আইনশৃঙ্খলা। বিদ্যুৎ-জ্বালানি। সার। তিন ইস্যুতেই চাপে তিন মন্ত্রণালয়। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র সাত মাসের মাথায় এই তিন সংকট সরকারকেও ফেলেছে বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরীক্ষায়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে একদিকে বাড়ছে উদ্বেগ, অন্যদিকে বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে ভুগছেন মানুষ। কৃষকের মাঠেও দেখা দিয়েছে সারের সংকট।
বিষয়গুলো নিয়ে শুধু বিরোধী মহলেই প্রশ্ন উঠছে না—খোদ বিএনপির সংসদীয় দলের সভায়ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের কাছে জবাব চেয়েছেন সংসদ সদস্যরা। আইনশৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও সার পরিস্থিতি নিয়ে তাদের সামনে তুলে ধরতে হয়েছে সরকারের অবস্থান ও সংকটের কারণ।
অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন আগামীর সময়কে বললেন, ‘এটি আসলে কঠিন বিষয়। বিদ্যুৎ-জ্বালানি ছাড়া একটি দিনও থাকা সম্ভব নয়। ইরান যুদ্ধের কারণে যদিও এগুলো নিশ্চিত করা এখন খুব ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে পড়েছে। টাকা দিয়েও এলএনজি মিলছে না।
তারপরও এ মুহূর্তে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বিকল্প সোর্সের ব্যবস্থা করতে হবে। মধ্যমেয়াদি হিসেবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির উৎপাদন বাড়াতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। না হলে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। আর সার্বিক নিরাপত্তা না থাকলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না। বিনিয়োগ না এলে কর্মসংস্থান হবে না। একটি আরেকটির ওপর নির্ভরশীল।’
ফাহমিদা খাতুনের মতে, ‘যদি কোনো গোষ্ঠী এসব ক্ষেত্রে নাশকতা বা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।’
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান সালাহউদ্দিন আহমদ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান অনিন্দ্য ইসলাম (অমিত)। স্বরাষ্ট্র ও কৃষিমন্ত্রী তাদের মন্ত্রণালয়ে নতুন হলেও বিদ্যুৎমন্ত্রী এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।
আইনশৃঙ্খলায় সবচেয়ে বড় চাপ: সরকারের সাত মাসে পুলিশের নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ড, গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেনি। তবে এ সময়ে দুই হাজারের বেশি মানুষ খুন হয়েছেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ৭৫ জন মারা গেছেন, যার ৯০ শতাংশই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে ২১ হাজার ৭৫৬টি মামলা করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পুলিশের ওপর হামলার মামলা বেড়েছে। ব্যস্ত সড়ক, বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে গুলি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই এবং আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
সরকার গঠনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত মে মাসে পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে তিনি মব সহিংসতা, কিশোর গ্যাং ও মাদকের বিস্তার রোধে পুলিশকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার নির্দেশ দেন; কিন্তু এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। বরং খোদ সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইকারীদের হাত থেকে রক্ষা পাননি একজন শিক্ষিকা। তার হাত থেকে ব্যাগ ছিনিয়ে নিতে গেলে রিকশা থেকে পড়ে তিনি মারা যান। এ ধরনের ঘটনা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সরকারের মুখপাত্র এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করেছেন। গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় দেশে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বা হত্যাকাণ্ডের মামলার সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। তবে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অন্যান্য অপরাধের মামলা কমেছে।
ডা. জাহেদের মতে, গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনীর একটি বড় অংশের মনোবল ভেঙে গেছে। সেই ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত পুলিশ বাহিনীকে’ নিয়েই সরকার কাজ করছে। তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরতে সময় লাগবে।
বিদ্যুৎ-জ্বালানিতে দ্বিমুখী সংকট: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেও বড় চাপ সামলাতে হচ্ছে সরকারকে। ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যে লুটপাট হয়েছে, তার পুরো দায় এসে পড়েছে বর্তমান সরকারের ওপর— এমন অভিযোগ করছে সরকার। এ খাতে যে সংকট সৃষ্টি হবে, তা বহু আগে থেকেই বিশেষজ্ঞরা বলে আসছিলেন।
এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষতির মধ্যে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। গ্রাম পেরিয়ে লোডশেডিং এখন জায়গা করে নিয়েছে শহরেও। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলছে অর্থনীতি ও জনজীবনে।
সহসাই এ সমস্যার সমাধান হবে না বলে সরকারের মন্ত্রীরাও জানিয়েছেন। তথ্য বলছে, দেশে সরকারি মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ৬৪টি। এসব কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১২ হাজার ৩০২ মেগাওয়াট। বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ৬৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র। এগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ১০ হাজার ৮৫৩ মেগাওয়াট।
এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি যৌথ মালিকানায় রয়েছে তিনটি কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ৩ হাজার ৬৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে গড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় ঘাটতি থাকায় বিভিন্ন অঞ্চলে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
সরকার অবশ্য আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতির আশা করছে। সে সময় সৌরবিদ্যুৎ থেকে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তখন আর লোডশেডিং থাকবে না বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
সারে সিন্ডিকেট, সংকট সরবরাহ ব্যবস্থায়: জ্বালানি সমস্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত সারের উৎপাদনও। দেশে পর্যাপ্ত সারের মজুদ রয়েছে বলা হলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে সৃিষ্ট হয়েছে কৃত্রিম সংকট। এমনকি সারের গোডাউন লুটের ঘটনাও ঘটেছে। অথচ কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি, দেশে সারের কোনো সংকট নেই।
চলতি বছরের অক্টোবর থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে মোট সারের চাহিদা ৪০ দশমিক ২৯ লাখ টন। সরকারের মজুদ রয়েছে ৫৪ দশমিক ৪৮ লাখ টন। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় ১৪ দশমিক ১৯ লাখ টন বাড়তি রয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী, দেশে সার সংকট থাকার কথা নয়।
তাহলে মাঠপর্যায়ে সংকট কেন? কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থায় কারসাজির কারণে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে। সারের এই সংকটের পেছনে সিন্ডিকেটের কারসাজি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধাভোগী একটি শ্রেণি জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে গত ২৫ আগস্ট সার উত্তোলন, বিতরণ ও সার-ডিলার নিয়োগ-সংক্রান্ত কার্যক্রমে কৃষি মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তার জন্য তিন সদস্যের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে সরকার। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনকে এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
সার ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবে যেন ফসলের ক্ষতি বা উৎপাদন ব্যাহত না হয়, তা তদারকি করছে এই মন্ত্রিসভা কমিটি। এরই মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফয়সাল ইমামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী সৈয়দ কামরুল ইসলামের পিএস ছিলেন।
সংসদীয় দলের সভায় ক্ষোভ: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ-গ্যাস সমস্যা এবং সার সংকট নিয়ে খোদ শাসক দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও প্রশ্ন উঠেছে। গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারি দলের সভাকক্ষে বিএনপির সংসদীয় দলের সভা হয়। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এতে দলের সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সংসদ সদস্য আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, সভায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিরোধী মতের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিষয়ে অভিযোগ তোলেন অনেক এমপি। এ সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সার পরিস্থিতি নিয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম (অমিত) সংসদ সদস্যদের ব্রিফ করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, কোথাও কোথাও ‘মব কালচার’ দেখা যাচ্ছে, যাতে বিএনপির লোকজনও জড়িত। এতে বিরোধীরা সরকারবিরোধী ক্ষেত্র তৈরির সুযোগ পাবে। এমপিরা অভিযোগ করেন, আগের সরকারের সময়ে বিরোধী মতের ওপর নির্যাতনে জড়িত অনেক পুলিশ কর্মকর্তা এখনো ওসি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগের সরকারের রেখে যাওয়া অবকাঠামোর কারণে এখনই বিদ্যুৎ পরিস্থিতির পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়। তবে লোডশেডিংয়ে শহর-গ্রামের মধ্যে ভারসাম্য আনা হবে। সার পরিস্থিতি নিয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেছেন, দেশে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। সরবরাহে যেকোনো ধরনের ‘স্যাবোটাজ’ ঠেকাতে সরকার সতর্ক রয়েছে।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘বিদ্যুৎ-জ্বালানি, সার ও গ্যাস সংকটের বিষয়েও মানুষকে অবহিত করতে হবে— যাতে তারা সরকারকে ভুল না বোঝে।’
সাত মাসের মাথায় এই তিন সংকটই সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতেও বিদ্যুৎ ও সার নিয়ে বিএনপি সরকারকে সংকটে পড়তে হয়েছিল। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের শাসনামলে কানসাট, শনির আখড়া, গাইবান্ধায় বিদ্যুৎ-সারের দাবিতে বড় ধরনের বিক্ষোভ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগও রাজনৈতিক আন্দোলন জোরদার করেছিল। এবারও বিদ্যুৎ ও সার সংকট ঘিরে জনঅসন্তোষ সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।