‘সি-উইড’ বা সামুদ্রিক শৈবাল বেড়ে ওঠে সমুদ্রের পানিতে। উপকূলীয় মানুষের কাছে যা অবহেলিত হিসেবে বিবেচিত। তবে সামুদ্রিক শৈবাল প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্য, ফুড সাপ্লিমেন্ট (খাবারের পরিপূরক) ও প্রসাধনীসহ তৈরি করা সম্ভব বিভিন্ন মূল্য সংযোজিত পণ্য। গবেষক ও উদ্যোক্তাদের কাছে এটি সম্ভাবনাময় সমুদ্রসম্পদ। এই সমুদ্রসম্পদকে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করলে ব্লু ইকোনোমিতে (সুনীল অর্থনীতি) যোগ হতে পারে নতুন মাত্রা।
সামুদ্রিক শৈবালের চাষ, ব্যবহার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে গবেষণা করছেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের ফিসারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। শৈবাল থেকে বিভিন্ন খাদ্য ও প্রসাধনী তৈরিতে তারা সাফল্য পেয়েছেন। তৈরি করা এসব পণ্য নিয়ে চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ব্যবহারিক কার্যক্রম।
গবেষকদলের ভাষ্য, শৈবালের চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে উপকূলীয় অঞ্চলে তৈরি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তার সুযোগ। একই সঙ্গে এই সমুদ্রসম্পদকে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা গেলে সুনীল অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা সম্ভব।
পবিপ্রবির ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন অনুষদের খাদ্য মাইক্রোবায়োলজি ও নিরাপত্তা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শহীদুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, সামুদ্রিক শৈবালে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এটি সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে নিরাপদ খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা গেলে খাদ্যপণ্যের বৈচিত্রের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যবহারও বাড়ানো সম্ভব।
যেসব পণ্যে সম্ভাবনা
পবিপ্রবিতে চাষ থেকে শুরু করে শৈবাল সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং তা দিয়ে মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরির বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা চলছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামুদ্রিক শৈবালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পুষ্টিগুণ। এতে ফাইবার, প্রোটিন, ভিটামিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ওমেগা-থ্রি এবং বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে। এসব উপাদান খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে পুষ্টি চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে।
ত্বক ও চুলের যত্নেও সামুদ্রিক শৈবালের বিভিন্ন উপাদান ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার বিভিন্ন পণ্যে কাঁচামাল হিসেবে বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক শৈবালের ব্যবহার বাড়ছে।

জাপানের জনপ্রিয় খাবার সুশির অন্যতম প্রধান উপকরণ ‘নরি শিট’ সামুদ্রিক শৈবাল থেকে তৈরি হয়। বিভিন্ন ধরনের ফুড সাপ্লিমেন্ট ও ট্যাবলেট তৈরিতে শৈবালের ব্যবহার রয়েছে। সামুদ্রিক শৈবাল প্রক্রিয়াজাত করে আইসক্রিম, মিষ্টি, জিলাপি, বিস্কুট, সসেজ, জেলিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করা সম্ভব।
প্রসাধনী তৈরিতেও সামুদ্রিক শৈবালের ব্যবহার রয়েছে। সাবান, উপটানসহ বিভিন্ন প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যে এটি কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়। খাদ্য ও প্রসাধন—দুই খাতেই সামুদ্রিক শৈবাল ব্যবহারে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
লুথ্যারন হেলথ কেয়ারের মেডিকেল অফিসার ডা. মোস্তারিয়া জান্নাত এশিয়া পোস্টকে বলেন, সামুদ্রিক শৈবালে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান মানবদেহের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিক সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করা জরুরি।

উপকূলীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ
দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল ও সমুদ্রসম্পদকে ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় সুযোগ রয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সামুদ্রিক শৈবাল চাষকে নতুন কর্মসংস্থানমুখী খাত হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, উপকূলের অনেক মানুষ মাছ ধরা ও কৃষির ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে এসব পেশায় ঝুঁকি রয়েছে। এমন বাস্তবতায় সামুদ্রিক শৈবাল চাষ হতে পারে বিকল্প আয়ের একটি ক্ষেত্র।
অল্প পরিসরে শুরু করে পর্যায়ক্রমে চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে উপকূলীয় মানুষের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। শৈবাল সংগ্রহ, শুকানো, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাত, প্যাকেটজাত ও বাজারজাতকরণ ঘিরেও তৈরি হতে পারে কর্মসংস্থান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ কমাতে বিকল্প ও টেকসই সামুদ্রিক সম্পদের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সেই বিবেচনায় সামুদ্রিক শৈবাল ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পবিপ্রবির ফিসারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রাজীব সরকার এশিয়া পোস্টকে বলেন, সামুদ্রিক শৈবাল শুধু খাদ্য হিসেবেই নয়, বিভিন্ন শিল্প ও প্রসাধনসামগ্রীর কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব। এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে চাষ সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
সংশ্লিষ্টদের মতে, গবেষণা ও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সাফল্য এলেও সামুদ্রিক শৈবাল দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বড় পরিসরে বাণিজ্যিক খাত হিসেবে গড়ে ওঠেনি। শৈবাল উৎপাদন করলেই হবে না; এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজন। শৈবাল থেকে বিভিন্ন খাদ্য ও প্রসাধনসামগ্রী তৈরি করে বাজারজাত করা গেলে এর অর্থনৈতিক মূল্য অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণা সামুদ্রিক শৈবালের সম্ভাবনাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে গবেষণাগার ও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে এই প্রযুক্তি ও জ্ঞান মাঠপর্যায়ের চাষিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
চাষিদের প্রশিক্ষণ, উন্নত চাষপদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা, মানসম্মত শৈবাল উৎপাদন, সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে উৎপাদিত শৈবালের বাজার নিশ্চিত করা গেলে উদ্যোক্তারা এ খাতে বিনিয়োগে আরও আগ্রহী হবেন।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, বাজার তৈরি না হলে উৎপাদন বাড়িয়ে লাভবান হওয়া কঠিন। তাই সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক, উদ্যোক্তা ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এতে একদিকে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে বাড়বে কর্মসংস্থানের সুযোগ।

সমুদ্রের পানিতে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা একটি সম্পদকে কেন্দ্র করে খাদ্য, পুষ্টি, প্রসাধন ও কর্মসংস্থানের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা উপকূলীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রয়োজন যথাযথ পরিকল্পনা, গবেষণা ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ।
সামুদ্রিক শৈবালের চাষ সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা, উদ্যোক্তা তৈরি এবং বাজারজাতকরণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে এর সুফল পেতে পারে উপকূলের মানুষ। সঠিক পরিকল্পনা ও বাণিজ্যিক উদ্যোগে সেটি হতে পারে উপকূলের মানুষের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন গবেষণাগার থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ।
পবিপ্রবির মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের ফিসারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল আলম এশিয়া পোস্টকে বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক শৈবাল চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে এটি উপকূলের মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হতে পারে। তবে এজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন।