খাতভিত্তিক সংকটের সঙ্গে দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতেও একই রকম চিত্র দেখা যাচ্ছে। সাভার-ধামরাইয়ে দিনের বড় সময় পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্য থাকছে। পাশাপাশি বিদ্যুতের ঘাটতিও রয়েছে।
দেশে উৎপাদনমুখী বৃহৎ শিল্প খাতের সংকট এখন বহুমাত্রিক। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল কয়েক বছর ধরেই। অতি সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সংকট আরো তীব্র হয়েছে। কোথাও বিক্রি ও ক্রয়াদেশ হ্রাস পাওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতা কমিয়ে আনা হচ্ছে, আবার কোথাও ব্যাংক ঋণের চাপ উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগ থেকে দূরে রাখছে। জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ধরে রাখতে বাড়ছে ব্যয়। এর সঙ্গে ডলার সংকট, দুর্বল চাহিদা ও ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট যুক্ত হয়ে শিল্প খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাই ২০২৬-এর মেজর ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস: মান্থলি আপডেট প্রতিবেদনের শিল্প উৎপাদন সূচক বা আইআইপি বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়কালে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন সূচক পরিবর্তন হয়ে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশে নেমেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্নমুখী সংকটে দেশে বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন সূচক প্রথমবারের মতো ঋণাত্মক ধারায় গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন প্রবৃদ্ধির পরিবর্তন ছিল ইতিবাচক ৬ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন সূচক ইতিবাচক ৭ শতাংশ থেকে ঋণাত্মক পর্যায়ে নেমে এসেছে। ঋণপ্রবাহের চিত্রও একই ধরনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির মধ্যেও লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। সে হিসাবে বাস্তবায়ন হয়েছে অর্ধেকের সামান্য বেশি।
শিল্প খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন বিনিয়োগ তো দূরের কথা, বিদ্যমান শিল্পের উৎপাদন ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে বিভিন্ন ভারী শিল্প উদ্যোক্তাদের কথায়ও।
জ্বালানি সংকটে দেশের ভারী শিল্প খাত ভুগছে কয়েক বছর ধরেই। এ সংকটের বড় ভুক্তভোগী গ্লাস শিল্প। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট হলেও গ্লাস ফ্যাক্টরিতে চুল্লি বা ফার্নেস বন্ধ করার সুযোগ নেই। উৎপাদন কমানোর চেয়ে উৎপাদন চালু রাখতেই উদ্যোক্তাদের বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে।
গ্লাস ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (জিএমইএবি) প্রেসিডেন্ট ও নাসির ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসিম বিশ্বাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্লাস শিল্পের প্রকৃতির কারণে সরকারি উৎপাদন তথ্যের সঙ্গে খাতটির বাস্তবতার পুরোপুরি মিল পাওয়া যায় না। কভিডকালে লকডাউনের সময়ও কারখানার ফার্নেস চালু রাখতে হয়েছে। তবে বাজারে বিক্রি কমে যাওয়ায় কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান উৎপাদন সক্ষমতা কমিয়েছে।’
এ শিল্পোদ্যোক্তা আরো বলেন, ‘জ্বালানির জন্য উৎপাদন কমানো হয়নি, সেটি করা সম্ভবও নয়। উৎপাদন ধরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে শিল্পের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।’
রড শিল্পে সংকটের চিত্রটি আরো স্পষ্ট। এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, কিছু প্রতিষ্ঠান কোনোভাবে উৎপাদন সচল রাখতে পারলেও পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে সামনে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস (বিএসআরএম) লিমিটেডের চেয়ারম্যান আলীহোসাইন আকবরআলী বলেন, ‘এখনো উৎপাদন ডাউন আছে, সেলও ডাউন।’
নিজের প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন মোটামুটি সচল থাকলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে সামনে সংকট তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, বড় ঋণ নিয়ে যারা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রেখেছেন, তাদের অনেকে এখন খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে। আর এ সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে ব্যাংক খাত।
তবে এসব সংকট পরিস্থিতি শিগগিরই কেটে যাবে বলে আশাবাদী বিএসআরএম চেয়ারম্যান আলীহোসাইন আকবরআলী।
সিরামিক শিল্পের উদ্যোক্তারা সরকারি উৎপাদন সূচকের সঙ্গে বাস্তবতার সামঞ্জস্য দেখছেন। তাদের মতে, এ খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা গ্যাস সংকটের প্রভাব এবার প্রকৃত উৎপাদন তথ্যেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সভাপতি ও মুন্নু সিরামিকের চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে সিরামিক খাত গ্যাস সংকটে ভুগছে। গ্যাসের দাম বাড়ানোর সময় নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের নিশ্চয়তা দেয়া হলেও দাম বৃদ্ধির পর প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যায়নি।’
বর্তমানে কিছু কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও প্রয়োজনীয় চাপ এখনো পাওয়া যাচ্ছে না।
আরেক বৃহৎ শিল্প সিমেন্ট খাতে উৎপাদন সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলার ও ঋণের চাপ। খাতটির শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তা ও চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি মো. আমিরুল হক বলেন, ‘বৃহৎ উৎপাদনমুখী শিল্পই ডলারের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামলেছে।’
তার মতে, ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ৮৪ থেকে ১২২ টাকায় চলে যাওয়ার সময় আমদানিকারকদের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। অথচ এর ফলে ব্যাংক ঋণের বোঝা বেড়েছে। ডলার সংকটে শিল্পের প্রবৃদ্ধি থেমে গেছে।
ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে দেশীয় শিল্প এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আমিরুল হকের কথায়, ডলার সংকট ও ঋণের চাপ একসঙ্গে শিল্পের সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটের বড় ভুক্তভোগী দেশের বস্ত্র শিল্প খাত। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল গত ২০ আগস্ট বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সংগঠনের ১ হাজার ৮৫০টি কারখানার মধ্যে প্রায় ৯০০টিতেই গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।’
তৈরি পোশাক শিল্পে গ্যাস সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ডাইং, ওয়াশিং ও স্পিনিং কারখানায়। তবে ওভেন কারখানাগুলোর ক্ষতি তুলনামূলক কম বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাস সমস্যা এখনো কাটেনি। চাপ সামান্য বাড়লেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলা যাবে না। বিদ্যুতের লোডশেডিংও কিছুটা কমেছে। তবে গ্যাস সংকটের কারণে কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখাকে স্থায়ী বন্ধ বা লে-অফ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের বেতন দিয়ে উৎপাদন সাময়িক বন্ধ রাখছে বা দিনের একটি সময়ের পর ছুটি দিয়ে দিচ্ছে।’
ইনামুল হক খান আরো বলেন, ‘গত সাত মাসে বিজিএমইএর হিসাবে ৩৮টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৫১টি কারখানা নিবন্ধিত হয়েছে। ফলে শুধু বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার সংখ্যা দিয়ে পোশাক শিল্পের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না।’
অন্যদিকে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে এহসান শামিম জানান, গ্যাস পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি এবং ডাইং চালানোর মতো অবস্থাও নেই। গ্যাস সংকটে উৎপাদন গড়ে অন্তত ৬০ শতাংশ কমেছে। কাঁচামাল না পাওয়ায় কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে, শ্রমিকদের ছুটি দেয়া হচ্ছে। কোথাও দীর্ঘমেয়াদি ছুটি, কোথাও টানা নয় দিন পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটেছে।
তিনি জানান, আমদানীকৃত কাপড় ব্যবহারকারী কিংবা ওভেন খাতের কারখানাগুলোর সমস্যা তুলনামূলক কম। স্থানীয়ভাবে কাপড় ডাইংয়ের ওপর নির্ভরশীল নিট কারখানাগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত ছয় মাসে প্রায় ১৬ থেকে ১৮টি কারখানা বন্ধ হয়েছে বলেও জানান তিনি।
খাতভিত্তিক সংকটের সঙ্গে দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতেও একই রকম চিত্র দেখা যাচ্ছে। সাভার-ধামরাইয়ে দিনের বড় সময় পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্য থাকছে। পাশাপাশি বিদ্যুতের ঘাটতিও রয়েছে। ফ্যাশন গ্লোব গ্রুপের ওয়াশিং প্লান্টে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। বাইরে থেকে গ্যাস এনে উৎপাদন চালাতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা বাড়তি ব্যয় হচ্ছে।
জামগড়ার লিটল স্টার স্পিনিং মিলে ছয়টি সেকশনের মধ্যে মাত্র দুটি চালু রাখা হয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘায়িত হলে ৩০ শতাংশ জনবল কমানোর আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা খোরশেদ আলম।
গাজীপুরে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্টাইলিশ গার্মেন্টসের চেয়ারম্যান মো. সালাউদ্দিন চৌধুরী জানান, ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন ধরে রাখতে উৎপাদন ৩০-৪০ শতাংশ কমেছে। বাড়তি ব্যয়ের কারণে ক্রয়াদেশ সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রামে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও বিদ্যুৎ সংকট নতুন করে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত করছে। বায়েজিদ স্টিল, সালেহ স্টিল, গোল্ডেন ইস্পাত ও পেনিনসুলা স্টিলের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। সীমা স্টিল ও এইচএম স্টিলের মতো প্রতিষ্ঠানে সক্ষমতার ২০-৩০ শতাংশ উৎপাদন চলছে।
শিল্পাঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় যুক্ত সরকারি সংস্থার তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত তাদের আওতাধীন আটটি ইউনিটে ৭৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে আশুলিয়ায় রয়েছে ১৫টি, গাজীপুরে ১৭টি, চট্টগ্রামে ২৬টি, নারায়ণগঞ্জে ৯টি, ময়মনসিংহে দুটি এবং খুলনা ও কুমিল্লায় মোট ছয়টি কারখানা। তবে সিলেট অঞ্চলে কোনো কারখানা বন্ধের তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব কারখানা বন্ধ হওয়ায় ১৭ হাজার ৮৫৬ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন।
জানা গেছে, এসব কারখানা বন্ধের পেছনে শুধু গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট দায়ী নয়। পর্যাপ্ত কাজ বা ক্রয়াদেশের অভাব, মালিকের আর্থিক সংকট এবং ব্যাংক ঋণের চাপও বড় কারণ। বন্ধ হওয়া কারখানার মধ্যে ২৩টি পর্যাপ্ত কাজ না থাকায়, ৯টি আর্থিক সংকটে এবং ১২টি কাজের অভাব ও আর্থিক সংকটের যৌথ কারণে বন্ধ হয়েছে। ব্যাংক ঋণের কারণে বন্ধ হয়েছে আরো ১৫টি। বাকি কারখানাগুলো বন্ধ হয়েছে শ্রমিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক কারণ, কাঁচামালের অভাব, ফ্যাক্টরি স্থানান্তর ও অন্যান্য কারণে।
অন্যদিকে গত জুলাইয়ে এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট তীব্র গ্যাস সংকটে ৩৩৯টি কারখানা সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া গ্যাসের চাপ না থাকায় উৎপাদন সক্ষমতা একেবারেই ব্যবহার করতে পারছে না ১৭টি কারখানা।
সব মিলিয়ে দেশে বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়টি ক্রমে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা। গ্লাসে উৎপাদন ধরে রাখতে ডিজেল পোড়াতে হচ্ছে, রডে উৎপাদনের সঙ্গে বিক্রিও কমেছে, সিমেন্টে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও ঋণের চাপ, সিরামিকে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সংকট, টেক্সটাইলে অনেক কারখানার উৎপাদন বন্ধ এবং পোশাকে ডাইং-ওয়াশিং-স্পিনিংয়ে বড় চাপ—প্রতিটি খাতই সংকটের ভিন্ন ভিন্ন চেহারা দেখাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, বৃহৎ শিল্পে উৎপাদন কমে যাওয়াকে শুধু সাময়িক চাহিদা-সংকট দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বাস্তব চিত্রটি ধরা পড়বে না। এর পেছনে রয়েছে একাধিক দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এসব সমস্যার মধ্যে রয়েছে উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, কাঁচামাল আমদানিতে ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ভোগ্যপণ্যের বাজারে চাহিদা দুর্বল হয়েছে। একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যকরী মূলধনের খরচ বেড়েছে। অর্থাৎ উদ্যোক্তা একদিকে উৎপাদন খরচের চাপ সামলাচ্ছেন, অন্যদিকে পণ্য বিক্রির নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় না গিয়ে উৎপাদন কমানোই স্বাভাবিক।’
এর মধ্যে একটি গভীরতর কাঠামোগত সংকটও আছে উল্লেখ করে ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘বাংলাদেশের শিল্প খাত এখনো আমদানিনির্ভর; কাঁচামাল, জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও মধ্যবর্তী পণ্যের সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও উৎপাদন ব্যাহত করে। এর সঙ্গে রয়েছে নীতির অনিশ্চয়তা, দুর্বল অবকাঠামো, উচ্চ লজিস্টিক ব্যয়, ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট এবং বিনিয়োগের প্রতিকূল পরিবেশ। ফলে বর্তমান উৎপাদন পতনকে শুধু “মন্দা” হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার দুর্বলতারও লক্ষণ। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেবল প্রণোদনা বা সস্তা ঋণ যথেষ্ট নয়। নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা, সুদের হার ও ঋণপ্রবাহের স্বাভাবিকীকরণ, আমদানি ব্যবস্থার পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং ব্যবসার নীতিগত পরিবেশে আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।’