বরিশাল অঞ্চলে দিনে ১০ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। থমকে গেছে কর্মজীবন। বিশেষ করে জেলেরা চরম বিপাকে পড়েছেন। টানা বিদ্যুৎ না থাকায় বরফ জমছে না। সাগরে মাছ ধরতেও যেতে পারছেন না তাঁরা।
কাগজে-কলমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হাব দক্ষিণাঞ্চল। অথচ খোদ বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যেই অঞ্চলটিতে দিনে ৮-১০ বার লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ একবার গেলে এক থেকে দেড় ঘণ্টাতেও আসে না। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে উপকূলের অর্থনীতিতে।
পাথরঘাটা, মহিপুর, আলীপুরসহ দক্ষিণ উপকূলের মৎস্যকেন্দ্রের অর্থনীতি বরফকলের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে পাথরঘাটা ও কলাপাড়ায় অর্ধশতাধিক বরফকল রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে বরফ উৎপাদনে টানা ১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু ভেঙে ভেঙে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন বরফ কলের মালিকেরা। এতে উৎপাদন থমকে গেছে।
সাগরে মাছ ধরার ট্রলার টানা কয়েকদিন অবস্থান করে। মাছ সংরক্ষণের জন্য ট্রলারে বিপুল পরিমাণ বরফ নিতে হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় এখন দ্বিগুণ দামেও বরফ পাচ্ছেন না জেলেরা। এভাবে চলতে থাকলে পথে বসতে হবে বলে জানিয়েছেন জেলেরা।
বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে বিদ্যুৎকেন্দ্র ৯টি। এগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ৩ হাজার ৪৭০ মেগাওয়াট। বরিশাল জাতীয় গ্রিড উপকেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, বিভাগের ছয় জেলায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ৫৫০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট। কিন্তু বর্তমানে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ৩০০-৩৫০ মেগাওয়াট। দিনে গড়ে ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ ঘাটতি থাকছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) গত ২৫ আগস্টের তথ্যে দেখা যায়, পিক আওয়ারের উৎপাদন ২ হাজার ১০৪ মেগাওয়াট, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬১৪ মেগাওয়াট কম। সন্ধ্যায় বিদ্যুতের চাহিদা সাধারণ সর্বোচ্চ থাকে। ওইদিন সন্ধ্যায় ২ হাজার ৮১৭ মেগাওয়াট লক্ষ্যের বিপরীতে কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ২ হাজার ২৫৬। ৫৬১ মেগাওয়াট ঘাটতি লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে পূরণ করতে হয়েছে।
পিডিবির তথ্যে, বরিশাল অঞ্চলের কেন্দ্রগুলোর ডিরেটেড সক্ষমতা ৩ হাজার ৩১২ মেগাওয়াট। এর মানে স্থাপিত সক্ষমতার ১৫৮ মেগাওয়াট কার্যত উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। ফলে এই ঘাটতিও লোডশেডিং বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থাপিত ও কার্যকর সক্ষমতার পার্থক্য হলো ডিরেটেড। কেন্দ্র পরিচালনার জন্য অনেক সময় সর্বোচ্চ সক্ষমতার চেয়ে কিছুটা কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হয়। এটি ইচ্ছে করে, আবার কখনো যন্ত্রপাতির অবস্থা ও পরিবেশগত কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়।
তিন কেন্দ্রে ঘাটতি ৪৮০ মেগাওয়াট
পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিটের স্থাপিত সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। গত ২৫ আগস্ট লক্ষ্যমাত্রা ৮১০ মেগাওয়াট থাকলেও, বাস্তবে উৎপাদন হয়েছে ৫৭০। ২৪০ মেগাওয়াটের ঘাটতিতে লোডশেডিং হচ্ছে।
একইভাবে পটুয়াখালীর আরেক বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার ইউনাইটেড পায়রা পাওয়ার লিমিটেড (ইউপিপিএল)। এখানে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩৩ মেগাওয়াট কম উৎপাদন হয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলের কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি বিভাগের ছয় জেলার গ্রাহকেরা পান না। উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রথমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। এরপর জাতীয় চাহিদা ও গ্রিডের পরিস্থিতি অনুযায়ী তা বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।আখতারুজ্জামান পলাশ, বরিশাল বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী
অন্যটি বরগুনার তালতলীতে ৩০৭ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিইপিসিএল)। ২৫ আগস্ট লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০৭ মেগাওয়াট কম উৎপাদন হয়েছে। তিন কেন্দ্র মিলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হয়েছে। চিত্রটি ওইদিনের মোট ঘাটতির প্রায় ৭৮ শতাংশ।
বরিশাল অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারার জন্য পিডিবি বিভিন্ন সময় জ্বালানি সরবরাহ সংকট সামনে এনেছে। যদিও গত ২৫ আগস্ট কেন এত পরিমাণ ঘাটতি, তা কর্মকর্তারা জানাতে পারেননি।
বরিশাল বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আখতারুজ্জামান পলাশ বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি বিভাগের ছয় জেলার গ্রাহকেরা পান না। উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রথমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। এরপর জাতীয় চাহিদা ও গ্রিডের পরিস্থিতি অনুযায়ী তা বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। ফলে বরিশাল অঞ্চলের ঘাটতি কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয় হচ্ছে।