৫ সালের মধ্যে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের কথা ছিল।
এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার জনতথ্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাদের আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সত্যি বলতে, বর্তমানে মাত্র ২০ শতাংশ এলাকা স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে। শতভাগ কাভারেজ পেতে নগরবাসীকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তা ছাড়া ঢাকা শহরের মোট জনসংখ্যা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি আছে। বিবিএস বলছে, ১.৩ থেকে ১.৪ কোটি আর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার মতে, তা প্রায় ৩ কোটি। এ বাস্তবতায় মাস্টারপ্ল্যান পুনর্বিবেচনা ও সমন্বয় করতে কিছুটা সময় লাগছে। তবে আমাদের মূল লক্ষ্য হলো, ঢাকার প্রতিটি বাসাবাড়ির শতভাগ পয়ঃবর্জ্যকে স্যুয়ারেজ লাইনে যুক্ত করা। সেই পানি আমরা ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে শোধন করে তবেই নদীতে ফেলব। ২০৩৫ সালের মধ্যে পুরো ঢাকা শহরকে শতভাগ স্যুয়ারেজ কাভারেজের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েছি আমরা। হয়তো কিছুটা কমবেশি সময় লাগতে পারে, তবে এ মহাপরিকল্পনা অবশ্যই বাস্তবায়নযোগ্য।’
২০১২ সালে একটি পাঁচতারকা হোটেলে পরিকল্পনাটি উন্মোচনকালে জানানো হয়, রাজধানীর ৩০ শতাংশ এলাকা নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০১৫ সালের প্রথম ধাপে পাগলা শোধনাগার উন্নতকরণ, মধুবাগ-পাগলা প্রধান লাইন সংস্কার, গুলশান-বনানীতে নতুন ব্যবস্থা এবং চারটি লিফট স্টেশন নির্মাণের কথা ছিল।
দ্বিতীয় ধাপে ২০২৫ সালের মধ্যে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে ছয়টি শোধনাগার নির্মাণের কথা ভাবা হয়। আর ২০৩৫ সালের মধ্যে শেষ ধাপে সাভার, টঙ্গী, কেরানীগঞ্জ, পূর্বাচল ও গাজীপুরে আরও পাঁচটি শোধনাগার নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
২০১২ সালের মহাপরিকল্পনা সংশোধন করে ২০১৯ সালে নতুন মাস্টারপ্ল্যান প্রকাশ করে ঢাকা ওয়াসা। এর আগেই ঢাকাকে পাঁচটি জোনে ভাগ করে দাশেরকান্দি, পাগলা, উত্তরা, মিরপুর ও রায়েরবাজারে পাঁচটি বড় শোধনাগার (এসটিপি) এবং স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে ২০৩৫ সালের মধ্যে দৈনিক ২০০ থেকে ২৫০ কোটি লিটার বর্জ্য শোধনের লক্ষ্য ধরা হয়।
পরবর্তীকালে ২০২০ সালে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান ২০৩০ সালের মধ্যেই শতভাগ শোধনাগার নির্মাণের নতুন ঘোষণা দেন। তবে জমি অধিগ্রহণ ও স্থান বাতিল জটিলতায় প্রকল্পগুলো ঝুলে আছে। এ ছাড়া ওয়াসার এখন বড় সংকট হচ্ছে— প্ল্যান্ট আছে, বর্জ্যও আছে কিন্তু নেটওয়ার্ক নেই। ফলে কাভারেজ তো বাড়েইনি, বরং তা কমে ২০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা এ মাসের শুরুতেই ওয়াসা জানিয়েছে।
কাভারেজ কমার মূল কারণ শোধনাগারগুলোর বেহাল ও বাস্তবায়নহীনতা। কাগজে-কলমে পাঁচটি প্ল্যান্টের কথা থাকলেও চালু আছে মাত্র দুটি— যার একটি নতুন, অন্যটি জরাজীর্ণ। এর মধ্যে দাশেরকান্দিতে ৫০ কোটি লিটার ধারণক্ষমতার বিপরীতে শোধন হচ্ছে ৩০ কোটি লিটার। অন্যদিকে, পাগলা প্ল্যান্টের ক্ষমতা এখন নেমে এসেছে ১২ কোটি লিটারে; যা উন্নত করে ২০ কোটি লিটারে নিতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
বাকি তিনটি প্ল্যান্ট শুধু প্রস্তাব আর কাগজের ফাইলে বন্দি। উত্তরার প্ল্যান্টের জমি অধিগ্রহণ শেষ হলেও মিরপুরের অধিগ্রহণ এখনো ঝুলন্ত। আর রায়েরবাজার প্ল্যান্টটি পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে শেষ পর্যন্ত বাতিলই হয়ে গেছে; যা এখন যুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে পাগলা প্ল্যান্টের সঙ্গে। ফলে প্রকল্পগুলোর দীর্ঘসূত্রতা আর সিদ্ধান্তহীনতাই মূলত কাভারেজ বাড়ানোর বদলে উল্টো কমিয়ে দিয়েছে।
শোধনাগারগুলোর চরম ব্যর্থতার বিপরীতে রাজধানীতে প্রতিদিন ২০০-২৫০ কোটি লিটার পয়ঃবর্জ্য তৈরি হচ্ছে। ওয়াসার দৈনিক উৎপাদিত ৩০০ কোটি লিটার পানির ২০ শতাংশ সিস্টেম লস। বাকি ২৪০ কোটি লিটারের প্রায় ৯০ শতাংশই পয়ঃবর্জ্য বা ওয়েস্ট ওয়াটারে পরিণত হয়। এই বিশাল বর্জ্য শোধন ছাড়াই দুই সিটি করপোরেশনের ৩৭টি আউটলেট দিয়ে সরাসরি গড়াচ্ছে তুরাগ, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীতে।
ফলে নদীর পানিতে অক্সিজেন সংকট দেখা দেওয়ায় জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে বিষাক্ত বর্জ্য জমে হাতিরঝিলসহ শহরের লেক ও খালগুলো ক্ষতিকর গ্যাস চেম্বারে পরিণত হচ্ছে। এসব জলাশয় থেকে প্রতিনিয়ত ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। পরিবেশবিদদের মতে, দ্রুত শতভাগ স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে না পারলে ঢাকার পুরো পরিবেশগত ভারসাম্য ধ্বংস হয়ে যাবে।
পরিবেশবিদ অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘ঢাকার ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ ব্যবস্থা মূলত বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য তৈরি। তবে সুনির্দিষ্ট স্যুয়ারেজ লাইন না থাকায় গৃহস্থালির কঠিন বর্জ্য ও মলমূত্রও এসব ড্রেনে ফেলা হচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হলেই এসব নোংরা মানববর্জ্য উন্মুক্ত হয়ে চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায়। এতে নগর জুড়ে ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও কলেরার মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব প্রতিনিয়ত বাড়ছে।’
এ পরিবেশবিদ বলছিলেন, ‘অন্যদিকে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। আবার পর্যাপ্ত স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কের অভাবে মাটির উপরিভাগের দূষিত বর্জ্য চুইয়ে নিচের পানির স্তরে গিয়ে মিশছে। এর ফলে এ নগরের গভীর নলকূপের পানিও দীর্ঘমেয়াদে পানের অযোগ্য হয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।’
তবে নগর পরিকল্পনাবিদরা ওয়াসার পুরো মাস্টারপ্ল্যানকেই ভুল বলে চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, শুরু থেকেই নানা গলদে ভরা ছিল এ মহাপরিকল্পনা। কারণ অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা কোনো শহরকে পুরোপুরি স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কের আওতায় আনা মোটেও বাস্তবসম্মত নয়।
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘যেখানে একটি শহর এরই মধ্যে গড়ে উঠেছে, সেখানে নতুন করে স্যুয়ারেজের পুরো নেটওয়ার্ক তৈরির কোনো সুযোগ বা প্রয়োজন নেই। বরং কোন জায়গায় স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক সম্ভব আর কোথায় সেপটিক ট্যাংক বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে ব্যক্তিপর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা যায়— ওয়াসাকে আগে সেটি চিহ্নিত করতে হবে।’ একই ধরনের মত ড. আদিল মুহাম্মদ খানেরও।
তাদের মতে, পুরনো ও গড়ে ওঠা ঢাকার বেশিরভাগ অলিগলিই অত্যন্ত অপ্রশস্ত। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয় করে এসব রাস্তার নিচে পুরো নেটওয়ার্ক তৈরি করার মতো কোনো বাস্তবতা ঢাকায় নেই। এর পরিবর্তে রাজধানীর নতুন প্রসারিত এলাকাগুলোতে এ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরামর্শ এই বিশেষজ্ঞদের।
এ ছাড়া ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালু হয়েছে কিন্তু নেটওয়ার্ক নেই— এটাকে ওয়াসার সবথেকে বড় দুর্বলতা বলছেন নগর পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান। আগামীর সময়কে বলেছেন, বস্তি ঘিরে আলাদা পরিকল্পনা করতে হবে। এ ধরনের জায়গায় নেটওয়ার্ক কাজ করবে না। তাই ওয়াসার উচিত এলাকার ধরন বিবেচনায় নিয়ে নেটওয়ার্ক করা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মানেই শুধু স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক তৈরি করা নয়। অথচ ওয়াসার মাস্টারপ্ল্যানে একপেশেভাবে শুধু শোধনাগার (এসটিপি) ও নেটওয়ার্ককেন্দ্রিক চিন্তা করা হয়েছে—যাকে এ মহাপরিকল্পনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে মনে করেন তিনি।