দেশের সব সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ তদারকি ও নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনিয়ম-দুর্নীতি খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও উল্টো প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই জড়িয়েছেন নজিরবিহীন অনিয়ম ও লুটপাটে। সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন করে কেনাকাটা, অগ্রিম টাকা নিয়ে তা পরিশোধ না করা, প্রাপ্যতার বাইরে গিয়ে সভা-সেমিনারের সম্মানি ও অভার টাইমের বিল নিয়েছেন। করেছেন অতিরিক্ত জ্বালানি, বিদ্যুৎ ব্যবহার। খরচ করেছেন বাজেটের বেশি। ব্যয় না করলেও করেছেন বিল। সময়মতো কাজ শেষ না হলেও বিলম্ব জরিমানা ছাড়াই করা হয় ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ। প্রদর্শন করা হয়নি অব্যবহৃত বাজেট। এভাবেই নানা অনিয়মের কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই প্রায় ১৬০ কোটি টাকার অনিয়ম করে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। শিক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, যারা অনিয়ম ধরার কথা, তারাই যদি অনিয়মে জড়ায়, তা দুঃখজনক।
বিলম্ব জরিমানা আদায় না করায় ক্ষতি ২৩ কোটি ৪১ লাখ : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে না করা সত্ত্বেও বিলম্ব জরিমানা আদায় না করে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করায় সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ২৩ কোটি ৪১ লাখ ৮৬ হাজার ৫৪১ টাকা।
নিরীক্ষা দল বলছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত পূর্ত কাজের বিভিন্ন প্যাকেজের বিপরীতে চুক্তি করা হয়েছে এবং চুক্তির বিপরীতে কাজ সমাপ্তির প্রকৃত মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেলেও নিরীক্ষাকাল পর্যন্ত কাজ বাস্তবায়নে বিলম্বকাল ৪৮১ থেকে ১০২৮ দিন অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু যথাসময়ে কাজ সমাপ্তির মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন ও যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যথা সময়ে কাজের মেয়াদ বৃদ্ধির অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তবে বিলম্ব জরিমানা আদায় না করে ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হচ্ছে। চুক্তির পিসিসি ক্লজ ৭৩.১ অনুযায়ী, প্রতিদিন বিলম্বের জন্য অসমাপ্ত কাজের বিলম্ব জরিমানা আদায় না করে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করায় সরকারের ২৩ কোটি ৪১ লাখ ৮৬ হাজার ৫৪১ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
প্রাপ্যতার বাইরে দেওয়া হয়েছে সম্মানি-ভাতা নিরীক্ষাকালে ক্যাশবুক ও বিল-ভাউচার পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে কমিশনের ১৬৩তম পূর্ণ কমিশন সভায় অনুমোদিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইউজিসি প্রফেসরদের ১২ মাসের সম্মানি বাবদ ৪৩ লাখ ৯ হাজার ১৭৬ টাকা প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু ইউজিসির অর্গানোগ্রাম-বহির্ভূত এই প্রফেসরদের সম্মানি প্রদানের ক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, তারা ইউজিসির কর্মরত জনবল নন এবং তাদের কর্মকর্তাদের বেতন খাত থেকে উল্লিখিত সম্মানি প্রদানে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশপত্র অনুসরণ করা হয়নি। ফলে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষা করে ইউজিসি প্রফেসর খাতে এই টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যয় করা হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রাপ্য না হওয়া সত্ত্বেও স্প্রেসিফিকেশন ও প্রাক্কলনসহ শিডিউল প্রস্তুত কমিটির সদস্যরা সম্মানি হিসেবে নিয়েছেন ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৭০০ টাকা। এ ছাড়াও প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ওভারটাইম দেওয়া হয়, যাতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৩৬ লাখ ৯৫ হাজার ৫৬১ টাকা। আর কমিশনের ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মাসিক এক হাজার টাকা করে মোবাইল ফোন বিল দেওয়া হয় দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা।
৬৪ লাখ টাকা অগ্রিম উত্তোলন অডিট প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে আর্থিক ক্ষমতাবহিভূর্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিভিন্ন ব্যক্তি কর্তৃক সিলিং সীমার অতিরিক্ত অগ্রিম ৬৪ লাখ ২ হাজার ১৫৫ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। রেজিস্টার, বিল-ভাউচার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ইউজিসির আন্তর্জাতিক সহযোগী বিভাগের পরিচালক জেসমিন পারভীন, জেনারেল সার্ভিসের এস্টেট অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক শিবানন্দ শীল, আইএমসিটি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ মাকসুদুল রহমান ভূঁইয়া, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মুহিবুল আহসান এবং কর্মচারী আনোয়ার হোসেন এই টাকা উত্তোলন করেছেন। এককালীন অগ্রিম উত্তোলনের ক্ষেত্রে বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে পাঠানোর কথা থাকলেও ইউজিসি তা করেনি।
ব্যাংক হিসাবে ৮৩ কোটি টাকার অনিয়ম অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের পরিপত্র অনুযায়ী, সব স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও এর অধীনে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প-স্কিমের জন্য ‘পার্সোন্যাল লেজার (পিএল)’ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আর্থিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হয়। এ জন্য অর্থ বিভাগের চালু করা আইবাস+ সাব-মডিউলের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে অর্থ ছাড়করণ ও ইএফটি পদ্ধতিতে বিল পরিশোধের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু ইউজিসি এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি।
শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর বলছে, নিরীক্ষাকালে আয়-ব্যয় বিবরণী, সংশোধিত বাজেট বিবরণী ২০২৪-২০২৫, ক্যাশবুক, ব্যাংক বিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে একাধিক চলতি এবং সঞ্চয়ী হিসাবের মাধ্যমে আর্থিক কার্যক্রম পরিচালিত করেছেন। যার ফলে যথাযথ ব্যাংক হিসাব সংরক্ষণ না করায় ৮৩ কোটি ৬৮ লাখ ১০ হাজার টাকা অনিয়মিতভাবে ব্যয় করা হয়েছে।
ব্যয় না হওয়া সত্ত্বেও ব্যয় প্রদর্শন করায় ক্ষতি ৯ কোটি টাকা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন অধ্যাদেশ ১৯৭৩ এর ধারা ১১ এর ক্রমিক নম্বর ২ অনুযায়ী কমিশন প্রতি অর্থবছর শেষে তার হিসাবের একটি বিবরণী সুনির্দিষ্ট ফরমেটে প্রস্তুত করবে এবং তা বাংলাদেশের কম্পট্রোলার অডিটর জেনারেলের কাছে উত্থাপন করবে। কিন্তু যে হিসাব বিবরণী প্রদর্শন করা হয়েছে তা ত্রুটিপূর্ণ।
অডিট অধিদপ্তর বলছে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে সরকার কর্তৃক বৃত্তি/মেধাবৃত্তি খাতে ছাড়কৃত ৯ কোটি টাকা ইউজিসি বৈদেশিক পিএইচডি তহবিল ব্যাংক হিসাব নম্বরে স্থানান্তর করেছে। তা আবার আয়-ব্যয় বিবরণীতে শিক্ষকদের বৈদেশিক স্কলারশিপ খাতে প্রদর্শন করা হয়েছে। তবে অব্যবহৃত টাকা সমাপনী স্থিতি হিসেবে প্রদর্শন করা হয়নি। ফলে ব্যয় না হওয়া সত্ত্বেও বৈদেশিক পিএইচডি বৃত্তি খাতে ব্যয় প্রদর্শন করায় ৯ কোটি টাকা সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
গাড়ি মেরামত ও তেল-বিদ্যুৎ বিলেও গরমিল এই অর্থবছরের মেরামত রেজিস্টার যাচাইয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের প্রাধিকারভুক্ত গাড়িতে বার্ষিক সিলিং সীমার অতিরিক্ত মেরামত/রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে। ফলে সরকারের ব্যয় হয় ৬ লাখ টাকা। আবার প্রাপ্যতার অতিরিক্ত গাড়ির জ্বালানি ব্যবহার করা হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানের ৫ লাখ ৮৫ হাজার ৮০২ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। আবার নির্দেশনা অমান্য করে আবাসিক কোয়ার্টারে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ও পানির বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১০ লাখ ২৯ হাজার ৬৩৫ টাকা। বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও সংশ্লিষ্ট সেবা সরবরাহ এবং প্রতিস্থাপন কাজে ৯৪ লাখ ৭৬ হাজার ২৩০ টাকা অনিয়মিত ব্যয় করা হয়েছে। এ ধরনের কাজে রাজউকের অনুমোদন নেওয়ার কথা থাকলেও তা না নেওয়ায় বিষয়টিকে অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করেছে অডিট অধিদপ্তর।
আরও যত অনিয়ম আবার ইউজিসির কমিশনের আয়-ব্যয় ঘেঁটে দেখা যায়, এই অর্থবছরে পরীক্ষা-সংক্রান্ত সভা, আনুষঙ্গিক ব্যয়, প্রশিক্ষণ, দাপ্তরিক ক্রম, জ্বালানি, মেরামত, বিবিধ খরচ ইত্যাদির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের এবং শাখাপ্রধানকে টাকা অগ্রিম প্রদান করা হয়, যা নিরীক্ষাকালীন পর্যন্ত সমন্বয় করা হয়নি। জিএফআর-এর বিধি ২৬২ অনুযায়ী অগ্রিম গ্রহণের তারিখ হতে ছয় মাস অথবা ৩০ জুনের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে উল্লিখিত বিধি লঙ্ঘন করে গৃহীত অগ্রিম সমন্বয় না করায় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ৪০ লাখ ৯২ হাজার ৫৭৯ টাকা আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। ক্রয় নীতিমালা অনুসরণ না করায় বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তির নামে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। আবার ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়ন ছাড়া অনিয়মিত ১৬ লাখ ৭২ হাজার টাকা ব্যয় করেছে প্রতিষ্ঠানটি। একই নিয়ম অনুসরণ না করায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউজিসি ১৬ কোটি ৭২ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয় করেছে। কিন্তু এসব ব্যয়ের বিপরীতে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনার চাহিদা নিরীক্ষায় উপস্থাপন করা হয়নি।
এই অর্থবছরে ইউজিসির বিভিন্ন খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল ৮৫ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১১৩ কোটি ২৫ লাখ ৫৩ হাজার ৬৭১ টাকা। বরাদ্দের অতিরিক্ত এই ব্যয়ের ফলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২৮ কোটি ২৩ লাখ ৩ হাজার ৬৭১ টাকা।
এ ছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউজিসির বিভিন্ন খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল ৮৫ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১১৩ কোটি ২৫ লাখ ৫৩ হাজার ৬৭১ টাকা। বরাদ্দের অতিরিক্ত এই ব্যয়ের ফলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২৮ কোটি ২৩ লাখ ৩ হাজার ৬৭১ টাকা। এর বাইরেও আরও নানা খাতে অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে।