ভোরের আলো ফোটার আগেই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে হাতে সার্ফবোর্ড নিয়ে ছুটে আসেন এক কিশোরী। পর্যটকদের আনাগোনা তখনও শুরু হয়নি। নির্জন সৈকতে কিছুক্ষণ পর ঢেউ কেটে এগিয়ে যান তিনি।
তিনি ফাতেমা আক্তার। দারিদ্র্য, সামাজিক বাধা ও সমালোচনা পেরিয়ে সার্ফিংয়ে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন এই তরুণী। এবার বাংলাদেশের হয়ে ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় তিনি।
জাপানের আইচি-নাগোয়ায় অনুষ্ঠেয় ২০তম এশিয়ান গেমসে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার হিসেবে প্রতিযোগিতায় নামবেন ফাতেমা। কক্সবাজারের আরেক সার্ফার মো. মান্নান অংশ নেবেন পুরুষ বিভাগে।
এশিয়ান গেমস শুরু হবে ১৯ সেপ্টেম্বর। সার্ফিং প্রতিযোগিতা হবে ২৫ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর জাপানের আইচি প্রিফেকচারের তাহারা শহরের প্যাসিফিক লং বিচে।
দারিদ্র্য পেরিয়ে সার্ফিংয়ে
ফাতেমার শৈশব কেটেছে কক্সবাজারের মহেশখালীতে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে। পরে জীবিকার সন্ধানে পরিবারটি কক্সবাজার শহরের ঘোনারপাড়ায় চলে আসে।
চার ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় ফাতেমা ছোটবেলাতেই বাবা জয়নাল আবেদিনকে হারান। সন্তানদের দায়িত্ব কাঁধে নেন মা মনোয়ারা বেগম। পরিবারের খরচ চালাতে তিনি মানুষের বাড়িতে কাজ করতেন।
ছোটবেলা থেকেই সার্ফিংয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল ফাতেমার। কক্সবাজার সৈকতে অন্যদের সার্ফিং দেখে তার আগ্রহ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে সেটিই হয়ে ওঠে স্বপ্ন।
মেয়েদের জন্য এই খেলাকে উপযুক্ত মনে না করায় অনেকের সমালোচনা শুনতে হয়েছে তাকে। আর্থিক সংকটও ছিল বড় বাধা। তবে মেয়ের স্বপ্নে পাশে ছিলেন মা।
মনোয়ারা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ফাতেমার সার্ফিংয়ের প্রতি অনেক আগ্রহ। অনেকে অনেক কথা বলেছে। মানুষের কথায় মেয়ের স্বপ্ন থেমে যাক, তা আমি চাইনি। সে দেশের জন্য ভালো কিছু করতে পারলে এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে?’
ফাতেমা বলেন, ‘অনেকে অনেক কথা বলে। কিন্তু আমি সেসব শুনি না। কারণ সার্ফিং করতে আমার ভালো লাগে। আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।’
জাতীয় চ্যাম্পিয়ন থেকে এশিয়ান গেমসে
পরিশ্রমের স্বীকৃতি পেয়েছেন ফাতেমা। একাধিকবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
২০২৫ সালে ভারতের চেন্নাইয়ে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেন তিনি। দেশের বাইরে সেটিই ছিল তার প্রথম বড় অভিজ্ঞতা।
ফাতেমা বলেন, ‘চেন্নাই যাওয়ার পর সার্ফিং সম্পর্কে অনেক নতুন কিছু শিখেছি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে হলে আরও কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, সেটা বুঝতে পেরেছি।’
ভারতের তামিলনাড়ুতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান সার্ফিং চ্যাম্পিয়নশিপে পারফরম্যান্সের মাধ্যমে প্রথমবার এশিয়ান গেমসে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেন বাংলাদেশের সার্ফাররা।
এশিয়ান গেমসে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা ফাতেমার কাছে বড় অর্জন। তবে তার স্বপ্ন আরও বড়।
তিনি বলেন, ‘দেশের হয়ে খেলতে পারা আমার জন্য বড় অর্জন। এশিয়ান গেমসে ভালো করতে প্রতিদিন অনুশীলন করছি। আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন, একদিন বাংলাদেশের হয়ে অলিম্পিকে অংশ নেওয়া।’
সার্ফিংয়ের পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছেন ফাতেমা। তিনি কক্সবাজার পৌর প্রিপারেটরি হাইস্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ভোরে সার্ফিং, পরে স্কুলের পড়াশোনা। এভাবেই চলছে তার দিন।
মান্নানেরও আন্তর্জাতিক স্বপ্ন
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রথম পুরুষ সার্ফার হওয়ার পথে মো. মান্নান। কক্সবাজারের সমুদ্রে দীর্ঘদিন ধরে অনুশীলন করছেন তিনি।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ সুবিধা ও স্পনসরশিপ নেই বলে জানান মান্নান।
তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণ সুবিধা ও স্পনসরশিপের অভাবে প্রস্তুতির দিক থেকে আমরা অন্যদের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে। তারপরও আমি হাল ছাড়িনি। দেশের জন্য সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব।’
ফাতেমার কোচ রাশেদ আলমও পর্যাপ্ত সুযোগের অভাবের কথা জানান। তার মতে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রস্তুতির জন্য আরও সুযোগ ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ দরকার। পর্যাপ্ত স্পনসরশিপ না থাকায় সব সময় সেই সুযোগ পাওয়া যায় না। তারপরও ফাতেমা ও মান্নানকে নিয়ে আমরা আশাবাদী।’
যেভাবে হবে সার্ফিং প্রতিযোগিতা
এশিয়ান গেমসের সার্ফিং হবে জাপানের প্যাসিফিক লং বিচে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিযোগীরা একাধিক ঢেউয়ে সার্ফিং করবেন।
প্রতিযোগীদের সেরা দুটি রাইডের সম্মিলিত স্কোরে ফল নির্ধারণ করা হবে। বিচারকেরা কৌশল, গতি, শক্তি, সৃজনশীলতা ও সামগ্রিক পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে নম্বর দেবেন।