Image description

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) আইন অনুযায়ী এমবিবিএস বা বিডিএস ডিগ্রিধারী ছাড়া অন্য কারও নামের আগে ‘ডাক্তার’ (ডা.) পদবি ব্যবহারের সুযোগ নেই। তবে হাইকোর্টে করা একটি রিটের আদেশকে ভিত্তি করে ফিজিওথেরাপিস্টদের অনেকে নামের আগে ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করছেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্ট নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গত ১৭ জুলাই বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) ২৭ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রত্যেক সদস্য নামের আগে ‘ডাক্তার’ এবং শেষে ‘পিটি’ (ফিজিও থেরাপি) ব্যবহার করছেন। তবে ফিজিওথেরাপিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (প্যাব) সদস্যরা নামের আগে ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করছেন না।
এমন পরিস্থিতিতে আজ মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘হৃদরোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ফিজিওথেরাপি’। দিবসটি সামনে রেখে ফিজিওথেরাপিস্টদের পদবি ব্যবহার ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার এখতিয়ার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিএমডিসি আইন, ২০১০-এর ২৯ ধারা অনুযায়ী, বিএমডিসির নিবন্ধনভুক্ত মেডিকেল বা ডেন্টাল ইনস্টিটিউট থেকে এমবিবিএস বা বিডিএস ডিগ্রি অর্জনকারী ছাড়া অন্য কেউ নামের আগে ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না। এ আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

রিটের নিষ্পত্তি হয়নি
ফিজিওথেরাপিস্টদের ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহারের বিষয়টি গড়িয়েছে উচ্চ আদালত পর্যন্ত। বিপিএ সভাপতি রাজীব হাসানসহ সাতজন ফিজিওথেরাপিস্ট ২০১১ সালে হাইকোর্টে রিট করেন। তারা স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিওথেরাপিতে বিএসসি (পিটি) বা বিপিটি ডিগ্রিধারী বলে আবেদনে উল্লেখ করেন। রিটে বলা হয়, যোগ্য ফিজিওথেরাপিস্টদের ওপর বিএমডিসি আইন, ২০১০-এর ২৯ ধারা প্রয়োগ করে ফৌজদারি শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে ফিজিওথেরাপিস্টদের নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণে পৃথক কাউন্সিল গঠন এবং বিধিমালা প্রণয়নের দাবিও জানানো হয়।

পরে আদালত রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিএসসি (পিটি) বা বিপিটি ডিগ্রিধারীদের পেশাগত সেবা দেওয়ার সময় ওই আইনের আওতায় গ্রেপ্তার বা ফৌজদারি কার্যক্রমের মুখোমুখি না করার অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেন। প্রথমে আদেশটির মেয়াদ ছিল তিন মাস। পরে রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এ নির্দেশ বহাল থাকার কথা বলা হয়। তবে আদালতের ওই আদেশে ফিজিওথেরাপিস্টদের নামের আগে ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে— এমন স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।

বিএমডিসির আইনজীবী ব্যারিস্টার কাজী এরশাদুল আলম সমকালকে বলেন, মামলাটি শুনানির জন্য বিভিন্ন বেঞ্চে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিবার শুনানি শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট কোর্টের এখতিয়ার পরিবর্তন হয়ে যায়। কয়েকবার কার্যতালিকায় এলেও সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে মামলার নথি পাওয়া যায়নি। এ কারণে দীর্ঘদিনেও মামলাটির শুনানি করা সম্ভব হয়নি।

পদবি নিয়ে নেই সুনির্দিষ্ট নীতিমালা 
২০১৮ সালে বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন করা হয়। ২০২৫ সালে বিধিমালা এবং ২০২৬ সালে প্রবিধানমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইনের ১৯ ধারায় বলা হয়েছে, রিহ্যাবিলিটেশন পেশাজীবীরা নামের আগে বা পরে কী ধরনের পদবি, চিহ্ন, ডিগ্রি বা বর্ণনা ব্যবহার করবেন, তা কাউন্সিল নির্ধারণ করবে। আইনের ১৫ ধারায় রিহ্যাবিলিটেশন পেশাজীবীদের নিবন্ধন ও প্র্যাকটিশনার লাইসেন্সের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

বিপিএ সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, হাইকোর্টের রুল অনুযায়ী ফিজিওথেরাপিস্টরা ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করতে পারেন। রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলের কার্যক্রম এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। এ কারণে রিটটি নিষ্পত্তি হয়নি। কাউন্সিলের কার্যক্রম সম্পন্ন হলে রিট প্রত্যাহার করা হবে।
তবে প্যাব সভাপতি কামরুজ্জামান কল্লোল সমকালকে বলেন, বিএমডিসি আইনে ফিজিওথেরাপিস্টদের ‘ডাক্তার’ লেখার অধিকার নেই। আইনবহির্ভূতভাবে পদবি ব্যবহারের কারণে অনেকে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। রিট করে কেউ কেউ এ সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহারের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট আইনি নীতিমালা বা উচ্চ আদালতের স্পষ্ট রায় পাওয়া যায়নি।

ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রিউমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. নাহিদুজ্জামান সাজ্জাদ সমকালকে বলেন, অসহায় জনগোষ্ঠীর অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে কনসালট্যান্ট বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মনে করে চিকিৎসা নিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন। নামের আগে ‘কনসালট্যান্ট’ বা ‘ডা.’ পদবি ব্যবহার করে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে সাধারণ মানুষ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষের তদারকি দুর্বল থাকায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্টেরয়েড ইনজেকশন, বাতের ওষুধ এবং টোফাসিটিনিবের মতো ওষুধের অপপ্রয়োগ ঘটছে। এসব ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত বা ভুল প্রয়োগে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি ও রোগীর ক্ষতি হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

বিপিএর আইনজীবী রমজান আলী শিকদার বলেন, মামলার বাদীপক্ষের দাবি এখনও পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। এ কারণে মামলা চলছে। তাদের দাবি অর্জিত হলে মামলা প্রত্যাহার করা হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন মেডিকেল কলেজ এবং সরকারি হাসপাতালগুলোর নিয়োগবিধিতে ফিজিওথেরাপিস্ট পদটি ১০ম গ্রেডের। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ ‘সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল (কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৪’-এ বিএসসি ফিজিওথেরাপিস্ট পদটি ১১তম গ্রেডে। এ পদ নবম গ্রেডে উন্নীত করার দাবিও রয়েছে।
এদিকে রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইনে নিবন্ধন ছাড়া রিহ্যাবিলিটেশন পেশাজীবী হিসেবে কাজ করলে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। নতুন কাউন্সিলের অধীনে নিবন্ধন, পেশাগত পরিচয় এবং পদবি ব্যবহারের বিষয়টি দ্রুত স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।