Image description

দেশের অর্থনৈতিক চাপ কমাতে ও সরকারি খরচে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারের নেওয়া কৃচ্ছ্রসাধনের উদ্যোগ এখন গতি হারাচ্ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন খাতে যেভাবে সরকারি খরচে জোর দেওয়া হচ্ছে, তাতে ব্যয় কমানোর পদক্ষেপগুলো কতটা কার্যকর তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।

ক্ষমতায় আসার পরপরই রাজস্ব সংকট ও অহেতুক খরচ কমানোর কথা বলে মিতব্যয়িতার ঘোষণা দিয়েছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। তবে এরপর সরকারের নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত এই কৃচ্ছ্রসাধনের উদ্যোগ নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় একটি পরিপত্র জারি করে সব মন্ত্রণালয়, সরকারি দপ্তর ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানকে পরিচালন ও উন্নয়ন–উভয় বাজেটের খরচ কমানোর নির্দেশ দেয়।

ওই পরিপত্রে নতুন গাড়ি কেনা, সরকারি খরচে বিদেশ ভ্রমণ, জমি অধিগ্রহণ এবং নতুন ভবন তৈরির মতো কাজগুলোতে খরচ করা সীমিত বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল। এই নিয়ম সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্যই প্রযোজ্য ছিল।

তবে সমালোচকদের দাবি, সরকারেরই কিছু সিদ্ধান্ত এই খরচ কমানোর সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছে।

সরকার প্রথমে ইঙ্গিত দিয়েছিল, খরচ বাঁচাতে তারা ছোট আকারের মন্ত্রিসভা গঠন করবে। কিন্তু বাস্তবে গঠন করা হয়েছে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রী ছাড়া বর্তমানে মন্ত্রিসভায় ২৬ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। পাশাপাশি বেশ কয়েকজন উপদেষ্টাও মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন।

সমালোচকদের মতে, মন্ত্রী মর্যাদার পদ বাড়ানো খরচ কমানোর ঘোষণার পুরো বিপরীত। তবে সরকার পক্ষের দাবি, শুধু খরচ নয়, সরকার পরিচালনা ও প্রশাসনিক প্রয়োজনেই এই কাঠামো তৈরি করতে হয়েছে।

এর বাইরে সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি ব্যবহারের ভাতা কমানোর সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটে সরকার আবারও সমালোচনার মুখে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী প্রথমে এই ভাতা ৫০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার টাকা করেছিলেন। কিন্তু পরে আবার আগেরটাই বহাল রাখা হয়।

তা ছাড়া, জাতীয় বাজেটে টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেলে চীন থেকে যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা চলছে—প্রধানমন্ত্রীর নীতি ও কৌশলবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের এমন মন্তব্যের পর নতুন বিতর্ক তৈরি হয়।

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত হলেও, এমন অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এ ধরনের বড় কেনাকাটার পরিকল্পনা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন।

খরচ কমানোর এই নীতি আসলে কোনো কাজে আসছে কি না-জানতে চাইলে অর্থ সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।

তিনি বলেন, ‘এই নীতি কাজ করছে কি না, তা বিস্তারিত পর্যালোচনা না করে বলা সম্ভব নয়।’

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান টাইমসকে বলেন, অর্থনৈতিক সংকটের সময় সব সরকারই মিতব্যয়িতার কথা বলে। কিন্তু পরে আবার অনেক সিদ্ধান্ত বদলে ফেলে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আগেও দেখেছি, সংকটকালে সরকারগুলো খরচ কমানোর উদ্যোগ নেয়। পরে আবার সেখান থেকে সরে এসে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে ফেলে।’ তার মতে, শুধু নির্দেশ জারি করলেই খরচ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

তিনি বলেন, ‘আর্থিক শৃঙ্খলা আনতে হলে শুধু নিয়ম বা বিধিনিষেধের ঘোষণা দিলেই হবে না, সেগুলোর সঠিক তদারকি ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।’

বাংলাদেশে কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি অবশ্য নতুন কিছু নয়। আগের সরকারগুলোও অর্থনৈতিক চাপের সময় একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল। অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন—রাজস্ব ঘাটতি, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক নানা অঙ্গীকারের কারণে বাজেট বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়।

তবে তৌফিকুল ইসলাম খান এটাও মনে করিয়ে দেন, বর্তমান সরকার খরচ কমানোর কিছু বাস্তব পদক্ষেপও নিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার খরচ একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখতে এবং শৃঙ্খলায় আনতে দৃশ্যমান কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই এবং তা অস্বীকার করারও উপায় নেই।’