স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, দেশটাকে টেকাতে হলে আমাদের দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে, নেশাকে বন্ধ করতে হবে। আমাদের বাচ্চাদের বাঁচাতে হলে নেশাকে আর জুয়াকে না বলতে হবে। দেশটাকে বাঁচাতে হলে চিকিৎসার মান উন্নয়ন করতে হবে। আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আমাদের তদারকি করতে হবে।
তিনি বলেন, তদারকি ঘরে বসে হয় না, আপনার জনগণের কাছে যেতে হবে। সিভিল সার্জন চেয়ারে বসে থাকার জন্য না, ওসি সাহেব চেয়ারে বসে থাকার জন্য না, ডিসি মহোদয় শুধু বসে থাকার জন্য না। কয়টি সাইন ফাইল করেন? এটার জন্য বসে থাকা যাবে না। আমাদের পাগলের মত সমাজে নামতে হবে। ঘুরেফিরে একটি কথাতেই যাই, যে যে দলেরই হন যে মতেরই হন আমরা ব্যর্থ হলে এটার জন্য আমাদের চরম মূল্য দিতে হবে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুর ১২টায় মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আইন-শৃঙ্খলা, উন্নয়নমূলক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, অনেক রক্তের বিনিময়ে একাত্তরে দেশ স্বাধীন হয়েছে। ২৪ শে আমাদের গণতন্ত্র উদ্ধার হয়েছে। যারা আত্মত্যাগ করেছেন তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি এবং শ্রদ্ধা জানাই। তাদের রক্তকে এবার যদি আমরা বৃথা যেতে দেই, যদি তাদের রক্তকে আমরা ঈমানের সাথে স্বীকৃতি না দেই, যে কারণে রক্তগুলো ঝরেছে তাকে যদি আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যর্থ হই আমরা সবাই ব্যর্থ হয়ে যাবো। এরপর আমরা এভাবে বসতে পারবো কিনা সেটা প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ ফ্যাসিবাদের শত্রুরা, দোসররা এখনো যারা আমাদের ডোমিনেট করতে চায়, যারা আমাদের প্রভু হতে চায় তারা আমাদের পেছনে লেগে আছে।
মন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে বলেন, কোন মাদক সেবনকারী যদি কারো ঘরে বসে খায় সেই ঘরের মালিক, যদি কারো বাড়ির পাশে টঙে বসে খায় তাহলে এক দিক থেকে সবাইকে গ্রেপ্তার করতে হবে। গ্রেপ্তার করবেন তারা জামিন নেবে আবারো গ্রেপ্তার করবেন। আমাদের দেশে চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণকারী যারা করে এই সমস্ত কিছু হয় নেশার জন্য। এদেরকে একদিক থেকে গ্রেপ্তার করতে হবে।
পুলিশদের উদ্দেশ্য করে মন্ত্রী বলেন, ধর্ষণের ব্যাপারে আপনাদের সজাগ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হবে। মেয়েরা আমাদের মেয়ে আমাদের মা। তাদের প্রতি এই সম্মান রেখে এ ধরনের কাজ হলে একজন নয় শুধু জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তারের আওতায় আনতে হবে এবং আপনারা পেরেছেন। রামিসা হত্যায় আমাদের সরকার ৭ দিনের মধ্যে তার চূড়ান্ত বিচার করতে সক্ষম হয়েছে। এটা আমাদের গ্রেট সাকসেস। অতএব আমাদের পুলিশ পারে এবং এটাও পারবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কে তিনি বলেন, যে মন্ত্রণালয় দায়িত্ব আমার সে মন্ত্রণালয় গত ১৭ বছর জনগণের স্বাস্থ্য সেবার জন্য ফ্যাসিস্টরা কোন কাজ করে নাই। ঔষধ মানুষকে দেয় নাই, নতুন কোন নিয়োগ দেয়নি। দেশে ১৮ কোটি মানুষ, প্রতি ১১ হাজার মানুষের জন্য একজন ডাক্তার। ডাক্তার নাই, নার্স নাই দুর্নীতিতে ভরপুর। ফরিদপুর এবং বরিশালে দুটি এমআরআই মেশিন পড়ে আছে। মানুষের ট্রিটমেন্ট দেওয়ার জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটি মেশিন তবে পড়ে আছে। ১৮ কোটি টাকা করে কিনেছে এই মেশিন। সাত কোটি টাকা করে চুরি করা হয়েছে মেশিনগুলো থেকে। মেশিনগুলো যেভাবে কিনেছে ঠিক সেভাবেই প্যাকেটিং অবস্থায় পড়ে আছে। এরকম অনেক মেশিনের জন্য জনবল নেই, টেকনিশিয়ান নেই তবুও কিনে ফেলে রেখেছে। কয়েক হাজার কোটি টাকার শুধু ইকুইপমেন্ট কিনেছে এবং চুরি করেছে কয়েক লক্ষ টাকার যন্ত্রপাতি। এখন সেগুলো অকেজ হয়ে গিয়েছে এখন ভাঙ্গারিদের কাছে বিক্রি করা ছাড়া কোন উপায় নেই। একটা হাসপাতালেও সিট বৃদ্ধি করেনি, কোন হাসপাতালে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেনি। এরকম একটা স্বাস্থ্যসেবার ভিতরে আমি পড়েছি। ইতিমধ্যে আপনাদের সহযোগিতায় ছয় মাসে জেলা, উপজেলা পর্যায়ে ডাক্তারদের অ্যাটেনডেন্স বৃদ্ধি করতে সার্থক হয়েছি শতভাগ। এখন যত জায়গায় যাই ডাক্তার পাই, নার্স পাই। রোগীদের সাথে আলাপ করে তারা বলছে আপনারা দায়িত্ব নেবার পর এখন সেবার মান বৃদ্ধি হয়েছে।
স্বাস্থ্য সেবার মান বৃদ্ধি করতে মন্ত্রী বলেন, এখন আমরা তিন বছরের ভেতরে পর্যায়ক্রমে প্রত্যেকটা উপজেলায় ১৫১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল করবো। কোনটা ভার্টিক্যালি হবে আবার কোনটাই জায়গা থাকলে নতুন ভবন। এখানে ২০টি সিট থাকবে মহিলাদের জন্য, ২০টি সিট থাকবে বাচ্চাদের জন্য, ১০টি সিট থাকবে ডায়ালাইসিস এর জন্য। আমাদের প্ল্যান চলতি বছর যেমন আপনাদের মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০টি ডায়ালাইসিস মেশিন দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে এটা নিয়ে কাজ চলছে। আগামী দুই বছর পর ১০টা করে বেড পাবে প্রত্যেকটা উপজেলায় ডায়ালাইসিসের জন্য।
এ ব্যাপারে তিনি আরও বলেন, আমরা প্রত্যেকটা ইউনিয়নে পর্যায়ক্রমে এবার কাজ ধরবো। ৩ বছরের মধ্যে একটা করে হেল্প সেন্টার হবে। এমবিবিএস ডাক্তার থাকবে, নার্স থাকবে, মিডওয়াইফ থাকবে, মেশিন থাকবে এবং ডাক্তার প্রেসক্রাইব করবে। ডাক্তারের ডরমেটরি থাকবে এবং ওখানেই থাকতে হবে। স্বাস্থ্য সেবাকে আমরা নতুনভাবে সাজাতে যাচ্ছি কারণ একটি সুস্থ সবল জনগোষ্ঠী ব্যতীত একটি উৎপাদনশীল ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশ কখনোই গড়া যায় না। আমরা চাই না দেশের মানুষ বিদেশে গিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে আসুক। আমরা আমাদের দেশে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চয়তা প্রদান করতে সক্ষম হবো।
মন্ত্রী দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলেন, দুর্নীতি গত ১৭ বছরে কঠিনভাবে বাসা বেধেছে। বিগত সময়ে নির্বাচন আসলে ইউএনও সাহেব পাইতেন ১ কোটি, মিনিমাম ৫০ লাখ থানার পরিধিবেধে, ওসি সাহেব পাইতেন ১ কোটি, ডিসি সাহেব পাইতেন। প্রায় সব মহা অরণ্য ছিল ঘুষের দুর্নীতি। তবে এবার একটা ইলেকশন হয়েছে ১০ টাকা কেউ পেয়েছেন? আমি কিন্তু কাউকে দেইনি আর কেউ চায়ও নাই। কাজ করেছে আগের থেকে বেশি, কি কাজ? ন্যায় কাজ। জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে। দুর্নীতি সমাজের প্রত্যেকটি রণ্ড থেকে আমাদের নির্মূল করতে হবে। কারণ আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত। আর সেই ভোটের সুযোগ আপনারা সকলেই করে দিয়েছেন। কাজ করতে হবে আমাদের স্বচ্ছতার সাথে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে জনসেবায়। যেভাবেই হোক আমাদের দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে আমরা দুর্নীতি নির্মূল করতে পারছি। আমরা নেশা-মাদক সকল কিছু বন্ধ করতে পেরেছি। আমরা ধর্ষণ বন্ধ করতে পেরেছি। আমরা জনকল্যাণমূলক কাজ করতে পেরেছি।
এছাড়াও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মাদক, জুয়া, স্বাস্থ্য খাত ও অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে কর্মকর্তাদের বিশেষ ভূমিকা পালনের নানা নির্দেশনা দেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন, মানিকগঞ্জ ৩ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ও খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, মানিকগঞ্জ ১ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) এস এ জিন্নাহ কবির, মানিকগঞ্জ ২ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ইঞ্জিনিয়ার মইনুল ইসলাম খান শান্ত এবং মানিকগঞ্জ জেলায় কর্মরত প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্মকর্তা বৃন্দ।