রাজধানী ঢাকার নিউ ইস্কাটনের বাসিন্দা এ কে এম ইকবাল হোসেনের গত জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল এসেছিল ৩২ হাজার ৮২৫ টাকা। কিন্তু জুলাই মাসে সেই বিল এক লাফে কমে আসে ২৩ হাজার টাকার নিচে।
জুন মাসে বিদ্যুতের দাম ১৭ শতাংশ বাড়ানোর আগে, গরমের দিনে তার বিল সাধারণত ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যেই থাকত। ইকবাল হোসেনের মতে, নতুন বর্ধিত দাম ধরলেও জুলাইয়ের বিলটিই আসল খরচের কাছাকাছি রয়েছে।
একই অভিজ্ঞতা শ্যামলীর বাসিন্দা মো. ফারুকের। গরমে স্বাভাবিক সময়ে তার বিল আসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। কিন্তু জুন মাসে তা বেড়ে প্রায় সাত হাজার টাকা হয়ে যায়। আবার জুলাইয়ে এসে বিলটি কমে তিন হাজার টাকার কিছু ওপরে নেমে আসে।
জুন মাসজুড়ে সারা দেশে যখন এমন ভুতুড়ে বিলের বন্যা বইছিল, তখন বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে বলা হয়—তীব্র গরমের কারণে বিদ্যুৎ বেশি ব্যবহার করা হয়েছে এবং নতুন দাম কার্যকর হওয়ার কারণেই বিল বেশি এসেছে। কিন্তু সরকারের এই যুক্তি সত্যি হলে জুলাই মাসের বিলও একই রকম বেশি হওয়ার কথা ছিল। তা না হয়ে নতুন দাম বহাল থাকার পরও জুলাইয়ে হঠাৎ অনেকের বিল আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল কীভাবে?
এটি কেবল দু-একজনের সমস্যা নয়। সারা দেশের অসংখ্য গ্রাহক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যম এবং বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে অস্বাভাবিক বিলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কিন্তু বিদ্যুৎ অফিসগুলো থেকে গ্রাহকদের বারবার একই কথা শোনানো হয়—গরমে ব্যবহার বেড়েছে আর হিসাবের কারণেই বিল বেশি এসেছে।
অভিযোগের সত্যতা জানতে সম্প্রতি ডিপিডিসি’র বিদ্যুৎ ভবন, ধানমন্ডি ও আদাবরসহ কয়েকটি কার্যালয়ে গিয়ে কোনো গ্রাহকের দেখা মেলেনি। অথচ আগের মাসেই এসব অফিসে জুন মাসের ভুতুড়ে বিলের প্রতিকার চাইতে শয়ে শয়ে মানুষ ভিড় করেছিলেন।
শ্যামলীর বাসিন্দা ফারুক বলেন, ‘এবার যেহেতু বিল খুব বেশি বাড়েনি, তাই আর ঝামেলা না করে দিয়ে দিয়েছি।’ তিনি যোগ করেন, ১৭ শতাংশ দাম বাড়লে আড়াই হাজার টাকার বিল তিন হাজার টাকা হওয়াটা মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু সাত হাজার টাকা অবিশ্বাস্য।
ধানমন্ডির নাজমুল ইসলামও একই ঝামেলায় পড়েন। স্বাভাবিক সময়ে তার বিল চার থেকে সাড়ে ৪ হাজার এলেও জুনে এসে দাঁড়ায় নয় হাজার টাকার ওপরে।
তিনি বলেন, ‘এত বিল দেখে আমি আঁতকে উঠেছিলাম। সমাধান পাওয়ার আশায় ডিপিডিসি অফিসে যাই, কিন্তু কোনো সুরাহা মেলেনি। পরে বুঝলাম বারবার ঘুরে শুধু শুধু সময় নষ্ট হবে, তাই বাধ্য হয়ে বিলটা মেটাতে হলো।’
সরকারের দেওয়া ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নাজমুল বলেন, ‘গরম আর বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণেই যদি বিল বেশি আসে, তাহলে জুলাই মাসেও তো বিল দুই-তিন গুণ বেশি আসার কথা ছিল। কিন্তু সেটা তো হলো না।’
বাড্ডার বাসিন্দা মারুফ হোসেন জানান, স্বাভাবিক গরমে তার বিল আসে এক হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু জুনে তা বেড়ে আড়াই হাজার টাকা হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ এত বিল দেখে অবাক হলেও অঙ্কটা খুব বেশি না হওয়ায় মাথা ঘামাইনি। তবে জুলাই মাসের বিল আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে গেছে।’
দেশজুড়ে ভুতুড়ে বিলের এসব খবর বের হওয়ার পর, গত ২ জুলাই বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখের সভাপতিত্বে জেলা প্রশাসক ও বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর কর্তাদের নিয়ে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সব অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হয়। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর গাফিলতি বা দুর্নীতি প্রমাণ হলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।
তবে আজ পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদৌ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা প্রকাশ করেনি বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
জুলাই মাসে কেন বিদ্যুৎ বিল আবার স্বাভাবিকের কাছাকাছি ফিরে এল–তা জানতে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
তবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিমের দাবি, প্রায় ৫ কোটি গ্রাহকের মধ্যে দু-একটি জায়গায় মিটার রিডিংয়ে ভুল হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমরা যাচাই করে দেখেছি গ্রাহকদের অধিকাংশ অভিযোগই ঠিক নয়। গরমে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ে, তাই বিলও বেশি এসেছে।’
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রীও ভুতুড়ে বিলের সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। ফেসবুকে ডাবল বিলের অভিযোগ করা এক সাংবাদিকের বাড়ি পরিদর্শনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার লোক গিয়ে দেখে এসেছে—তিনি ঘরে দুটো এসি চালান, ফ্রিজ আছে, ব্লেন্ডারসহ অনেক ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করেন। এত কিছু ব্যবহার করার পরও যদি সাত হাজার টাকা বিল বেশি মনে হয়, তবে দুনিয়ার কোথাও এত কম টাকায় এসব চালানো সম্ভব নয়।’