সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা একলাফে বেড়ে যাচ্ছে এক শ থেকে প্রায় দেড় শ শতাংশ। নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে বাজেটে বরাদ্দ রাখা হলেও বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপে পড়বে সরকার। বাড়তি খরচ মেটাতে রাজস্ব আয় বাড়ানো না গেলে সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়তে পারে।
আবার সমাজের একটি অংশের এই বাড়তি উপার্জন মূল্যস্ফীতি ঘটিয়ে বাকি অংশকে চাপে ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, বেড়ে যেতে পারে সেবা ও পণ্যমূল্য। তখন বাজারে গিয়ে হিমশিম খেতে হবে মানুষকে। কষ্টকর হয়ে যাবে তাদের জীবন নির্বাহ।
সাধারণত পাঁচ বছর পরপর নতুন বেতনকাঠামো দেওয়া হলেও এবার তা হলো প্রায় এক যুগ পর। মন্ত্রিসভা গত সোমবার নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন করেছে। সে অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে। মোট চার ধাপে এই বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে সরকারি কর্মচারীদের নতুন স্কেলে বেতন দিতে বছরে ব্যয় হবে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখা হলেও সেই টাকা কোথা থেকে আসবে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, টাকা ছাপিয়ে ব্যয় করা হলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিলে সরকারের সুদ বাড়বে, আর রাজস্ব খাত থেকে নিলে জনগণের ওপর প্রভাব পড়বে।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাজেট ব্যবস্থাপনায় বড় চাপ পড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপট এই বেতন বৃদ্ধির জন্য সহায়ক নয়, কিন্তু এটি না দিয়েও উপায় নেই। এটি বাস্তবায়নে সরকারকে হয় ঋণ নিতে হবে, নয়তো টাকা ছাপতে হবে।’ তাঁর মতে, পে-কমিশন গঠন করে এভাবে নতুন বেতনকাঠামো না দিয়ে অন্যান্য দেশের মতো প্রতিবছর ৫-১০ শতাংশ হারে বেতন বাড়ানো যেতে পারে। এভাবে বেতন বাড়ালে হঠাৎ করে বড় ধাক্কা আসে না।
চার ধাপে বাস্তবায়নের পথরেখা দিয়ে নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণাকে সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, এনবিআর যদি রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সক্ষম হয়, তাহলে অর্থনৈতিক চাপটা অনেক সহনীয় হবে। কিন্তু বাড়তি বেতন দিতে গিয়ে অগ্রাধিকারের দিক থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা থেকে যেন দৃষ্টি সরে না যায়। এগুলোকে সুরক্ষা দিয়েই নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করতে হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়তি আয় ভোগের চাহিদা বাড়িয়ে খুচরা ব্যবসা, পরিবহন, আবাসন ও সেবা খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন সিপিডির বিশেষ ফেলো ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, তবে পণ্যের সরবরাহ একই হারে না বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে, যার বোঝা সরকারি চাকরির বাইরে থাকা স্থির ও স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর বেশি পড়বে। বেসরকারি খাতেও বেতন সমন্বয়ের দাবি বাড়তে পারে।
ফাহমিদা খাতুনের মতে, বেতনকাঠামোর ব্যয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ঘাটতি বাজেটে এটি অর্থায়নের চাপ বাড়াবে। এই ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ নিলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি সংকুচিত হতে পারে; কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। তাই করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি ও অবৈধ অর্থপ্রবাহ রোধ, বকেয়া রাজস্ব আদায় এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো প্রয়োজন।
নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণা করায় জনগণের ওপর চাপ পড়বে বলে মনে করেন সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার। তিনি বলেন, জিনিসপত্রের দাম বাড়ার আশঙ্কা আছে।
জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগে থেকেই সাধারণ মানুষ কষ্টে আছে বলে মনে করেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক। রাজধানীতে গতকাল মঙ্গলবার এক সভায় তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে কিছু মানুষের বেতন বেড়ে গেল। আর সেই সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরাও চাল, ডাল ও তেলের দাম দুই টাকা থেকে পাঁচ টাকা করে বাড়িয়ে দিলেন, এটা যেন না হয়। যাঁরা সরকারি চাকরি করেন, বেতন বাড়ার পরে তাঁরা হয়তো পাঁচ টাকা বেশি দিতে পারবেন। কিন্তু সরকারি চাকরি করেন না, এমন মানুষের সংখ্যাই বেশি।