Image description

আজ যে ভিটায় ঘর, কাল সেই ভিটাই হয়তো থাকবে নদীর পেটে। পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁর ভাঙনে এমনই আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে ফরিদপুরের সদরপুর ও সদর উপজেলার অন্তত ১৫ গ্রামের বাসিন্দাদের। প্রতিদিনই নদীতে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও পাকা সড়ক। ভাঙন এগিয়ে আসায় ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন অনেকে। কারও উঠান, কারও ফসলের মাঠ, আবার কারও চলাচলের সড়ক এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে নদীতে। ঝুঁকিতে রয়েছে মসজিদ, স্কুল, কবরস্থান, এতিমখানাসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

সদরপুর উপজেলার চরমানাইর ইউনিয়নের আফসারডাঙ্গী এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এরই মধ্যে নদে বিলীন হয়েছে তিনটি মসজিদ, একটি স্কুল, কবরস্থানসহ বিভিন্ন স্থাপনা। বিলীন হয়েছে হাজার হাজার বিঘা কৃষিজমি। দ্রুত ভাঙন ঠেকানো না গেলে কাছের ঢাকা-ভাঙ্গা মহাসড়কও ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের। সেখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

সদরপুরের আকোটেরচর ইউনিয়নের শয়তানখালী ঘাট, ছলেনামা, আকোট, কালীখোলা, মোল্লাকান্দা ও খালাসীগ্রাম এবং ঢেউখালী ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া, চরবলাশিয়া ও মুন্সিরচর এলাকায় চলছে ভাঙন। শয়তানখালী ঘাট এলাকায় গত দুই মাসে নদীতে বিলীন হয়েছে প্রায় ৫০০ মিটার পাকা সড়ক। একটি ইটভাটারও বড় অংশ চলে গেছে নদীতে। ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে আকোট গ্রামের আদর্শ গ্রাম ও গুচ্ছগ্রামের দুই শতাধিক পরিবার নতুন করে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ব্যবস্থা না নিলে হুমকিতে পড়বে আকোট জনসংঘ উচ্চবিদ্যালয়, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পিয়াজখালী বাজারও।

ঢেউখালী ইউনিয়নের চরবলাশিয়া গ্রামে আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনে এরই মধ্যে বিলীন হয়েছে অর্ধশতাধিক বসতঘর। হুমকিতে রয়েছে চরবলাশিয়া মোল্লাগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

অন্যদিকে, সদর উপজেলার নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের ইউসুফ মাতুব্বরের ডাঙ্গী ও আসমত আলীর ডাঙ্গী এলাকায় পদ্মার ভাঙনে নদীতে গেছে কয়েকশ একর ফসলি জমি। ভাঙনের কারণে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন বাসিন্দাদের কেউ কেউ। জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হয়েছে কিছু এলাকায়।

চরমানাইর এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত জাবেদা বেগম বললেন, ‘আমরা কোনো ত্রাণ চাই না। টেকসই ও স্থায়ী বাঁধের মাধ্যমে নদীভাঙন থেকে মুক্তি চাই।’

একই এলাকার রুস্তম আলী বলেছেন, ‘আমার বাড়ি সাতবার ভাঙনের শিকার হয়েছে। ভাঙতে ভাঙতে আমার জীবনটাই শেষ হয়ে গেছে। এ বয়সে আর যুদ্ধ করতে পারছি না। সরকার ব্যবস্থা না নিলে হয়তো চিরতরে এই এলাকা ছেড়ে যেতে হবে।’

মিয়াবাড়ির তানজিমুল হাসান কায়েস জানালেন, তাদের এলাকায় স্কুল, মসজিদ, কবরস্থানসহ শতাধিক বাড়ি এখন ভাঙনের হুমকিতে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন বললেন, পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদী ভাঙনপ্রবণ। এবারও আড়িয়াল খাঁর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙন রোধে বিভিন্ন স্থানে কাজ চলছে। অন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়ও পর্যায়ক্রমে কাজ শুরু হবে। তিনি বললেন, দুই নদীর ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সমীক্ষা শেষ হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে প্রায় ১১ কিলোমিটার নদীতীর রক্ষার কাজ করা সম্ভব হবে।

এ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল জানালেন, পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁর ভাঙন রোধে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এরই মধ্যে ছয়টি প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে। নতুন ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোর জন্যও ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

ভাঙনকবলিত মানুষের দাবি, সাময়িক জিও ব্যাগ ফেলার পাশাপাশি দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে তাদের বসতভিটা, কৃষিজমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করা হোক।