Image description

পরিবেশগত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঝুঁকি বিবেচনা না করেই বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের কাছে নির্মিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্টদের আর্থিক সেবা দিয়েছে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান বার্কলেস ব্যাংক। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের অফিস ফর রেসপনসিবল বিজনেস কন্ডাক্টে বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবন অঞ্চলের তিনজন এই অভিযোগ জমা দিয়েছেন।

অভিযোগকারীরা হলেন–বাংলাদেশের পরিবেশকর্মী শরীফ জামিল, সুন্দরবন এলাকার কৃষক ও রাজনীতিক অনিমেষ মণ্ডল এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মৎস্যজীবীদের প্রতিনিধিত্বকারী ট্রেড ইউনিয়ন দক্ষিণবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরাম। তাদের সহায়তা করছেন কিংস কলেজ লন্ডনের ল স্কুলের কিংস হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ক্লিনিকের শিক্ষার্থী ও আইনজীবীরা।

 

অভিযোগকারীরা বলছেন, বার্কলেস ব্যাংক ‘মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট’ নামে পরিচিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে জড়িত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে আন্ডাররাইটিং বা আর্থিক সুরক্ষা সেবা দিয়ে আন্তর্জাতিক নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে।

 

আন্ডাররাইটিং কোম্পানি হলো এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যা কোনো নতুন ব্যবসা, শেয়ার, বন্ড বা বীমা পলিসির আর্থিক ঝুঁকি নিজের কাঁধে তুলে নেয়। অর্থাৎ, কোনো কোম্পানি যখন বাজার থেকে মূলধন তুলতে চায় বা কোনো বড় প্রকল্পের জন্য অর্থায়ন জোগাড় করে, তখন আন্ডাররাইটিং কোম্পানি সেই প্রক্রিয়ার গ্যারান্টি বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপকের ভূমিকা পালন করে।

 

মূলধন সংগ্রহ করতে যাওয়া কোম্পানি বা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কমিয়ে বাজারে আস্থা তৈরি করা এদের প্রধান কাজ। এর বিনিময়ে তারা নির্দিষ্ট হারে ফি বা কমিশন নেয়।

 

সুন্দরবন। ফাইল ছবি
সুন্দরবন। ফাইল ছবি

সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অভিযোগকারীদের একজন ঢাকার পরিবেশকর্মী শরীফ জামিল বলেন, “বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আশপাশের শিল্পাঞ্চল থেকে নির্গত ভারী ধাতুর বর্জ্য নদী ও খালের মাধ্যমে সুন্দরবনে প্রবেশ করছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সুন্দরবনের পশুর নদীর তীরে অবস্থিত। বনের পরিবেশ এখন হুমকির মুখে।”

 

কয়লাভিত্তিক এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সুন্দরবনের কাছে অবস্থিত। এই বনভূমিতে বাঘসহ শত শত প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের লাখো মানুষ সুন্দরবনের নদী ও বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল।

 

২০১০ সালে ভারত ও বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে বাগেরহাটের রামপালে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের উদ্যোগ শুরু হয়। ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং ভারতের এনটিপিসি লিমিটেডের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল) নামে একটি কোম্পানি গঠিত হয়।

 

এই কোম্পানির অধীনে ১৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট (রামপাল) নামে দুই ইউনিটের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ শুরু হয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে আসার পর থেকে এটি নিয়মিত জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আসছে।

 

বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের পরিকল্পনা শুরুর পর থেকেই পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী এবং বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো এর ব্যাপক বিরোধিতা করেছে।

২০১৬ সালে জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেসকোও এ প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। ওই সময় সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বায়ু ও পানি দূষণের কারণে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন ‘অপরিবর্তনীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উচ্চ আশঙ্কা’ রয়েছে।

 

গার্ডিয়ান জানায়, গত নভেম্বরে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত পানির নমুনায় পারদ ও আর্সেনিকের মাত্রা বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া যায়। সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব পাওয়া যায় পশুর নদীতে।

সুন্দরবন রক্ষায় শহীদ মিনারে সমাবেশ। ছবি: বিবিসি
সুন্দরবন রক্ষায় শহীদ মিনারে সমাবেশ। ছবি: বিবিসি

গবেষকরা শিল্প কারখানার বর্জ্য নিঃসরণ ও বন্দরকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডকে ভারী ধাতু দূষণের উৎস হিসেবে শনাক্ত করেন। তাদের মতে, কয়লা পোড়ানোর ফলে নির্গমন এবং নৌযান চলাচল বৃদ্ধির কারণে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘উল্লেখযোগ্য পরিবেশগত হুমকি’ তৈরি করছে।

 

অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সেবা দেওয়ার আগে বার্কলেস পরিবেশগত ও মানবাধিকার ঝুঁকি সম্পর্কে যথেষ্ট যাচাই-বাছাই করেনি।

 

অভিযোগকারীদের সহায়তাকারী কিংস লিগ্যাল ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, বার্কলেস ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এনটিপিসি লিমিটেডের ঋণের আন্ডাররাইটার হিসেবে কাজ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগের অন্যতম অংশীদার।

 

ক্লিনিকের দাবি, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বার্কলেস এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার বন্ড ইস্যুতেও আন্ডাররাইটার হিসেবে কাজ করে। ওই ব্যাংক রামপাল প্রকল্পে ঋণ দিয়েছিল।

 

অভিযোগকারীরা বলছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত কার্বনসহ অন্যান্য দূষণকারী পদার্থ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। জলবায়ু সংকটের কারণে এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে সুন্দরবন। এই অঞ্চলকে ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষায় ম্যানগ্রোভ বন গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।

 

পরিকল্পনা ও নির্মাণের সময় থেকেই রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে ব্যাপক বিরোধিতা ছিল।

 

অভিযোগে বলা হয়েছে, পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাবের আশঙ্কায় ফ্রান্সের কয়েকটি ব্যাংকসহ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই প্রকল্পে অর্থায়ন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।

 

শরীফ জামিল গার্ডিয়ানকে বলেন, “আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নের সিদ্ধান্তের পরিণতি বিবেচনা করার দায়িত্ব রয়েছে। আপনার সুনাম যত বড়, পৃথিবী ও মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের দায়িত্বও তত বেশি। বার্কলেস একটি বিখ্যাত বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান। তাই তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে।”

 

এই পরিবেশকর্মী আরও বলেন, “অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই প্রকল্প থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেছিল কিংবা অর্থায়নে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। বার্কলেসসহ অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত তাদের নীতি পরিবর্তন করা এবং কীভাবে তাদের কার্যক্রম পৃথিবীকে জলবায়ু বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে, তা পর্যালোচনা করা।”

 

শরীফ জামিল ব্যাংকগুলোকে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আরও অর্থায়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “বাংলাদেশে সারা বছর সূর্যের আলো পাওয়া যায়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে?”

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

কিংস লিগ্যাল ক্লিনিকের আইনজীবী সু উইলম্যান বলেন, “সুন্দরবনের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী জলবায়ু ও প্রকৃতির সংকটের সামনের সারিতে রয়েছে। আমরা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বোঝাতে চাই, যাতে তারা এই সংকটে অবদান রাখছে–এমন তেল ও কয়লা প্রকল্পে অর্থায়নের আগে তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে।”

যুক্তরাজ্যের ব্যবসা ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন অফিস ফর রেসপনসিবল বিজনেস কন্ডাক্ট এখন অভিযোগটি পর্যালোচনা করবে এবং এটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে তদন্ত করা হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

বার্কলেস ব্যাংক এবং রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের হোল্ডিং কোম্পানি বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল) এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি বলে জানিয়েছে গার্ডিয়ান।