আমের রাজা হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আম। যা দেশের বাজার ছড়িয়ে বিশ্বের বাজারে স্থান পেয়েছে বহুবার। তবে এ আমের ফলন পাওয়া যেত শুধু মৌসুমেই। অর্থাৎ খিরসাপাত (হিমসাগর) আম মানেই ছিল জ্যৈষ্ঠের স্বাদ। তবে প্রথা ভেঙে আমের মৌসুম শেষেও এখন বাজারে মিলছে এই সুস্বাদু আম। কিন্তু কীভাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে জাগো নিউজ।
সম্প্রতি জেলার বিভিন্ন এলাকার খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন পাওয়া যাচ্ছে গৌড়মতি, আশ্বিনা ও কাটিমন জাতের আম। তবে কয়েকজন চাষির বাগানে এখানো পাওয়া যাচ্ছে মৌসুমের সবচেয়ে বেশি সুস্বাদু আম খিরসাপাত (হিমসাগর)।
কৃষি বিভাগ বলছে মৌসুম ছাড়া এমন উৎপাদনকে চাষিদের নতুন ও সফল গবেষণা হিসেবে দেখছে কৃষি বিভাগ। তাদের মতে, এটি এখনো পরীক্ষামূলক হলেও বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে আমের দাম পাওয়ার পাশাপাশি চাঙা হবে জেলার অর্থনীতি। লাভবান হবেন চাষি। কারণ মৌসুমের আমের চেয়ে এ আমের দাম প্রায় কয়েকগুণ।

আম চাষিরা বলছেন, খিরসাপাত (হিমসাগর) আম উৎপাদন হয় মূলত মে মাসে। এটি একটি সিজনাল আম। আর এই আমের সুনাম ছড়িয়ে আছে বিশ্বজুড়েই। তবে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকজন চাষি আগস্ট মাসে এ আম গাছে ধরিয়েছেন। এটি ভালো খবর। এটি যদি বাণিজ্যিক আকারে করা যায়, তবে লাভবান হবেন চাষিরা। কারণ সিজনের চেয়ে তিনগুণ বেশি দামে বিক্রি হবে এ আম।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার আড়গাড়া গ্রামের আমচাষি গোলাম মোস্তফা। পরীক্ষামূলকভাবে আগস্ট মাসে গাছে খিরসাপাত ধরিয়ে তাক লাগিয়েছেন তিনি। এখন এসব আম বিক্রি করছেন ২৫ হাজার টাকা মণ দরে।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, জন্ম থেকেই আমি আম চাষের সঙ্গে জড়িত। আগে মৌসুমী আম চাষ করতাম। কিন্তু এসব আমে তেমন লাভবান হচ্ছিলাম না। সেই চিন্তা থেকে কাটিমন ও গৌড়মতি আমের চাষ শুরু করেছি। এজন্য মৌসুমী খিরসাপাত আমের গাছগুলোতে জাত পরিবর্তন করে কাটিমন আমে রূপান্তরিত করেছি। এসব গাছে কাটিমন আমের ফলনও হয়েছে বেশ। তবে গাছের গোড়া যেহেতু এখনো খিরসাপাত আমের, তাই এসব গাছের ডাল থেকে মুকুল বের হয়েছিল কয়েকমাস আগেই।
তিনি বলেন, আমি সেই মুকুলগুলোর পরিচর্যা শুরু করি। পরে দেখি এসময়ে এসে এসব গাছে খিরসাপাত আম ধরেছে। আমি এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার টাকার আম বিক্রি করেছি। আমি আশা করছি আগামীতে এই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে আরও বেশি আম ধরাতে পারব। এতে সহজেই লাভবান হওয়া সম্ভব।
শিবগঞ্জ উপজেলার ভাঙ্গাব্রিজ এলাকার আম চাষি সজিব আলী। কাটিমন আমের মাঝে মাঝে ঝুলছে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে সনদপ্রাপ্ত খিরসাপাত আম। আর পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। এমনকি বাগানেই ২০-২৫ হাজার টাকা মণ দরে কিনে নিতে চাইছেন ক্রেতারা।
তিনি বলেন, প্রথমে দেখে বিশ্বাস হচ্ছিল না। আমগুলোর দাম অনেক। ২০ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। এসময় যদি খিরসাপাত আম ধরানো যায়, সিজনের থেকে প্রায় তিন-চার গুণ বেশি দামে বিক্রি করা যাবে। পরীক্ষামূলকভাবে এটি করে দেখছি। আশা করছি অসময়েও উৎপাদন করতে পারব। এবারো আম বিক্রি করেছি।
শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রোডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল খান শামীম বলেন, সারাজীবন শুধু মৌসুমে জিআই স্বীকৃত আম খিরসাপাত পাওয়া যেত। মৌসুমে এ আম বিক্রি হয় মাত্র ১ থেকে দেড় হাজার টাকা মণ। কিন্তু চাষিরা গবেষণা করে নতুন পদ্ধতি বের করেছেন। খিরসাপাত গাছে কাটিমন জাতের ডাল গ্রাফটিং করার পর পূর্বের ডালের শিকড় বের হয়ে আম ধরছে। আর কলম করা ডালেতো কাটিমন আম আছেই। তাই চাষিরা এখন পরীক্ষামূলকভাবেই খিরসাপাত অসময়ে ধরানোর চেষ্টা করছেন। এ পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে আম সেক্টরকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। একসময় কয়েক হাজার কোটি টাকার আমের বাজার বাড়বে।
জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, দেশের বাজারের বাইরে গিয়ে খিরসাপাত আমের চাহিদা আছে বেশ। এজন্য দেশ থেকে বিদেশে সবচেয়ে এই আমটি রপ্তানি হয় বেশি। তবে এটি মৌসুমের শুরুতে হওয়ায় তেমন দাম পান না চাষিরা। কারণ এমন সময়ে গুটি জাতের সবগুলো আম একসঙ্গে পেকে যায়।
তিনি আরও বলেন, চাষিদের নতুন যে পদ্ধতি, এটি এর আগে হয়নি। এসময়ে এসে খিরসাপাত আম কোনোদিন ধরানো যায়নি। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এটি নিয়ে আমরা কাজ করব।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. আব্দুল হালিম বলেন, আমের মৌসুম ছাড়া এমন উৎপাদনকে চাষিদের নতুন ও সফল গবেষণা হিসেবে দেখছে কৃষি বিভাগ। এটি এখনো পরীক্ষামূলক হলেও বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে আমের দাম পাওয়ার পাশাপাশি চাঙা হবে জেলার অর্থনীতি। লাভবান হবেন চাষি।