Image description

বাংলাদেশ ব্যাংক ও সেনাবাহিনী পরিচালিত বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি লিমিটেডের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান আইটি সেবা নিচ্ছে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান থেকে। একই প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক তালিকায় রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বিদ্যুৎ বিভাগ, পেট্রোবাংলা, আইসিটি বিভাগ, তিতাস গ্যাস, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, কৃষি ব্যাংক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশকিছু রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

এসব প্রতিষ্ঠান ডিভাইন আইটির কাছ থেকে সফটওয়্যারসহ সাইবার সিকিউরিটি সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা নিচ্ছে। যেখানে সরকারের সর্বোচ্চ বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের এসব সেবা দেওয়ার মর্যাদা পাওয়ার কথা, সেখানে এই সেবা দিচ্ছে জয় ও জুনায়েদ আহমেদ পলকের বন্ধুর প্রতিষ্ঠান। ফলে যেকোনো সময় এসব খাতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। এছাড়াও হুমকিতে রয়েছে দেশের অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতা। গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক গোপন প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনে যেসব প্রতিষ্ঠানে জয় ও পলকের অংশীদারত্ব এবং ঘনিষ্ঠতার তথ্য পাওয়া গেছে সেগুলো হলোÑ ডিভাইন আইটি লিমিটেড, ডিভাইন ইনফরমেটিকস লিমিটেড, সিসটেক ডিজিটাল ও ডিভাইন মাইমানি। ডিভাইন আইটি ২০১৫ সাল থেকে পেট্রোবাংলার অধীনস্থ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশনের বিলিং, পেমেন্ট, কালেকশন, নেটওয়ার্ক ও ডেটা

সেন্টার সেবা দেয়। একই প্রতিষ্ঠান ২০১৬ সাল থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে সম্পূর্ণ ইআরপি সেবা দিয়েছে। এটি ২০১৮ সাল থেকে আইসিটি বিভাগের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট সেবা দেয় বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানিতে (বিডিসিসিএল)। ডিভাইন আইটি ২০১৫ সাল থেকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) আইটি সিকিউরিটি সার্ভিস সেবা দিয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সাল থেকে সরকারি সাইবার সংস্থার সিএ মনিটরিং সিস্টেম (সিএএমএস) বা জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা সেবা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ সাল থেকে এনবিআরের প্রিজম ভ্যাট সফটওয়্যার বা ভ্যাট অটোমেশন সেবা দিয়েছে। আইসিটি বিভাগের বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক অথরিটির অফিসিয়াল পার্টনারও ডিভাইন আইটি । বাংলাদেশ ব্যাংকের আইএসএস ও এমআইএস সেবা দিচ্ছে ডিভাইন আইটি। প্রতিষ্ঠানটি সেনাবাহিনী পরিচালিত অত্যন্ত সংবেদনশীল বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) ইআরপি সেবা দিচ্ছে।

একাধিক সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডিভাইন আইটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদ ফখরুল হাসান (রাসেল) ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী পলকের সঙ্গে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন অ্যাসোসিয়েশনের (বেসিস) মাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন। পলক ও রাসেল যৌথভাবে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের রূপকল্প-২০৪১ (ভিশন-২০৪১) বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছিলেন। পলক ছিলেন রাসেলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং তার দলীয় কার্যক্রম পরিচালনার অন্যতম অর্থদাতা। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ছেলে জয়ের ডিজিটাল বাংলাদেশে উদ্যোগের সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইসিটি টাওয়ার মিটিংয়ে প্রতিনিধিত্ব করতেন রাসেল। তার প্রতিষ্ঠান ডিভাইন আইটি জয়ের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জেভি (জয়েন্ট ভেঞ্চার) করে বেশ কয়েকটি কাজ করেছে। এর মধ্যে ‘আমরা প্রবাসী’ প্রকল্প উল্লেখযোগ্য। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সর্বোচ্চ আস্থাভাজন ব্যক্তি হিসেবে তিতাস গ্যাসের সম্পূর্ণ ইআরপি ও ডেটা সেন্টার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ডিভাইন আইটির বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ জয় ও পলকের ফেসবুক পেজ পরিচালনার দায়িত্ব (এডমিন) পালন করা। এছাড়াও আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগীদের নিয়ে উত্তরায় একটি ফ্রি বার পরিচালনা করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও। জুলাই আন্দোলন চলাকালে এবং পরবর্তী সময় সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের অভিযোগও রয়েছে ডিভাইন আইটির বিরুদ্ধে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আইটি খাতে ২০০৫ সাল থেকে প্রায় দুই দশক ধরে সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি সেবা দিয়ে আসছেন রাসেল। তার প্রতিষ্ঠান তিনটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামোর সেবা দিয়ে থাকেন। তবে ডিভাইন আইটির ব্যবসায়িক উত্থান মূলত ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ আমলে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জানান, ডিভাইন আইটি আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাব খাটিয়ে কাজ নিত। তিতাস গ্যাসসহ কিছু ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট করে কাজ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।

তারা আরো বলেন, ‘সরকারের খুব বিশ্বস্ত নয়, এমন ব্যক্তির হাতে বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড (বিডিসিসিএল), সিএ মনিটরিং সিস্টেম (সিএমএস), বাংলাদেশ ব্যাংক ও তিতাস গ্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ থাকা দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এসব প্রতিষ্ঠানের সফটওয়ার বা আইটি সেবা ডিভাইন আইটির হাতে থাকলে যে কোনো সময় তথ্যপাচার বা বড় ধরনের সাইবার বিপর্যয় ঘটিয়ে দেশের সর্বনাশ করতে পারে। তাই এ বিষয়ে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’

জয় ও পলকের ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আইটি সেবা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। সংশ্লিষ্ট দপ্তর এই বিষয়ে ভালো বলতে পারবে।’

বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি লিমিটেডের আইটি সেবা বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি উদ দৌলা চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে বিএমএফটি কী ধরনের সেবা নিয়েছে সেটা জানা যায়নি। তারা সম্ভবত প্রতারণামূলকভাবে তাদের ওয়েবসাইটের গ্রাহক তালিকায় বিএমএফটির লোগোসহ নাম ব্যবহার করেছে। পরবর্তী সময়ে তারা সেটা রিমুভ করে দিয়েছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের একজন সদস্য বলেন, ‘এনবিআরের তালিকাভুক্ত সফটওয়্যার ফার্মের মধ্যে ডিভাইন আইটি একটি। তারা ভ্যাট অটোমেশনসহ বিভিন্ন সফটওয়্যারের কাজ করছে। তাদের কাজের বিষয়ে এখন পর্যন্ত নেতিবাচক কিছু পাওয়া যায়নি।’

জয় ও পলকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিভাইন আইটির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও রাসেল আমার দেশকে বলেন, ‘জয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার যে এলিগেশন (অভিযোগ) তৈরি করা হয়েছে, সেটা নিয়ে আমি প্রচণ্ড বিরক্ত। এ ধরনের কোনো মানুষের সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই। আইসিটি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে পলকের সঙ্গে আমার কয়েকবার দেখা হয়েছে। তার সঙ্গে আমার কিছু ছবিও থাকতে পারে। কিন্তু আমি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কখনো পলকের কাছে যাইনি। আমার কোম্পানির গ্রাহক তালিকা ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘যেসব কোম্পানির সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর সবই সঠিক নয়।’

আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালীদের মাধ্যমে প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে কাজ নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রভাব খাটানোর বিষয়টি সঠিক নয়। নিয়ম মেনে আমি কাজ পেয়েছি। সফটওয়্যারের প্রজেক্ট অত্যন্ত কঠিন। আমি সময়মতো সব প্রজেক্ট ডেলিভারি দিয়েছি। আমাদের ২১ বছরের পুরোনো কোম্পানি। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আমাদের গ্রাহক অনেক। তাদের মধ্য থেকে কিছু নাম ওয়েবসাইটে রয়েছে।

নিজ ওয়েবসাইট থেকে বিএমটিএফের নাম ও লোগো সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওয়েবসাইট আমি দেখি না, এই বিষয়টি আমার জানা নেই।’