Image description

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে ধারাবাহিক বাল্যবিয়ে বাড়ছে। দেশি-বিদেশি পৃথক দুটি সংস্থার তিন বছরের ব্যবধানে বাল্যবিয়ে নিয়ে প্রকাশিত তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সবশেষ (২০২৪ সালে প্রকাশিত) যৌথ জরিপ বলছে, এই জেলার ৭২ দশমিক ৮০ শতাংশ মেয়েকে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে স্বামীর সংসারের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। ৩৯ শতাংশ কিশোরীর ক্ষেত্রে ১৫ বছরের আগে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। এই বিশাল সংখ্যক মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে অপ্রাপ্ত বয়সে।

 

এই তথ্য প্রকাশের তিন বছর আগে ব্র্যাকের করা জরিপে সারা দেশের মধ্যে বাল্যবিয়ে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ। ‘বর্ন টু বি অ্যা ব্রাইড’ শীর্ষক জরিপের প্রতিবেদনে ব্র্যাক তখন তথ্য পায়–জেলার ৬৫ দশমিক ২ শতাংশ মেয়ের ১৮ বছরের আগের বিয়ে হওয়ার।

 

এই দুটি সংস্থার তথ্যের সঙ্গে মিল পাওয়া মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতির দিকে তাকালে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত) প্রশাসনের বাল্যবিয়েবিরোধী অভিযানের তথ্যমতে–জেলায় ১৮টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। যদিও অসমর্থিত সূত্রমতে–প্রশাসের অভিযানে বন্ধ হওয়ার পর ‘গোপনে’ এসব বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা হয়।

 

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও শিক্ষাবিদরা বলছেন, সব সময় প্রশাসনের কাছে বাল্যবিয়ে সম্পর্কিত তথ্য পৌঁছায় না। অনেকে গোপনে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। সেসব বিয়ের তথ্য হিসাবের বাইরে থেকে যায়। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রশাসন খবর পেয়ে অভিযান চালালে সাময়িক বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা স্থগিত হয়। বাবা-মায়ের কাছ থেকে কাগজে মুচলেকা প্রশাসনের লোকজন চলে যাওয়ার পর গোপনে বিয়ে সম্পন্ন করা হয়।

ধারাবাহিক বাল্যবিয়ের হার বাড়ার পেছনে রয়েছে একদিকে সামাজিক নিরাপত্তার ভয় ও দারিদ্র্য; অন্যদিকে প্রশাসনের সার্বক্ষণিক নজরদারির অভাব। স্কুলগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় এর গভীরতা অনেক।

 

বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকায় অবস্থিত ৯০ বছরের ঐতিহ্যবাহী নবাবগঞ্জ হাই স্কুলের শিক্ষার্থীদের একটি পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর এই স্কুলের ১৮ অনুর্ধ্ব শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার হার প্রায় ২০ শতাংশ।

 

ঝরে পড়ার বিষয়ে উদাহরণ দিয়ে বিদ্যালয়টির সহকারী প্রধান শিক্ষক শাহনাজ বেগম এশিয়া পোস্টকে বলেন, দারিদ্র্য যদি কারণ ‘এ’ হয়, বাল্যবিয়ে হলো কারণ ‘বি’। দুটো একসূত্রে গাঁথা। অনেক সময় পরিবারগুলো কৌশল বদলে মেয়েদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়ি পাঠিয়ে গোপনে বিয়ে দিয়ে দেয়। সচেতনতা, কাউন্সিলিং এবং প্রশাসন ও অভিভাবকের যৌথ প্রচেষ্টাই কেবল এটি থামাতে পারে।

 

একই এলাকার পলশা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোসলেম উদ্দিন জানান, মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে বাবা-মায়েরা সারাক্ষণ চিন্তায় থাকেন। সেই ভয় থেকে তারা দ্রুত মেয়েকে বিয়ে দিতে চান। ষষ্ঠ শ্রেণিতে যতগুলো মেয়ে ভর্তি হয়, এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত তাদের অনেকেই পৌঁছাতে পারে না; তার আগেই বিয়ে হয়ে যায়।

 

আইনে কী আছে

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী–বিয়ে করার জন্য পুরুষের ক্ষেত্রে ২১ বছর পূর্ণ না হলে অপ্রাপ্ত বয়স্ক এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে ১৮ পূর্ণ না হলে অপ্রাপ্ত বয়স্ক হিসেবে বিবেচনার বিধান রয়েছে। অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে করা মানে বাল্যবিয়ে।

 

প্রাপ্ত বয়স্ক কোনো নারী বা পুরুষ বাল্য করলে তিনি সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তিন মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অপ্রাপ্ত বয়স্ক কোন নারী বা পুরুষ বাল্যবিয়ে করলে তিনি সর্বোচ্চ এক মাসের আটকাদেশ বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় ধরনের শাস্তিযোগ্য হবেন।

 

বাবা-মা, অভিভাবক অথবা অন্য কোনো ব্যক্তি আইনি বা আইনবহির্ভূতভাবে অপ্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তিকে বাল্যবিয়ে দেওয়ার জন্য কোনো কাজ করলে সর্বোচ্চ দুই বছর ও সর্বনিম্ন মাস কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ জরিমানার বিধান রয়েছে।

 

কোনো ব্যক্তি বাল্যবিয়ে সম্পাদন বা পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ দুই বছর ও সর্বনিম্ন ছয় মাস কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। বাল্যবিয়ে নিবন্ধন করলে সর্বোচ্চ দুই বছর ও সর্বনিম্ন ছয় মাস কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং তার লাইসেন্স বা নিয়োগ বাতিল হবে।

 

আইন অনুযায়ী, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে জাতীয়, জেলা উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা এবং স্থানীয় পর্যায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তি সমন্বয়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে।

 

বাল্যবিয়ে বন্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাথমিক বা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি কোনো ব্যক্তির লিখিত বা মৌখিক আবেদন অথবা অন্য কোন মাধ্যমে বাল্যবিয়ের খবর পেলে বিয়ে বন্ধ করবেন অথবা বিধি মোতাবেক নির্ধারিত পদ্ধতিতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

সংকট যেখানে

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, আইন থাকলেও নজরদারির অভাব ও ঢিলেঢালা তৎপরতার কারণে বাল্যবিয়ের মতো অপরাধ ঢেকে রাখার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এমনকি শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও এই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। এমন একটি নজির পাওয়া গেছে গোমস্তাপুর উপজেলায়। সেখানকার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তার স্কুলের অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে বিয়ে করে সামাজিক চর্চাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেন।

 

ওই স্কুলশিক্ষক পরিচয় গোপন রেখে এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আইন সম্পর্কে আমার জানা আছে। চারপাশে অনেকেই তো এভাবে বিয়ে করছে। তাই পরিবারের সম্মতিতে করেছি, বয়স (স্ত্রীর) হলে রেজিস্ট্রি করে নেব।’

 

একইভাবে প্রশাসনিক অভিযানের পর দিন গোপনে বিয়ে করা এক তরুণ বলেন, ‘এটি যে অপরাধ তা জানতাম, কিন্তু পরিবারের জেদ ও সামাজিক চাপের কারণে বাধ্য হয়ে বিয়েটা করতে হয়েছে।’

 

আইন প্রয়োগকারীরা বলছেন, বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর প্রমাণ জোগাড় করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। অভিযানের সময় অনেক ক্ষেত্রে মেয়ের বাবার বাড়ি কিংবা ছেলের বাড়ি–কোথাও নবদম্পতিকে খুঁজে পাওয়া যায় না; পরিবারগুলোও বিয়ের খবর পুরোপুরি অস্বীকার করে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা কিংবা সুনির্দিষ্ট মামলা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

 

এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আনিসুর রহমান বলেন, যখন বাল্যবিয়ে হয় তখন রেজিস্ট্রি হয় না, বিয়ের প্রমাণক পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। এরপরও আমরা বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।

 

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, বাল্যবিয়ের ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার বা স্থানীয়দের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেলে পুলিশ তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রে বিয়ে গোপনে সম্পন্ন হওয়ায় এবং পরিবারগুলো তথ্য অস্বীকার করায় প্রমাণ সংগ্রহ ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

 

প্রতিকারে উদ্যোগ

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যেও আশার আলো জ্বালাতে কাজ করছে বেশ কিছু সমন্বিত প্রোগ্রাম। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) সহায়তায় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ও স্থানীয় সংস্থা ‘কনসার্নড উইমেন ফর ফ্যামিলি ডেভেলপমেন্ট’-এর যৌথ উদ্যোগে ‘গ্লোবাল প্রোগ্রাম টু অ্যান্ড চাইল্ড ম্যারেজ (জিপিইসিএম) ফেজ-৩’ প্রকল্প চালু করা হয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই প্রকল্পের আওতায় জেলার ৩৫২টি স্কুলে বিশেষ জীবনদক্ষতা সেশন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সহপাঠী শিক্ষা এবং মা-বাবার সঙ্গে নিয়মিত সচেতনতামূলক আলোচনার মতো কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এসব সেশনে শিক্ষার্থীদের অধিকার, সম্মতি, বাল্যবিয়ের কুফল এবং শরীরের সুরক্ষা নিয়ে দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়ে থাকে; যাতে তারা নিজেরা সচেতন হতে পারে এবং দ্রুত বিয়ের প্রস্তাব এলে সাহসের সঙ্গে ‘না’ বলতে শেখে।

 

সেশনে অংশ নেওয়া নবাবগঞ্জ হাই স্কুলের ১৩ বছর বয়সি সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আসফিয়া রেহানি জানায়, আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই এবং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। আমি পড়াশোনা চালিয়ে যাব, বাল্যবিয়ে করব না।

 

ছেলেদের চিন্তাভাবনায়ও এসেছে পরিবর্তন। একই স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আবু হানিফ বলে, পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে তবে বিয়ে করব। আয় না করে পরিবার গঠন করলে স্ত্রী-সন্তান কষ্টে পড়বে।

 

আরেক শিক্ষার্থী তাহমিদ ইসলাম যোগ করে, আমার বাবা ছোটবেলা থেকেই শিখিয়েছেন কম বয়সে বিয়ে না করতে। আমি পড়ে ও চাকরি করে বাবা-মাকে গর্বিত করতে চাই, তারপর সঠিক সময়ে বিয়ে করব।

 

নবাবগঞ্জ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হাসিনুর রহমান বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে নিজের ব্যক্তিগত কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, যে মেয়েটি পুতুল খেলার বয়সে আছে, সে কনে হতে পারে না। যখন ১৩ বছরের মেয়ে বলে সে পড়বে আর ১৪ বছরের ছেলে বলে সে অপেক্ষা করবে, তখনই বুঝি পরিবর্তন শুরু হয়েছে।

 

শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সচেতনতা দিয়ে বাল্যবিয়ে বন্ধ করা যাবে না উল্লেখ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিশিষ্ট আইনজীবী নূরে আলম সিদ্দিকি আসাদ বলেন, বাল্যবিয়ে বন্ধে প্রশাসনের অভিযান চালানোর পর বিয়েটি আবার হচ্ছে কি না, সেদিকে নিয়মিত নজর রাখতে হবে। কেবল কাগজে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিলে হবে না, দরকার হলে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। চাইল্ড ম্যারেজ প্রতিরোধে নানা ধরণের প্রগ্রামের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি মেয়েদের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা, অসাধু কাজীদের ওপর কড়া নজর রাখা এবং মুচলেকার বদলে আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত না করলে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাল্যবিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।