ঢাকা কাস্টম হাউসকে হাত করে অবৈধ পণ্য আমদানি এখন যেন মামুলি ব্যাপার। টাকা ঢাললেই শুল্ক কর্মকর্তা, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারকের যোগসাজশে গড়ে ওঠা বিশাল এক সিন্ডিকেটে অসম্ভব সব কাজ সম্ভব হচ্ছে নিমেষেই। ঘুষের বিনিময়ে এই সিন্ডিকেট পার করে দিচ্ছে আমদানি নিষিদ্ধ পুরোনো ল্যাপটপ থেকে শুরু করে মিথ্যা ঘোষণায় আনা নানা বাণিজ্যিক পণ্য। এমনকি এই সিন্ডিকেটের ছত্রছায়ায় বন্ডেড সুবিধায় পণ্য আমদানি করে তা খোলাবাজারে বিক্রিও করা হচ্ছে। এতে করে একদিকে অসৎ শুল্ক কর্মকর্তাদের পকেট ভারী হচ্ছে, অন্যদিকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে আসার পর নড়েচড়ে বসেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ইতোমধ্যে পুরো বিষয়টি তদন্ত করতে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছে এনবিআর। একই সঙ্গে ঢাকা কাস্টম হাউসকেও বিষয়টি আমলে নিতে বলা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ঢাকা কাস্টম হাউসের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে ১০ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও ৮ আমদানিকারকের যোগসাজশে গড়ে উঠেছে বিশাল এক সিন্ডিকেট। প্রতিনিয়ত এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে খালাস করা হচ্ছে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আনা পণ্যের চালান। সিন্ডিকেটটির অন্যতম প্রধান কাজ বিদেশ থেকে আমদানি নিষিদ্ধ পুরোনো ল্যাপটপ নিয়ে আসা। এর পাশাপাশি এই সিন্ডিকেটের হাত ধরে প্রতিনিয়ত মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য চালান খালাস হচ্ছে।
এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা হলেন— তাজিয়া এন্টারপ্রাইজের জীবন চৌধুরী, সিনথিয়া এন্টারপ্রাইজের মো. শাজাহান, আরিফা লজিস্টিক লিমিটেডের রুবেল, ফাহিম ফাইভ স্টারের উজ্জ্বল, মনোয়ারার সাইদুল, লাবিবা এন্টারপ্রাইজের লিটন, থ্রি আরের গোলাম রাব্বি, ডে লাইটের তাজুল ইসলাম, মমতা এন্টারপ্রাইজের মমতাজ উদ্দিন, আনান ইন্টারন্যাশনালের শামীম। এদের মধ্যে আগে থেকে সিনথিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা শাজাহানের বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও প্রভাব বিস্তার করে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পণ্য খালাসের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া দফায় দফায় মিথ্যা ঘোষণার অভিযোগে মামলাও ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পরবর্তী সময়ে কিছুদিন আড়ালে থাকলেও ফের সক্রিয় হয়েছেন তিনি। গড়ে তুলেছেন আমদানি নিষিদ্ধ ল্যাপটপের সিন্ডিকেট।
এই দলে রয়েছেন তাজিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক আওয়ামী লীগ আমলের আরেক প্রভাবশালী সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট জীবন চৌধুরী এবং আরিফা লজিস্টিকের মালিক রুবেল। মিথ্যা ঘোষণায় দ্রুত পুরোনো ল্যাপটপ ও এলসিডি খালাসে এই তিন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আমদানিকারকদের অন্যতম ভরসা বলে নিশ্চিত করেছেন খোদ কাস্টম হাউসের কর্মকর্তারা। এই সিন্ডিকেটের আরেক প্রভাবশালী সদস্য আনান ইন্টারন্যাশনালের শামীম। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ঢাকা কাস্টম হাউসে প্রভাবশালী সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার সখ্যও অনেক বেশি। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে এই সিন্ডিকেটের এক সদস্য দেখা করে ব্যবসায়িক মিটিং করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে তাজিয়া এন্টারপ্রাইজের জীবন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বিষয়টি নিয়ে পরে কথা বলবেন বলে জানান। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। এরপর সিনথিয়া এন্টারপ্রাইজের মো. শাজাহান, আরিফা লজিস্টিকের রুবেল, আনান ইন্টারন্যাশনালের শামীম ও ফাহিম ফাইভ স্টারের উজ্জ্বলের মুঠোফোনে বারবার কল দেওয়া হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে লাবিবা এন্টারপ্রাইজের লিটন কালবেলাকে জানিয়েছেন, তিনি কোনো ধরনের পুরাতন ল্যাপটপ আমদানি করেন না।
সূত্র জানায়, ঢাকা কাস্টম হাউসের এই সিন্ডিকেট শুধু পুরোনো ল্যাপটপই আমদানি করে না, ঘুষের মাধ্যমে শুল্ক কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে মিথ্যা ঘোষণায় বাণিজ্যিক পণ্যকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পণ্য হিসেবে কম শুল্কে খালাস করে দেয়। এ ছাড়া এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে পণ্যের চালানের তথ্য নিয়ে প্রতারণা করার বিষয়টিও উঠে এসেছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। বিষয়টি আমলে নিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে এনবিআরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআর কমিটি করে বিষয়গুলো তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরকে। যদিও শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর পুরোনো ল্যাপটপ আমদানির ক্ষেত্রে ঢাকা কাস্টম হাউসের একটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বেশ কয়েকটি পণ্য চালানে লক দিয়েছে এবং ফাইন্ডিং পেয়েছে। তবে একই ধরনের পণ্য আমদানি করলেও বাকি চালানের বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দা অনেকটা নীরব ভূমিকায় ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
একটি প্রতিষ্ঠানের আনা পণ্যের চালান লক করা হলেও অন্যগুলো কেন হচ্ছে না—এই বিষয়ে জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সফিউর রহমান কালবেলাকে বলেন, শুল্ক গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করে। ঢাকা কাস্টম হাউসে যেসব এয়ারওয়ে বিলে পুরোনো ল্যাপটপ আমদানি হয়েছে বলে তথ্য পেয়েছি, সেসব এয়ারওয়ে বিলে লক দিয়েছি।
তবে আমদানি নিষিদ্ধ পণ্যের চালান লক করার ক্ষেত্রে বৈষম্য হচ্ছে— এমন অভিযোগ মানতে নারাজ শুল্ক গোয়েন্দার মহাপরিচালক। তিনি জানান, সিন্ডিকেট নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে সে বিষয়ে তদন্ত করতে কমিটি গঠন করা হবে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা কাস্টম হাউসে শুল্ক ফাঁকির মহোৎসব চললেও বিষয়টি নিয়ে অনেকটা নির্বিকার ঢাকা কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষ। মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি হলেও এর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সময়ক্ষেপণ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, এক কর্মকর্তাকে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা কাস্টম হাউসের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পদায়ন করে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। পদোন্নতি পাওয়ার পরও ওই কর্মকর্তাকে ঢাকা কাস্টম হাউসের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে রাখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তার সময়ে ঢাকা কাস্টম হাউস দিয়ে পণ্য চালান অবাধে খালাস হলেও যাচাই-বাছাই ছিল যৎসামান্য। দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগ নিয়েছে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারকরা। কাস্টম হাউসের দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে বন্ডেড সুবিধায় আনা পণ্য খালাস করে খোলাবাজারে বিক্রি করেছে ৮ প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—তুয়ানি প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ, তাম্মি এক্সেসরিজ ইন্ডাস্ট্রিজ, রেডিয়ান্ট এক্সেসরিজ ইন্ডাস্ট্রিজ, হোলি ইলাস্টিক লিমিটেড, তাকওয়া ট্রেড ইন্ডাস্ট্রিজ, মিরহা এক্সেসরিজ ইন্ডাস্ট্রিজ, ওমর গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ ও ডংহ বিডি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকিসহ গুরুতর অনিয়মের বিষয়টি উঠে এসেছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি কমিটি গঠন করে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছে এনবিআর। যদিও গতকাল সন্ধ্যায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শুল্ক গোয়েন্দা ও ঢাকা কাস্টম হাউস থেকে কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি।
জানতে চাইলে ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহা. মসিউর রহমান কালবেলাকে বলেন, পুরোনো ল্যাপটপ আমদানির বিষয়ে এনবিআর থেকে একটি চিঠি আমরা পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। যারা অনিয়ম করে, তাদের বিষয়ে শক্ত অবস্থান নিয়েছি।
কর্মকর্তাদের ঘুষ নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কাস্টম হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, দ্রুততম সময়ে আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় যাব। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের প্রমাণ পেলে বিষয়টি নিয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা কাস্টম হাউসের এই সিন্ডিকেটের বিষয়ে জানতে কাস্টম হাউসগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত এনবিআরের (শুল্ক নীতি ও আইসিটি) সদস্য মুহাম্মদ মুবিনুল কবীরের সঙ্গে দেখা করতে গেলে, তার দপ্তর থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা করেন না। পরবর্তীতে এনবিআরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য হিসেবে তার বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে বিষয়টি উল্লেখ করে খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।