Image description

প্রিয়জন হারানোর অমলিন স্মৃতি কবর। বংশ পরম্পরায় মানুষ তার সেই দৃশ্যমান স্মৃতির সঙ্গে বসবাস করে। অনেক কিছু দেওয়-নেওয়ার এই ঢাকা শহর সেই স্মৃতিটুকুও কেড়ে নেয় একটা সময়। জীবনের শেষ ঠিকানায়ও চলে টাকার দাপট। যতদিন টাকা আছে ততদিন আপনার প্রিয়জনের কবর ‘আপনার’। 

বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আড়াই থেকে সাড়ে তিন কোটি মানুষের এই শহরে মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সংকট মৃত্যুর পরের আবশ্যিক প্রয়োজন সাড়ে তিন হাত জায়গার। সরকারি কবরস্থানে এই সংকট এত বেশি প্রকট হয়ে উঠছে যে সাধারণ কবরের ‘আয়ু’ এখন ১৮ মাস থেকে দুই বছর।

মানে এই শহরে দুই বছরের মধ্যেই কবরটি পুনর্ব্যবহারের প্রয়োজন হচ্ছে। একই কবরে শায়িত হচ্ছেন অন্য কেউ। যে কবরটিতে আপনার কাছের মানুষকে চিরদিনের জন্য শুইয়ে এসেছেন সেখানে ১০ বছরের মধ্যে শায়িত হচ্ছেন আরও পাঁচ থেকে সাতজন। এটা গেলো যাদের টাকা নেই তাদের হিসাব। 

 

‘টাকা থাকলে বাঘের দুধ মেলে’ বহুল প্রচলিত একটি বাংলা প্রবাদ। এই প্রবাদটি কবরের মতো একটি বিষাদময় বিষয়ের সঙ্গেও প্রাসঙ্গিক। আপনার যদি টাকা থাকে তাহলে নির্দিষ্ট শর্তে একটি কবর ১০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণের সুযোগও রয়েছে এই শহরে। 

প্রথম পর্ব পড়ুন

কত সেই খরচ? ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কোনো কোনো কবরস্থানে ২৫ বছরের কবর সংরক্ষণ ফি এখন সর্বোচ্চ দেড় কোটি টাকা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) যা এখনো সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকায় সম্ভব হচ্ছে।

জায়গার সংকট সবার জন্য সমান হলেও শেষ ঠিকানা ধরে রাখার সুযোগেও অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকট।

সাধারণ কবর বনাম লাখপতিদের কবর

রাজধানীর সরকারি কবরস্থানগুলোতে সাধারণ কবর স্থায়ী নয়। জায়গার সংকটের কারণে নির্দিষ্ট সময় পর পুরোনো কবর পুনর্ব্যবহার করা হয়। আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানের সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণ কবর সাধারণত ১৮ মাস থেকে দুই বছর পর পুনরায় ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়। সংরক্ষিত কবর দীর্ঘ মেয়াদে অক্ষত রাখার সুযোগ রয়েছে।

বনানী কবরস্থান/ছবি: বিপ্লব দিক্ষীৎবনানী কবরস্থান/ছবি: বিপ্লব দিক্ষীৎ

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ‘নিয়ন্ত্রণাধীন কবরস্থান পরিচালনা নীতিমালা–২০২০’ অনুযায়ী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বরেণ্য ব্যক্তি, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং একুশে ও স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কবর নির্দিষ্ট মেয়াদে সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে।

সংরক্ষণের মেয়াদ ও ফি

১০ বছরের জন্য ৫ লাখ টাকা, ১৫ বছর ১০ লাখ, ২০ বছর ১৫ লাখ ও ২৫ বছর হলে ২০ লাখ টাকা।

সংরক্ষিত কবরে বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান বা ভাই-বোনকে পুনঃদাফনের জন্য ৫০ হাজার টাকা ফি নির্ধারিত রয়েছে।

ডিএসসিসির আওতাধীন নির্দিষ্ট কবরস্থানে একটি কবর ২৫ বছর সংরক্ষণ করতে শুধু সংরক্ষণ বাবদই দিতে হয় ২০ লাখ টাকা। এছাড়া প্রতিটি কবরের রেজিস্ট্রেশন ফি ৫শ টাকা

অর্থাৎ, ডিএসসিসির আওতাধীন নির্দিষ্ট কবরস্থানে একটি কবর ২৫ বছর সংরক্ষণ করতে শুধু সংরক্ষণ বাবদই দিতে হয় ২০ লাখ টাকা। এছাড়া প্রতিটি কবরের রেজিস্ট্রেশন ফি ৫শ টাকা।

আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানের মোহরার হাফিজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের রেজিস্ট্রেশন ফি ছিল সাধারণ কবরের ক্ষেত্রে এক হাজার টাকা, সেটাকে কমিয়ে অর্ধেক করা হয়েছে। এখন রেজিস্ট্রেশন ফি ৫শ টাকা। সরকারি ফি ৫শ টাকা করার কারণে বাঁশ, চাটাই, কবর খোঁড়াসহ শূন্য থেকে তিন বছর পর্যন্ত একটা মরদেহ দাফন করতে ৯৪৮ টাকা খরচ হয়। বড়দের ক্ষেত্রে খরচ হয় ১ হাজার ৬০৫ টাকা।’

কেউ অতিরিক্ত অর্থ দাবি করলে কর্তৃপক্ষকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।

মোহরার জানান, সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত রেজিস্ট্রেশন ফির বিনিময়ে সাধারণত দেড় বছর থেকে সর্বোচ্চ দুই বছর কবর থাকার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। তবে বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক কারণে সময়ের সঙ্গে কবরের মাটি দেবে যেতে পারে। আবার কবরস্থানের উর্বর মাটিতে দ্রুত গাছপালা জন্মানোর কারণে অনেক সময় কবরটি বাইরে থেকে চেনা কঠিন হয়ে পড়ে। কবর সমান হয়ে গেলেও নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কবর তুলে ফেলা হয় না।

এক কবরের জন্য ফি দেড় কোটি টাকা

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কবরস্থানগুলোতেও দীর্ঘমেয়াদি কবর সংরক্ষণের জন্য নির্ধারিত ফি রয়েছে। প্রকাশিত ফি-তালিকায় কবরস্থানভেদে এ ফিতে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়।

বনানী কবরস্থানে ১৫ বছরের ফি ১ কোটি ও ২৫ বছরের জন্য ফি ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে একই সময়ের জন্য ফি যথাক্রমে ৭৫ লাখ ও ১ কোটি টাকা। উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে ৫০ লাখ ও ৭৫ লাখ টাকা। উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে ৩০ লাখ ও ৫০ লাখ টাকা। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ২০ লাখ ও ৩০ লাখ টাকা। রায়েরবাজারে ১৫ বছরের জন্য ১০ লাখ ও ২৫ বছরের জন্য ১৫ লাখ টাকা।

 

অর্থাৎ, একই মেয়াদের সংরক্ষণে কবরস্থানভেদে পার্থক্য ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত।

উত্তর সিটি করপোরেশনে শুধু পুনঃকবরের ক্ষেত্রে বনানী কবরস্থানের ফি ৫০ হাজার ৫শ টাকা। অন্য কবরস্থানে ৩৫ হাজার ৫শ টাকা। প্রতিটি কবরের রেজিস্ট্রেশন ফি ১০০০ টাকা

উত্তর সিটি করপোরেশনে শুধু পুনঃকবরের ক্ষেত্রে বনানী কবরস্থানের ফি ৫০ হাজার ৫০০ টাকা। অন্য কবরস্থানে ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা। প্রতিটি কবরের রেজিস্ট্রেশন ফি ১০০০ টাকা।

একদিকে একজন সাধারণ মানুষের কবর ১৮ মাস থেকে দুই বছরের মধ্যে পুনর্ব্যবহারের প্রয়োজন হচ্ছে। অন্যদিকে নীতিমালার আওতায় থাকা একটি কবর ১০, ১৫, ২০ কিংবা ২৫ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণও করা যাচ্ছে। পার্থক্যটি শুধু সময়ের নয় অর্থেরও। যদিও বর্তমানে সাধারণ কবর সংরক্ষণ পুরোপুরি বন্ধ।

৫০ হাজার টাকা দিয়ে পাকা কবর

আজিমপুর কবরস্থানে সংরক্ষিত কবরের অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি উদাহরণ পাওয়া যায় রায়েরবাজারের বাসিন্দা মরহুম সোনা মিয়ার পরিবারের ক্ষেত্রে। রক্তের সম্পর্ক (আগের কেনা)। 

প্রায় দুই বছর আগে তাকে আজিমপুর কবরস্থানে কেনা ও পাকা করা কবরে দাফন করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তার এক চাচাতো ভাই জানান, কেনা কবরে দাফনের জন্য সরকারি ৫০ হাজার টাকা ফিসহ তাদের মোট প্রায় ৬০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।

কবর সংরক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা গৌতম কুমার বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, ‘কবরের ক্ষেত্রে সাধারণ ও সংরক্ষিত- দুই ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। সংরক্ষিত কবরের মেয়াদ ১৫ ও ২৫ বছর।’

কবর সংরক্ষণের ফি কবরস্থানভেদে আলাদা বলেও জানান তিনি। তার ভাষায়, ‘একেক কবরস্থানের একেক রকম।’

বনানী কবরস্থানে সাধারণ কবরের সংখ্যা তুলনামূলক কম বলেও জানান গৌতম কুমার বিশ্বাস। তার বক্তব্য, ‘আগে কবরের জায়গা কেনার সুযোগ থাকায় অনেক কবর আগেই বিক্রি বা সংরক্ষিত হয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘সাধারণ কবর খুব কম। মানে সাধারণ এরিয়াটা আমাদের বনানীতে, ওই যে ম্যাক্সিমাম কবর আগে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।’

তবে সাধারণ এলাকার সুনির্দিষ্ট শতাংশ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তথ্য না দেখে তা বলা সম্ভব নয়।’

দুই দশকে বদলেছে কবর সংরক্ষণের হিসাব

প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো আজিমপুর কবরস্থান রাজধানীর সবচেয়ে বড় সরকারি কবরস্থান। একসময় এটিই ছিল ঢাকার একমাত্র সরকারি কবরস্থান। ১৯১১ সাল থেকে এখানে দাফনের তথ্য সংরক্ষণ করা হলেও এ পর্যন্ত মোট কতজন নারী, পুরুষ ও শিশুকে দাফন করা হয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান তাৎক্ষণিকভাবে দিতে পারেনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। 

আজিমপুর এলাকার আদি বাসিন্দা রহমত আলী বলেন, প্রায় দুই দশক আগেও আজিমপুর কবরস্থানে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কবরের জায়গা লিজ নেওয়ার সুযোগ ছিল এবং খরচও তুলনামূলক কম ছিল। সময়ের সঙ্গে কবর সংরক্ষণ ও পুনঃদাফনের ফি কয়েক দফায় বেড়েছে।

মুরাদপুর কবরস্থান/ছবি: বিপ্লব দিক্ষীৎমুরাদপুর কবরস্থান/ছবি: বিপ্লব দিক্ষীৎ

২০১৩ সালের কবরস্থান নীতিমালা অনুযায়ী দাফনের ক্ষেত্রে অনুমোদিত ঠিকাদারের (বাঁশ, চাটাই ও কবর খনন ফি) বিল ছাড়াও দাফন বাবদ নির্ধারিত নিবন্ধন ফি ছিল ২শ টাকা। এছাড়া সংস্থাটির অনুমতিতে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি রক্ষার্থে বিনা ফিতে ১০ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। 

কবর সংরক্ষণের জন্য ফি বাবদ ৫ বছর মেয়াদি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ১০ বছর মেয়াদি ৩ লাখ টাকা, ১৫ বছর মেয়াদি ৬ লাখ টাকা, ২০ বছর মেয়াদি ৯ লাখ টাকা ও ২৫ বছর মেয়াদি ১২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা ছিল।

সংরক্ষিত কবরের পুনঃফি বাবদ ১৫ হাজার টাকা ধার্য ছিল। এছাড়া সমাধির সংরক্ষণ ফি ১০ বছরের ৩ লাখ টাকা ধার্য ছিল। সমাধির ক্ষেত্রে ১৫ বছরের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২০ বছর মেয়াদি সমাধির সংরক্ষণ ফি ৬ লাখ ও ২৫ বছর মেয়াদি ১২ লাখ টাকা।

২০১৮ সালের ২৫ জুলাই তখনকার মেয়র সাঈদ খোকন সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দেন, ডিএসসিসি এলাকায় মরদেহ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দাফন করা যাবে। 

পরবর্তীসময়ে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস মেয়র হলে কবরের রেজিস্ট্রেশন ফি তিন হাজার টাকা করা হয়। পরে সমালোচনার মুখে তা কমিয়ে ১ হাজার টাকা ধার্য করেন। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালাম সেই ফি আরও কমিয়ে ৫শ টাকা করেন।

মোট কবর ও সংরক্ষিত কবরের সংখ্যা

পুরাতন ও নতুন মিলিয়ে আজিমপুর কবরস্থানের মোট আয়তন ৩৭ দশমিক ৫০ একর। এর মধ্যে পুরাতন কবরস্থান ৩৫ একর ও নতুন কবরস্থান ২ দশমিক ৫০ একর। জুরাইন কবরস্থানের আয়তন ১৭ দশমিক ২৬ একর এবং খিলগাঁও কবরস্থানের আয়তন ৫ একর।

এ তিনটি কবরস্থানে মোট কবরের সংখ্যা ৪১ হাজার ৯শটি। এর মধ্যে আজিমপুর কবরস্থানে ২৫ হাজার, জুরাইন কবরস্থানে ১২ হাজার ৯শ ও খিলগাঁওয়ে চার হাজার কবর রয়েছে।
সংরক্ষিত কবর

এগুলোর মধ্যে আজিমপুর কবরস্থানে সংরক্ষিত কবরের সংখ্যা চার হাজার ৬৫০টি (পুরাতন কবরস্থানে দুই হাজার ৬শটি ও নতুন কবরস্থানে দুই হাজার ৫০টি, যে কবরগুলো সম্পূর্ণ সংরক্ষিত ও পুনঃকবর দেওয়া যায়), জুরাইন কবরস্থানে দুই হাজার ৭শটি, এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তিনটি লাইনে ২শ কবর সংরক্ষিত। 

উত্তর সিটি করপোরেশনের ছয়টি কবরস্থানে মোট কবরের সংখ্যা ১ লাখ ৯ হাজার ৯০৬টি। এর মধ্যে সাধারণ কবর ৮৯ হাজার ৫১১টি ও সংরক্ষিত ২০ হাজার ৩৯৫টি

উত্তর সিটি করপোরেশনের ছয়টি কবরস্থানে মোট কবরের সংখ্যা ১ লাখ ৯ হাজার ৯০৬টি। এর মধ্যে সাধারণ কবর ৮৯ হাজার ৫১১টি ও সংরক্ষিত ২০ হাজার ৩৯৫টি। 

মোট কবরের মধ্যে সাধারণ কবরের সংখ্যা বনানীতে দুই হাজার ৬৭০টি, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবীতে ১২ হাজার ৪৮৯টি, রায়েরবাজারে ৭০ হাজার ১৭৪টি, উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে ৯৪৩টি, উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে ১ হাজার ৯০৪টি ও উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে ১ হাজার ৩৩১টি কবর রয়েছে।

মোট কবরের মধ্যে সংরক্ষিত কবরের সংখ্যা বনানীতে সাত হাজার ৪০৫টি, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবীতে ১২ হাজার ৭৭৫টি, রায়েরবাজারে ২২টি, উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে ৯৪টি, উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে ৯৮টি ও উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে একটি রয়েছে।

একই কবর, নতুন দাফন

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কবরস্থান ব্যবস্থাপনার তথ্যেই সাধারণ কবর পুনর্ব্যবহারের বাস্তবতা স্পষ্ট। জুরাইন কবরস্থানের সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী সেখানে সাধারণ কবর সাধারণত এক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এরপর একই জায়গায় আবার নতুন কবর দেওয়া হয়।

আজিমপুর কবরস্থানের সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত দেড় থেকে দুই বছর পর পুরোনো কবর পুনরায় ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। কবর খননের সময় পুরোনো অস্থি পাওয়া গেলে তা যথাযথ ধর্মীয় বিধান মেনে নিচের অংশে সংরক্ষণ করে ওপরের অংশে নতুন মরদেহ দাফন করা হয়।

অগ্রিম সংরক্ষণ বন্ধ, তবু দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ

কবরের জায়গা নিয়ে অনিয়ম ও দীর্ঘমেয়াদি দখল ঠেকাতে ডিএসসিসির ২০২০ সালের নীতিমালায় জীবিত অবস্থায় অগ্রিম কবর সংরক্ষণের সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ, নিজের মৃত্যুর আগেই সরকারি কবরের জায়গা বুক করে রাখার সুযোগ নেই। একই নীতিমালায় কবরস্থানে মাজার নির্মাণ বা কোনো কবরকে মাজার হিসেবে চিহ্নিত করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। 

নীতিমালার আওতায় নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও বিশেষ ক্ষেত্রে মৃত্যুর পর সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রমাণসাপেক্ষে ১০ বছরের বিনা মূল্যের সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে।

আজিমপুর কবরস্থান/ছবি: বিপ্লব দিক্ষীৎআজিমপুর কবরস্থান/ছবি: বিপ্লব দিক্ষীৎ

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, অতীতে অগ্রিম কবর সংরক্ষণ কেন্দ্র করে নানা অভিযোগ ও অনিয়ম ছিল। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে সীমিত জমির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে একটি বৈপরীত্য। অগ্রিম কবর সংরক্ষণ বন্ধ থাকলেও নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও নিয়মের আওতায় মৃত্যুর পর একটি কবর ২৫ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাচ্ছে। অর্থাৎ, কবর আগে থেকে নিজের নামে রাখা যাবে না কিন্তু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে মৃত্যুর পর সেই কবর দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।

কবরের যত্নেও ‘মাসোহারা’!

কবর সংরক্ষণে অর্থের প্রভাব শুধু সরকারি ফি বা লিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়- কবরের পরিচর্যা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

আজিমপুরে এক নিকটাত্মীয়কে দাফন করতে এসে পুরান ঢাকার হাজারীবাগের বাসিন্দা শামীম আহমেদ বলেন, ‘কবরে বাবা-মাকে ভালো রাখতেও মাসোহারা লাগে!’

তার দাবি, পাশাপাশি থাকা কবরগুলোর একটিতে নিয়মিত পরিচর্যার চিহ্ন থাকলেও অন্যটি ভাঙাচোরা, কোথাও ইঁদুরের গর্ত বা মাটি ভেঙে পড়ার চিত্র দেখা যায়। কবর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও যত্নে রাখতে কবরস্থানের কর্মচারীদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘মাসোহারা’ দিতে হয়। 

তার মায়ের কবরের জন্য মাসে ৫শ টাকা দেন। কারও ক্ষেত্রে এ অর্থ পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত হয় বলেও দাবি তার।

বংশালের ব্যবসায়ী আব্দুর রহমানও কবর সংরক্ষণের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পুনঃদাফন নিয়ে একই ধরনের অভিযোগের কথা জানান। তার ভাষ্য, নিয়মিত ‘মাসোহারা’ দিলে কারও কারও কবর বছরের পর বছর অবিকৃত থাকে।

অনেকেই স্বজনকে কবর দিয়ে যাওয়ার পর দুই-চার মাসের মধ্যে আসেন না। রোদ, ঝড় ও বৃষ্টিসহ নানা কারণে অনেক সময় কবর দেবে যায়, কবরের আশপাশের মাটি সরে গর্ত হয় কিংবা আগাছা জন্ম নেয়। বিপরীত দিকে অনেকেই স্বজনের কবর নিয়মিত পরিদর্শন করেন। পরিচ্ছন্নকর্মীদের কিছু বখশিশ দিয়ে গাছ কিংবা দুর্বা লাগান। এর বাইরে প্রতি মাসে টাকা নেওয়ার কথা জানি না।-আজিমপুর কবরস্থানের মোহরার হাফিজুর রহমান

এ বিষয়ে আজিমপুর কবরস্থানের মোহরার হাফিজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘অনেকেই স্বজনকে কবর দিয়ে যাওয়ার পর দুই-চার মাসের মধ্যে আসেন না। রোদ, ঝড় ও বৃষ্টিসহ নানা কারণে অনেক সময় কবর দেবে যায়, কবরের আশপাশের মাটি সরে গর্ত হয় কিংবা আগাছা জন্ম নেয়। বিপরীত দিকে অনেকেই স্বজনের কবর নিয়মিত পরিদর্শন করেন। পরিচ্ছন্নকর্মীদের কিছু বখশিশ দিয়ে গাছ কিংবা দুর্বা লাগান। এর বাইরে প্রতি মাসে টাকা নেওয়ার কথা জানি না।’

কবরস্থানে ভালো জায়গা পেতেও লাগে টাকা!

মৃত্যুর পর কবরস্থানে দাফন-কাফনের ভালো-মন্দ জায়গাও বহুলাংশে মৃতের স্বজনদের আর্থিক সঙ্গতির ওপর নির্ভর করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সরকারিভাবে কাগজে-কলমে নির্দিষ্ট লাইন বা ব্লকে নিয়ম মেনে দাফনের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে বিষয়টি অনেকাংশে কবরস্থানের মোহরার, গোরখোদক এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের খেয়াল-খুশি ও গোপন চুক্তির ওপর নির্ভর করে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, এক্ষেত্রে মরদেহ দাফনের জন্য যারা কবরস্থানের অফিসকক্ষে এসে যোগাযোগ করেন তারা পছন্দের জায়গায় দাফনের জন্য অনুরোধ জানান।

অযত্নে থাকা একটি কবর/ছবি: বিপ্লব দিক্ষীৎঅযত্নে থাকা একটি কবর/ছবি: বিপ্লব দিক্ষীৎ

কবরস্থানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা প্রথমে সরকারি নিয়মের দোহাই দিলেও দাফনের পর ‘খুশি’ করা হবে, এমন প্রস্তাব দেওয়া হলে যোগাযোগকারীকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলা হয়। এ সময় কবরস্থানের অফিসকক্ষ থেকে গোরখোদকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পছন্দের জায়গায় দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।

এ প্রতিবেদক অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে আজিমপুর কবরস্থানসহ একাধিক কবরস্থান সরেজমিনে পরিদর্শনকালে একই দিনে দাফন করা একাধিক মরদেহের ক্ষেত্রে ভিন্নতা দেখতে পান। কোনো মরদেহ রাস্তার পাশে, আবার কোনোটি কবরস্থানের অনেকটা ভেতরে দাফন করতে দেখা যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আজিমপুর নতুন পল্টন এলাকার একজন আদি বাসিন্দা রহমত আলী (ছদ্মনাম) জাগো নিউজকে জানান, তিনি গত ২০ বছর ধরে আজিমপুর কবরস্থানে তার স্বজনদের মরদেহ দাফনের জন্য জায়গা নির্ধারণ করেন। কবরস্থানের কাছাকাছি বাসা ও কবরের গোরখোদকসহ অনেকের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচিতি থাকায়, কারও মৃত্যু হলে তিনি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

মরদেহ কবরস্থানে আনার আগেই তিনি মোহরারসহ অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পছন্দের জায়গায় দাফনের ব্যবস্থা করেন। দাফন শেষে সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত ১ হাজার টাকা থেকে দুই-তিন হাজার টাকা দিতে হয়।

আজিমপুর কবরস্থানের মোহরার হাফিজুর রহমানের কাছে অতিরিক্ত টাকা গ্রহণের মাধ্যমে পছন্দের জায়গায় দাফনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অনেকে পূর্বপরিচিত থাকায় বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের কবরের পাশে দাফনের অনুরোধ করেন। অনেক সময় জায়গা ফাঁকা থাকলে তারা মানবিক দিক বিবেচনা করে ব্যবস্থা করা হয়। এক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে কোনো ব্যবস্থা করা হয় না।

উচ্চ ফি কি জায়গা ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার?

সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীলদের বক্তব্য অনুযায়ী, সাধারণ দাফনের জায়গা সংকুচিত না করতে দীর্ঘমেয়াদি কবর সংরক্ষণকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। কারণ প্রিয়জনের কবর দীর্ঘদিন অক্ষত রাখতে চাইলে সীমিত কবরস্থানের জমির ওপর চাপ বাড়ে।

২০২৩ সালে সংরক্ষণ ফি বাড়ায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। তৎকালীন ডিএনসিসি মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেছিলেন, কবর সংরক্ষণকে নিরুৎসাহিত করতে ফি বাড়ানো হয়েছে।

ডিএনসিসির আওতাধীন কবরস্থানে প্রতিটি মরদেহ দাফন বাবদ রেজিস্ট্রেশন ফি মাত্র ৫০ টাকা। দুস্থ, অসহায় মৃত ব্যক্তির দাফনের ফি মাত্র ১০০ টাকা। কেউ যদি ১০০ টাকাও পরিশোধ করতে অপারগ হন, তার জন্য বিনামূল্যে দাফনের সুযোগ রয়েছে বলেও ওই সময় জানান আতিক। 

বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো কী করছে?

ঘনবসতিপূর্ণ বিশ্বের বিভিন্ন শহর কবরস্থানকে এখন নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। সিঙ্গাপুরে ভূমির তীব্র সংকটের কারণে নতুন কবরের মেয়াদ সীমিত রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। নির্দিষ্ট সময় পর ধর্মীয় বিধান অনুসরণ করে কবর পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়।

কুয়ালালামপুরে নতুন কবরস্থান নির্মাণের পাশাপাশি কবরের তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ইস্তাম্বুলেও কবরস্থান ব্যবস্থাপনা নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত হচ্ছে এবং কবরের তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।

এসব উদাহরণ দেখায়, কবরস্থানকে শুধু দাফনের জায়গা হিসেবে দেখলে সংকটের সমাধান হবে না। এটি জমি ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নাগরিক সেবারও অংশ।

ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি কী?

কবর সংরক্ষণ ও কবরের জায়গা কেনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ধারণা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ আবদুস সালামের সঙ্গে কথা বলেছে জাগো নিউজ।

জীবদ্দশায় কবরের জায়গা কিনে রাখা বা সংরক্ষণ করা হারাম নয়। মৃত্যুর পর দাফনের জায়গা নিশ্চিত করা কিংবা পরিবারের সদস্যদের কবর জিয়ারতের সুবিধার মতো প্রয়োজন থাকলে এর সুযোগ থাকতে পারে।-ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ আবদুস সালাম

তিনি বলেন, ‘জীবদ্দশায় কবরের জায়গা কিনে রাখা বা সংরক্ষণ করা হারাম নয়। মৃত্যুর পর দাফনের জায়গা নিশ্চিত করা কিংবা পরিবারের সদস্যদের কবর জিয়ারতের সুবিধার মতো প্রয়োজন থাকলে এর সুযোগ থাকতে পারে।’

তবে তার মতে, ‘বিপুল অর্থ ব্যয় করে কবর কেনার উদ্দেশ্য যদি সামাজিক মর্যাদা, আভিজাত্য বা সম্পদ প্রদর্শন হয়, তাহলে তা ইসলামের মূল চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’

তিনি বলেন, ‘ইসলামে কবর মৃত ব্যক্তির সম্মানের স্থান। এটি সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের প্রতীক হওয়ার কথা নয়। জীবদ্দশার সম্পদ বা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে মৃত্যুর পর মর্যাদা নির্ধারিত হয় না। তাই কবর ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন, ন্যায়সংগত সুযোগ ও মৃত ব্যক্তির মর্যাদা- তিনটি বিষয়ই বিবেচনায় রাখা উচিত।’