Image description

একসময় বিশেষ আয়োজন, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা উৎসব-পার্বণে বাঙালির ঘরে সুগন্ধি চালের পোলাও-বিরিয়ানি ছিল ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু রাজশাহীর বাজারে সেই সুগন্ধি চাল এখন অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে গেছে। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে কোনও কোনও ধরনের সুগন্ধি চালের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি চিনিগুঁড়া (পোলাও) চাল মানভেদে ২২০ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, বিদেশে রফতানি, ধানের সরবরাহ সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দাম বেড়েছে। তবে সাধারণ ক্রেতাদের প্রশ্ন—এত দ্রুত কেন বাড়ছে চালের দাম? ছয় মাস আগেও দাম নাগালে ছিল। 

রাজশাহীর পাইকারি বাজারে বর্তমানে সুগন্ধি চাল ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে দাম ২১০ টাকা কেজি। তিন মাস আগেও খোলা চিনিগুঁড়া চাল ১১৫ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এখন তা ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া চালের দাম ১৩৫-১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ২৩০ টাকা হয়ে গেছে। ব্র্যান্ড ও মানভেদে দাম আরও বেশি রয়েছে কিছু চালের। দেশি কালিজিরা চাল ১২০-১২৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা এবং দিনাজপুরের সুগন্ধি কাটারিভোগ চাল কেজিতে প্রায় ১৫ টাকা বেড়ে ৯৫ থেকে ১০৫ টাকা হয়েছে। গত তিন মাসে এই দাম দাঁড়িয়েছে। 

কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, জীবনে সুগন্ধি চালের দাম এতটা বাড়তে তারা দেখেননি। উৎপাদন মৌসুমে কৃষকের কাছ থেকে যে দামে ধান কেনা হয়েছিল, বর্তমানে সেই ধানের চালের দাম প্রায় দ্বিগুণ। তবে কৃষকদের ঘরে এখন আর আগের মৌসুমের ধান নেই।

রফতানিতে কি বাড়ছে দাম?

ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশের দাবি, বিদেশে সুগন্ধি চাল রফতানির কারণে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বেড়েছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিনটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি মোট ১ হাজার ৫৩০ মেট্রিক টন চাল রফতানি করেছে। প্রধানত ব্রি-৩৪ (চিনিগুঁড়া) ধান থেকে সুগন্ধি চাল তৈরি হয়।

রাজশাহীর সাহেববাজারের এপি চাউল ভান্ডার-১-এর মালিক অশোক প্রসাদ বলেন, ‘গত কোরবানির ঈদের পর থেকেই সুগন্ধি চালের দাম বাড়তে শুরু করে। কেজিতে প্রায় ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এসব চাল বিদেশে রফতানি হওয়ার কারণেই এই মূল্যবৃদ্ধি। রফতানি বন্ধ হলে দাম আবার কমে আসবে।’

কাদিরগঞ্জ এলাকার পাইকারি চাল ব্যবসায়ী জসীম উদ্দিন বলেন, ‘রফতানির অনুমতি দেওয়ার কারণে বাজারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ছয় মাস আগে যে চাল ১০০ টাকা কেজি ছিল, এখন তা ২০০ টাকা।’

জসীম উদ্দিন জানান, বর্তমানে তিনি সুগন্ধি চাল মজুত করছেন না। দুই সপ্তাহ আগে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা তার দোকানে গিয়ে দাম নিয়ে প্রশ্ন করেন। ২০০ টাকা কেজি দরে পোলাওয়ের চাল বিক্রির অভিযোগে তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়।

তার ভাষ্য, কোম্পানির গুদাম থেকেই তারা ২০০ টাকা কেজি দরে চাল কিনছেন। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয় যুক্ত হচ্ছে। কেনা দামের ওপর ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমিশন রাখতে হয়। ফলে ২০০ টাকার নিচে বিক্রি করা সম্ভব নয়। বস্তার গায়ে কোম্পানির নম্বরও রয়েছে; প্রয়োজনে ফোন করে কেনা দাম যাচাই করা যাবে। তার দাবি, রফতানি বন্ধ হলে কেজিতে অন্তত ৫০ টাকা দাম কমতে পারে।

দিনাজপুরের চালের আড়তদার আতিয়ার রহমান বলেন, ‘ধান ওঠার সময় ৭৫ কেজির এক বস্তা চার হাজার টাকায় বেচাকেনা হয়েছিল। পরে তা ৬ হাজার টাকায় ওঠে। এখন সেই ধানের দাম সাড়ে আট হাজার টাকা।’ কেন দাম এত বেড়েছে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এলাকায় ধানের ঘাটতির কারণেই দাম বেশি। বিদেশে রফতানির বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেডা কবার পারবো না ভাই। হতেও পারে।’

উৎপাদন ও সরবরাহেও সংকট

তবে শুধু রফতানিই নয়, সুগন্ধি চালের দাম বাড়ার পেছনে আরও কয়েকটি কারণ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। গত মৌসুমে তীব্র তাপপ্রবাহ ও অনাবৃষ্টির কারণে উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় সুগন্ধি ধানের কাঙ্ক্ষিত ফলন হয়নি। এর প্রভাব পড়েছে বর্তমান বাজারে।

এ ছাড়া বড় বড় চাল প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান মৌসুমের শুরুতেই তুলনামূলক বেশি দামে ধান কিনে মজুত করায় স্থানীয় ছোট মিল ও খোলা বাজারে ধানের সরবরাহ কমেছে। সুগন্ধি চাল উৎপাদনে বিশেষ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পলিশিংয়ের প্রয়োজন হয়। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ বিল, মিলিং খরচ ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে।

কমছে কেনাকাটা

দাম বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। আগে মাসে একবার কিংবা বিশেষ কোনও দিনে সুগন্ধি চাল কিনলেও এখন অনেকে পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ আবার সাধারণ চালেই ফিরছেন। সাহেববাজারে চাল কিনতে আসা চাকরিজীবী মোহাম্মদ আজাদ বলেন, ‘সুগন্ধি চাল প্রতিদিনের খাবার নয়। তারপরও দাম এমন বেড়েছে যে পারিবারিক কোনও অনুষ্ঠানেও বেশি পরিমাণে কিনতে ভয় লাগে। প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া চালের দাম এখন ২৩০ টাকা। এত দাম জীবনেও দেখি নাই।’

রাজশাহীর একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত জাহাঙ্গীর আলম খানের সঙ্গে নগরের সাহেববাজার এলাকায় পোলাওয়ের চালের দাম নিয়ে কথা হয়। তিনি জানান, পাঁচ মাস পর পোলাওয়ের চাল কিনতে গিয়ে রীতিমতো হতভম্ব হয়ে গেছেন। আগেরবার তিনি ১৪০ টাকা কেজিতে এই চাল কিনেছিলেন। এবার কিনতে হয়েছে ২৩০ টাকা কেজি। আগের দামের কথা বলতেই দোকানি তাকে বলেছেন, ‘সেই দিন আর নাই।’

একই বাজারে আসা গৃহিণী সেলিনা পারভীন বলেন, ‘মেয়ের জন্মদিন। ঘরে আত্মীয়স্বজন আসবে, পোলাও রান্না করতেই হবে। কিন্তু বাজারে এসে দেখি খোলা চিনিগুঁড়া চালের দামও ১৫০ টাকা। তাও আবার নিম্নমানের। আগে যে টাকায় চার কেজি চাল কিনতাম, এখন সেই টাকায় তিন কেজিও পাওয়া যাচ্ছে না।’

দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে রেস্তোরাঁ ব্যবসাতেও। কুমারপাড়া এলাকার একটি রেস্তোরাঁর মালিক মো. গোলাপ সরদার জানান, ছয় মাস আগে প্রতি কেজি পোলাওয়ের চাল ১৩০ টাকা দরে কিনেছেন। এখন সেই চাল কিনতে হচ্ছে ২০০ টাকা কেজি দরে। কিন্তু সে অনুযায়ী পোলাওয়ের দাম বাড়াতে পারেননি।

চাল ব্যবসায়ী রাজিব হোসেন বলেন, দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন ব্যবসায়ীরাই। কারণ বিক্রি কমে যায়। আগে ক্রেতারা একবারে ৫ থেকে ১০ কেজি সুগন্ধি চাল কিনলেও এখন অনেকেই মাত্র ১ থেকে ২ কেজি কিনছেন।

দাম বাড়লেও সুফল পাচ্ছেন না কৃষক

দাম বাড়লেও এর সুফল এখনই কৃষকের ঘরে পৌঁছাচ্ছে না। গোদাগাড়ী উপজেলার কেশবপুর এলাকার কৃষক আসফাকুজ্জামান বাবু জানান, তিনি দুই বিঘা জমিতে সুগন্ধি ধান চাষ করেছিলেন। ছয় মাস আগে ধান বিক্রি করে দিয়েছেন। এখন ধান থাকলে বেশি দাম পাওয়া যেতো। ভবিষ্যতেও এভাবে চালের দাম থাকলে তিনি সুগন্ধি ধানের চাষ বাড়ানোর কথা ভাবছেন।

বাজারে নজরদারি জরুরি

সুগন্ধি চালের বর্তমান মূল্যবৃদ্ধিতে রফতানি, সরবরাহ সংকট, উৎপাদন ব্যয় ও মজুত—কোন কারণ কতটা ভূমিকা রাখছে, তা নিয়ে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে। তবে ছয় মাসের ব্যবধানে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় বাজারে নজরদারি বাড়ানোর দাবি উঠেছে।

ব্যবসায়ীদের একাংশ রফতানিকে দায়ী করলেও উৎপাদন কমে যাওয়া, বড় মিলগুলোর আগাম ধান কেনা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিও যে বাজারে প্রভাব ফেলছে, তা সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে সুগন্ধি চালের দাম রাখতে বাজারের সরবরাহব্যবস্থা ও মূল্য নির্ধারণের পুরো প্রক্রিয়ায় নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, দেশের বেশির ভাগ ব্রি-৩৪ (চিনিগুঁড়া) ধান উৎপাদিত হয় দিনাজপুরে। এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়েও কিছু উৎপাদন হয়ে থাকে। দিনাজপুরে এবার ২ লাখ ৬০ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে চিনিগুঁড়া ধানের আবাদ হয়েছে ৯৫ হাজার হেক্টর জমিতে। গত বছর এ ধানের আবাদ হয়েছিল ৯৪ হাজার হেক্টর জমিতে।

দিনাজপুর জেলা ডিএইর উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, চিনিগুঁড়া ধান থেকে তৈরি সুগন্ধি চাল মোড়কজাত করে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, ইস্পাহানি অ্যাগ্রো ও প্রাণ অ্যাগ্রোসহ কয়েকটি বড় কোম্পানি। দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার জহুরা অটো রাইস মিল স্থানীয়ভাবে সুগন্ধি চাল প্রক্রিয়াজাত ও বিপণন করে। এ ধানকে কেন্দ্র করে জেলায় ছোট-বড় প্রায় ২০০ অটো রাইস মিল গড়ে উঠেছে। তবে বর্তমানে যে দামে ধান বিক্রি হচ্ছে, সেই দাম কৃষকরা পাননি। চালের দামও অনেক বেশি।