দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ল। কিন্তু বেতন বাড়ার এই সুখবরের সঙ্গে অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে বড় অঙ্কের ব্যয়ের প্রশ্ন। নতুন পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য রাখা হয়েছে ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেটের ঘাটতিই ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। ফলে পূর্ণ পে-স্কেলের অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ বর্তমান বাজেট ঘাটতির প্রায় ৪৩ শতাংশের সমান। বর্তমান সময়ে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও জ্বালানি খাতে চাপ, রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা এবং ঋণের সুদ পরিশোধের বাড়তি দায় রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে-২৪ লাখ সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়ানোর এই বিশাল ব্যয় সরকার কোথা থেকে মেটাবে? ঋণ করে বেতন দিলে ভবিষ্যতে এর বোঝা কে বইবে, আর এই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত ১৮ কোটির বেশি মানুষের অর্থনীতিতে কতটা চাপ তৈরি করবে?
নতুন পে-স্কেলের অর্থসংস্থানই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও সরকার একবারে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়ন করছে না। মূল বেতন ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে কার্যকর হবে। বিভিন্ন ভাতা একযোগে কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। ফলে সরকারের ওপর একসঙ্গে বড় ধরনের চাপ পড়বে না। কিন্তু সমস্যা হলো-বেতন ও ভাতার এই বাড়তি ব্যয় একবার শুরু হলে তা আর এককালীন থাকবে না। প্রতি বছরই সরকারের স্থায়ী ব্যয় বাড়বে। এর সঙ্গে ভবিষ্যৎ ইনক্রিমেন্ট, পেনশন ও অন্যান্য সুবিধার ব্যয়ও বাড়বে। এখানেই রাজস্ব আদায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। রাজস্ব আয় না বাড়লে সরকারকে উন্নয়ন ও অন্যান্য ব্যয় কমাতে হবে, নয়তো ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে। সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের ঋণ নেওয়ার বক্তব্য তাই নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাষ্ট্রের আয় বাড়ানোর সক্ষমতা না বাড়িয়ে নিয়মিত ব্যয় মেটাতে ঋণ নেওয়া হলে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক চাপ বাড়বে। ২০১৫ সালের অষ্টম পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময়ও বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়েছিল। কিন্তু পে-স্কেলের জন্য আলাদা করে বড় ঋণ নিয়ে বেতন দেওয়ার কোনো স্পষ্ট নজির নেই। বরং সাধারণ বাজেটের আয়-ব্যয়ের কাঠামোর মধ্যেই অতিরিক্ত ব্যয় সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়েছে। এবারও সরকারের অবস্থান একই-মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বছরগুলোর বাজেটে অর্থের সংস্থান রাখা হবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি সচিবালয়ে বলেন, সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক সংকট কমলে দুর্নীতির প্রবণতাও কমতে পারে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজনীয় হলেও দুর্নীতি কমানোর জন্য এটি যথেষ্ট নয়। এ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন না থাকলে সরকারি কর্মচারীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাগত উৎকর্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত সেবা আশা করা কঠিন। কিন্তু শুধু বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি কমবে-এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়। তিনি নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যুক্ত করার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদবিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা উচিত। শুধু নিজের নয়, পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের আয় ও সম্পদের হিসাবও প্রতিবছর হালনাগাদ করতে হবে।
উল্লেখ্য, নতুন জাতীয় বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে বেড়ে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। সর্বনিম্ন গ্রেডে বেতন বেড়েছে ১৪২ শতাংশ, আর সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ। প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক সরকারি কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী এর আওতায় আসবেন। নবম পে-স্কেল মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হওয়ার পর সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। দ্বিগুণেরও বেশি বেতন বাড়ায় তাদের মধ্যে স্বস্তি নেমে এসেছে। সচিবালয়ে কর্মরত কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন ইতোমধ্যে সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং খেটে খাওয়াসহ দেশের ১৮ কোটি সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি আরেক দফা বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরকারের সামনে চারটি বড় পরীক্ষা : নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার পর থেকে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়বে। এখন সরকারের উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। দ্বিতীয় পরীক্ষা-রাজস্ব আয় বাড়ানো। বাড়তি ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার স্থায়ী ব্যয় সামলাতে কর আদায় বাড়াতে হবে। শুধু ঋণের ওপর নির্ভর করলে ভবিষ্যৎ বাজেটে সুদ ও ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে। তৃতীয় পরীক্ষা-উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানো। সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ার সঙ্গে যদি উৎপাদন না বাড়ে, তাহলে বাজারে চাহিদা-সরবরাহের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। তাই শিল্প, কৃষি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর নীতি একই সঙ্গে কার্যকর করতে হবে। চতুর্থ পরীক্ষা-দুর্নীতি ও অপচয় কমানো। বেতন বাড়িয়ে যদি সরকারি সেবার মান না বাড়ে, দুর্নীতি না কমে এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত না হয়, তাহলে জনগণের কাছে পে-স্কেলের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ সম্প্রতি যুগান্তরকে বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়েছে। তাদের বেতন বাড়ানো প্রয়োজন। এজন্য নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন সরকারের উদ্যোগ ঠিকই আছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতি বন্ধে সরকারকে সজাগ থাকতে হবে। সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, নতুন পে-স্কেল সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়। বর্তমান বাজারে জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডে প্রায় ১৪০ শতাংশ এবং কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব যৌক্তিক। সরকারকে এমন কৌশল নিতে হবে যাতে মূল্যস্ফীতি না হয়। তিনি বলেন, সরকার পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাজেট ও আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়েছে। মূল বেতন চলতি অর্থবছর থেকেই দেওয়া শুরু হবে; কিন্তু ভাতার অংশ ধাপে বাস্তবায়ন করায় সরকারের ওপর একসঙ্গে বড় চাপ পড়বে না।
নিম্ন গ্রেডে বেতন বৃদ্ধি ইতিবাচক : নতুন স্কেলের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো নিম্ন গ্রেডে তুলনামূলক বেশি হারে বেতন বাড়ানো। ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে ২০ হাজার টাকায় ওঠায় বৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১৪২ শতাংশ। বিপরীতে প্রথম গ্রেডে ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত আগের ১:১.৯৪৫ থেকে কমে ১:১.৭৮ হয়েছে। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া আগে থেকেই নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন একবারে বড় হারে বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। তার যুক্তি, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয় ও আর্থিক চাপ বেশি। তিনি বলেন, অতীতে আকর্ষণীয় পে-স্কেল দেওয়া হলেও দুর্নীতি কমেনি। তাই বেতন বৃদ্ধি ও দুর্নীতি হ্রাসের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক নেই। তার মতে, দুর্নীতির বড় অংশ এখন ক্ষমতাকেন্দ্রিক উচ্চপর্যায়ে হয়; শত শত কোটি টাকা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কাছে মাসিক বেতন বড় বিষয় নয়। তিনি বলেন, সরকারি চাকরি আইন ও শৃঙ্খলা-আপিল বিধিমালার কিছু দুর্বলতা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করছে। তাই বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কার জরুরি।