প্রক্রিয়াজাত খাবারেও উদ্বেগজনক মাত্রায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকরা। বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া ৩২ ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য পরীক্ষা করে ছয় ধরনের ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি পণ্যে সিসা ও ক্রোমিয়ামের মাত্রা আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত অনুমোদিত সীমার চেয়ে কয়েক গুণ থেকে কয়েকশ গুণ। সবচেয়ে বেশি দূষণের তথ্য মিলেছে বিভিন্ন পানীয়তে। কয়েকটি বেকারি পণ্য ও চকলেটেও সিসার মাত্রা ছিল অত্যন্ত বেশি।
এসব খাবার গ্রহণের ফলে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও মূল্যায়ন করেছেন গবেষকরা। তাতে দেখা গেছে, পরীক্ষা করা ৩২টি পণ্যের মধ্যে ৩১টিতেই শিশুদের ক্যান্সারসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এমন ঝুঁকি পাওয়া গেছে ৯টি পণ্যে। এ ছাড়া কয়েকটি খাদ্যপণ্যের শ্রেণিতে শিশুদের ক্ষেত্রে ক্রোমিয়াম ও নিকেলের সম্ভাব্য ক্যান্সারজনিত ঝুঁকিও গ্রহণযোগ্য সীমার ওপরে পাওয়া গেছে।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব উলংগংয়ের গবেষকরা যৌথভাবে গবেষণাটি করেছেন। এটি গত ২২ আগস্ট আন্তর্জাতিক সাময়িকী জার্নাল ফর ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিসে প্রকাশিত হয়েছে।
ছয় ধরনের ভারী ধাতু
পরীক্ষা করে পাওয়া ছয় ধরনের ভারী ধাতুর মধ্যে রয়েছে– সিসা, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, তামা ও নিকেল। খাবারের নমুনায় এসব ধাতুর ঘনত্ব নির্ধারণের পর খাবারের মাধ্যমে মানুষের শরীরে এগুলো প্রবেশের সম্ভাব্য মাত্রা এবং সেই সংস্পর্শে স্বাস্থ্যঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষকরা বিশেষ ধরনের পরীক্ষাগার পদ্ধতি ব্যবহার করে খাদ্যপণ্যে ভারী ধাতুর মাত্রা নির্ধারণ করেন। পরে দৈনিক খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ, শরীরের ওজন এবং ভারী ধাতুর ঘনত্ব বিবেচনায় নিয়ে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসাব করা হয়েছে। গবেষণায় সিসা ও ক্রোমিয়ামের মাত্রা কয়েকটি খাদ্যশ্রেণিতে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার ওপরে পাওয়া গেছে, বিশেষ করে মিষ্টিজাতীয় ও বেকারি পণ্যে।
বিস্কুট, রুটি ও বেকারি পণ্যে দূষণ
গবেষণায় পরীক্ষা করা বিস্কুট, রুটি ও বেকারি পণ্যগুলোর বেশির ভাগেই অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি ক্রোমিয়াম ও সিসা পাওয়া গেছে। একটি কোম্পানির বিস্কুটে ক্রোমিয়ামের মাত্রা অনুমোদিত সীমার ১ দশমিক ২ গুণ এবং সিসা ২৫ দশমিক ৫ গুণ বেশি ছিল। অন্য আরেকটি কোম্পানির বিস্কুটে ক্রোমিয়াম ৭ দশমিক ৮ গুণ ও সিসা ২৯ দশমিক ৫ গুণ এবং বিস্কুট-৩-এ ক্রোমিয়াম ৭ দশমিক ৩ গুণ ও সিসা ৪৬ দশমিক ৫ গুণ বেশি ছিল। রুটিতে ক্রোমিয়াম ৩ দশমিক ৬ গুণ এবং সিসা ৩১ দশমিক ৩ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।
একটি কোম্পানির কেকে ক্রোমিয়াম ছিল অনুমোদিত সীমার ১৮ দশমিক ৭ গুণ এবং সিসা ১১৩ দশমিক ৩ গুণ বেশি। আরেক ধরনের কেকে ক্রোমিয়াম ৪ দশমিক ২ গুণ এবং সিসা ৩৫ দশমিক ১ গুণ বেশি ছিল। শুকনা কেকে ক্রোমিয়াম ৪ দশমিক ৯ গুণ এবং সিসা ৪৫ দশমিক ৫ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।
বেকারি পণ্যগুলোর মধ্যে ক্রিম রোলে দূষণের মাত্রা ছিল বেশি মাত্রায়। এতে ক্রোমিয়াম অনুমোদিত সীমার ৭০ দশমিক ৮ গুণ এবং সিসা ৩৫৭ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। ঘি টোস্টে ক্রোমিয়াম ৫ দশমিক ২ গুণ বেশি থাকলেও সিসা পাওয়া যায়নি। টোস্টে ক্রোমিয়াম ৭ দশমিক ২ গুণ এবং নিকেল ২ গুণ বেশি ছিল।
চানাচুরে ক্রোমিয়াম অনুমোদিত সীমার ৪ দশমিক ১ গুণ এবং সিসা ৩০ দশমিক ৯ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। একটি কোম্পানির চিপসে ক্রোমিয়াম ১ দশমিক ৫ গুণ ও সিসা ২৬ দশমিক ৩ গুণ বেশি ছিল। আরেকটি কোম্পানির চিপসে ক্রোমিয়াম ৩ দশমিক ৪ গুণ ও সিসা ২২ দশমিক ৯ গুণ বেশি। অন্য আরেকটি কোম্পানির চিপসে ক্রোমিয়াম ৭ দশমিক ৪ গুণ ও সিসা ১০ দশমিক ২ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। ঝালমুড়িতে ক্রোমিয়াম ছিল অনুমোদিত সীমার ৭ দশমিক ৩ গুণ এবং সিসা ১০ দশমিক ৫ গুণ বেশি।
ওয়েফারে একসঙ্গে চার ধরনের ভারী ধাতুর মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। এতে ক্রোমিয়াম অনুমোদিত সীমার ১১ দশমিক ৫ গুণ, নিকেল ২ গুণ, তামা ৪ দশমিক ৪ গুণ এবং সিসা ১২ দশমিক ৯ গুণ বেশি ছিল।
নুডলসে ক্রোমিয়াম অনুমোদিত সীমার ২ দশমিক ৭ গুণ এবং সিসা ৪১ দশমিক ১ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। চকলেটের কয়েকটি নমুনায় সিসা ও ক্রোমিয়ামের মাত্রা ছিল অনেক বেশি। দুধের চকলেটে ক্রোমিয়াম অনুমোদিত সীমার ৫৩ দশমিক ৩ গুণ এবং সিসা ২৯৪ দশমিক ৯ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। একটি কোম্পানির বাদাম চকলেটে ক্রোমিয়াম ২ দশমিক ২ গুণ, তামা ১ দশমিক ৪ গুণ এবং সিসা ১৪ দশমিক ৮ গুণ বেশি ছিল। আরেকটি কোম্পানির চকলেটে ক্রোমিয়াম ৭ গুণ এবং সিসা ১৩ দশমিক ৮ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। অন্য আরেকটি চকলেটে ক্রোমিয়াম ১৩ দশমিক ৩ গুণ, নিকেল ৫ দশমিক ৪ গুণ এবং সিসা ৩১ দশমিক ৬ গুণ বেশি ছিল।
দুধের গুঁড়ায় ক্রোমিয়াম অনুমোদিত সীমার ১২ দশমিক ৮ গুণ এবং সিসা ২৫ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। হরলিকসে ক্রোমিয়াম ১৩ দশমিক ৩ গুণ, নিকেল ৪ গুণ, তামা ৩ দশমিক ১ গুণ এবং সিসা ৫১ দশমিক ৫ গুণ বেশি ছিল।
আইসক্রিম বারেও একাধিক ভারী ধাতুর মাত্রা অনুমোদিত সীমার ওপরে ছিল। এতে ক্রোমিয়াম ১৪ দশমিক ৯ গুণ, নিকেল ৪ গুণ এবং সিসা ৪১ দশমিক ৮ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। কাপ আইসক্রিমে ক্রোমিয়াম ১৩ গুণ, নিকেল ৩ দশমিক ২ গুণ এবং সিসা ৩০ দশমিক ২ গুণ বেশি ছিল।
পানীয়তে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি
গবেষণায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে বিভিন্ন ধরনের পানীয়তে। এসব পণ্যে ক্রোমিয়াম, নিকেল, তামা ও সিসার মাত্রা কয়েক গুণ থেকে কয়েক শ গুণ পর্যন্ত বেশি ছিল। ফলের পানীয়তে ক্রোমিয়ামের মাত্রা অনুমোদিত সীমার ২৮৩ দশমিক ৬ গুণ, নিকেল ১৪৭ গুণ, তামা ৪ দশমিক ৭ গুণ এবং সিসা ৫৬৩ গুণ বেশি ছিল।
কফিতেও ভারী ধাতুর মাত্রা ছিল অত্যন্ত বেশি। এতে ক্রোমিয়াম অনুমোদিত সীমার ৭৪ দশমিক ৪ গুণ, নিকেল ৩৯ দশমিক ৫ গুণ, তামা ১ দশমিক ৬ গুণ এবং সিসা ১৩৯ দশমিক ৫ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। কমলার পানীয়তে ক্রোমিয়াম ছিল অনুমোদিত সীমার ৯১ দশমিক ২ গুণ, নিকেল ৮৮ গুণ এবং সিসা ১০৯ গুণ বেশি।
একটি কোম্পানির পানীয়তে ক্রোমিয়াম অনুমোদিত সীমার ১৯৮ দশমিক ৬ গুণ, নিকেল ২৩৭ দশমিক ৫ গুণ, তামা ২ দশমিক ১ গুণ এবং সিসা ২৩৪ দশমিক ৫ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। আরেকটি কোম্পানির পানীয়তে ক্রোমিয়াম অনুমোদিত সীমার ১৭৯ দশমিক ৮ গুণ, নিকেল ২৩৪ দশমিক ৫ গুণ, তামা ২ গুণ এবং সিসা ১৭৬ দশমিক ৫ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।
লিচুর পানীয়তে ক্রোমিয়াম ৪৩ দশমিক ৪ গুণ, নিকেল ৬১ গুণ, তামা ৬ দশমিক ৮ গুণ এবং সিসা ২২৯ দশমিক ৫ গুণ বেশি ছিল।
সবচেয়ে বেশি দূষণের চিত্র পাওয়া গেছে কৃত্রিম আমের পানীয়তে। এতে ক্রোমিয়াম অনুমোদিত সীমার ২৭৯ দশমিক ৬ গুণ, নিকেল ১৫১ গুণ, তামা ৪ দশমিক ৩ গুণ এবং সিসা ৫৯৪ গুণ বেশি ছিল।
অর্থাৎ ৩২টি পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সিসা পাওয়া গেছে কৃত্রিম আমের পানীয়তে অনুমোদিত সীমার ৫৯৪ গুণ বেশি। এরপর ফলের পানীয়তে ৫৬৩ গুণ, ক্রিম রোলে ৩৫৭ গুণ এবং দুধের চকলেটে ২৯৪ দশমিক ৯ গুণ বেশি সিসা পাওয়া গেছে।
ক্রোমিয়ামের ক্ষেত্রেও পানীয়গুলোতে মাত্রা ছিল অত্যন্ত বেশি। ফলের পানীয়তে ক্রোমিয়াম ছিল অনুমোদিত সীমার ২৮৩ দশমিক ৬ গুণ, কৃত্রিম আমের পানীয়তে ২৭৯ দশমিক ৬ গুণ এবং পানীয়-১-এ ১৯৮ দশমিক ৬ গুণ বেশি। একটি কোম্পানির পানীয়তে ক্রোমিয়াম ১৭৯ দশমিক ৮ গুণ বেশি ছিল।
নিকেলের ক্ষেত্রেও পানীয়গুলোতে উচ্চমাত্রার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। একটি কোম্পানির পানীয়তে নিকেল অনুমোদিত সীমার ২৩৭ দশমিক ৫ গুণ, পানীয়-২-এ ২৩৪ দশমিক ৫ গুণ, কৃত্রিম আমের পানীয়তে ১৫১ গুণ এবং ফলের পানীয়তে ১৪৭ গুণ বেশি ছিল।
গবেষণার ভূমিকা অংশে বলা হয়েছে, খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেটজাত করার বিভিন্ন পর্যায়ে ভারী ধাতু খাবারে ঢুকে পড়তে পারে। কাঁচামাল, পানি, উৎপাদন পরিবেশ এবং প্যাকেটজাত করার উপকরণও দূষণের উৎস হতে পারে। এ কারণে শুধু বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করাই যথেষ্ট নয়। খাদ্য উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়ায় ভারী ধাতুর সম্ভাব্য উৎসগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে
গবেষকরা বলছেন, শিশুদের শরীরের ওজন কম এবং তাদের বিভিন্ন অঙ্গ ও শারীরবৃত্তীয় ব্যবস্থা বিকাশমান থাকে। ফলে একই পরিমাণ খাবার গ্রহণ করলেও শরীরের ওজনের অনুপাতে শিশুদের ভারী ধাতু গ্রহণের মাত্রা বেশি হতে পারে। এ কারণে তারা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তবে এর অর্থ এই নয় যে এসব খাবার খেলেই কারও ক্যানসার হবে। গবেষণাটি খাদ্যপণ্যে ভারী ধাতুর উপস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ থেকে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন করেছে। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ক্যানসার হওয়ার সরাসরি কারণ হিসেবে এসব খাবারকে চিহ্নিত করা এই গবেষণার উদ্দেশ্য নয়।
গবেষণা দলের সদস্য ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পুষ্টি ও খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের প্রভাষক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্যাকেটজাত খাবার, হালকা খাবার, কোমল পানীয়, চিনিযুক্ত শস্যজাত খাবার, প্রস্তুত খাবারসহ অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার তৈরিতে একাধিক শিল্প প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়। এসব খাবারে প্রায়ই রং, মিশ্রণকারী উপাদান, সুগন্ধি ও অন্যান্য উপাদান যোগ করা হয়। আমরা বেশ কিছু কোম্পানির পণ্য পরীক্ষা করেছি। গবেষণা প্রতিবেদনে কোম্পানিগুলোর নাম উল্লেখ করিনি।
গবেষণার বিষয়ে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সহকারী অধ্যাপক ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ সাইফ হোসেন খান বলেন, প্রক্রিয়াজাত খাবার দীর্ঘদিন ভালো রাখা, জীবাণু ও ছত্রাকের বৃদ্ধি রোধ করা এবং স্বাদ ও রং বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করা হয়। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, বরং মানুষকে সচেতন হতে হবে। যতটা সম্ভব অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া, ঘরে রান্না করা টাটকা ও মৌসুমি খাবার বেশি খাওয়া এবং প্যাকেটের গায়ে লেখা উপাদানের তালিকা দেখে খাবার কেনার অভ্যাস করা উচিত।