হাওরের মানুষের সারাবছরের যোগাযোগের একমাত্র ভরসা ‘অলওয়েদার’ সড়ক। বর্ষা কিংবা শুষ্ক মৌসুম-বছরের সব সময়ই এই সড়ক দিয়েই উপজেলা ও জেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন হাওরবাসী। সেই সড়কই এখন মেঘনার ভয়াল ভাঙনের কবলে পড়ে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
প্রায় ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সাত কিলোমিটার সড়কের অন্তত ৫০০ মিটার অংশ ভেঙে মেঘনা নদীতে চলে গেছে। এতে বন্ধ হয়ে গেছে যান চলাচল। সড়ক বিচ্ছিন্ন হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কয়েকটি গ্রামের মানুষ। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন অসুস্থ রোগী, নারী ও শিশুদের স্বজনরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন শুরু হওয়ার পর গত তিন মাস ধরে পরিস্থিতি ভয়াবহ হলেও সড়কটি রক্ষায় দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শুরুতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে কিছু জিওব্যাগ ফেলা হলেও তীব্র নদীভাঙনের সামনে তা কোনো কাজে আসেনি। এখন নদী ভাঙতে ভাঙতে সড়কের পাশাপাশি ফসলি জমি ও বসতবাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হুমকির মুখে রয়েছে একটি গ্রামও।
সরেজমিনে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার বাঙালপাড়া থেকে নোয়াগাঁও পর্যন্ত সাত কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি নির্মাণ করা হয় প্রায় সাত বছর আগে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বাস্তবায়িত এই সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয় প্রায় ৪৪ কোটি টাকা। বর্তমানে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটির সংস্কার কাজ চলছিল। এর মধ্যেই মেঘনার ভাঙনে সড়কের একটি বড় অংশ ধসে নদীতে বিলীন হতে শুরু করে। ভাঙনের তীব্রতায় প্রায় ৫০০ মিটার সড়ক এখন নদীগর্ভে। ফলে যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বিকল্প পথ না থাকায় সাধারণ মানুষকে পড়তে হয়েছে চরম দুর্ভোগে। হেঁটে চলাচলেরও সুযোগ নেই।
জরুরি প্রয়োজনে উপজেলা কিংবা জেলা শহরে যেতে হলে বাড়তি সময়, অর্থ ও ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। ভাঙন ঠেকাতে প্রথম দিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ৮ হাজার ১০৪টি জিওব্যাগ ফেলা হয়। এতে ব্যয় হয় প্রায় ৩০ লাখ টাকা। কিন্তু মেঘনার তীব্র স্রোত ও ভাঙনের কাছে এই উদ্যোগ স্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।
এই সড়কের শেষ প্রান্তেই মেঘনা নদীর ওপর নির্মাণাধীন রয়েছে এক হাজার মিটার দীর্ঘ একটি সেতু। প্রায় ১৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সেতুটির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য এই সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সেতুর সংযোগ সড়কই এখন মেঘনার ভাঙনের মুখে পড়েছে। ফলে হাওরবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্নের সেতু প্রকল্পটিও ভবিষ্যতে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক বছর ধরেই মেঘনার গতিপথ পরিবর্তনের কারণে এই এলাকায় নদীভাঙন বাড়ছিল। কিন্তু শুরুতে ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ধীরে ধীরে নদী ফসলি জমি গ্রাস করতে করতে এখন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের কাছাকাছি চলে আসে। শেষ পর্যন্ত সড়কের বড় একটি অংশ নদীগর্ভে চলে গেলেও স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জিওব্যাগ ফেলার পর কার্যত আর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন রোগীরা। কোনো রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে নদী পথে যেতে হয়। এ কারণে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো নিয়ে শঙ্কায় থাকতে হয় স্বজনদের।
স্থানীয় বাসিন্দা ফিরোজ আলম বলেন, রাস্তার ভাঙনে কী অসুবিধায় আছি, তা বলে বোঝানো যাবে না। আমাদের চলাচল প্রায় বন্ধ। পায়ে হেঁটে যাওয়ারও ব্যবস্থা নেই। আমরা পুরুষ মানুষ কষ্ট করে হলেও যেতে পারি, মহিলাদের তো আরও সমস্যা। বিশেষ করে অসুস্থ মানুষ নিয়ে বড় বিপদে আছি। ঠিক করে দেবে বলে তিন মাস চলে গেছে। ভাঙনের সময় কিছু বস্তা ফেলেছিল, পরে আর কারও দেখা পাওয়া যায়নি।
নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কাদির বলেন, এই রাস্তা ভাঙার আগে এর পাশে জমি ছিল। সেই শত শত একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আমাদের দুর্ভোগের বিষয়ে কেউ দেখে না। ধান-ফসল ফলানোর মতো এখন কোনো ব্যবস্থা নেই। অনেক বছর ধরে নদী ভাঙছে, কেউ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এখন নদী ভাঙতে ভাঙতে রাস্তায় আসার পর খবর হয়েছে। কিছু বস্তা ফেলছে, এই পর্যন্তই শেষ। আগে যদি কাজ করত, তাহলে ধানের জমি, রাস্তা নদীগর্ভে বিলীন হতো না। এখন আমাদের গ্রাম ভেঙে নেওয়ার সময় হয়েছে। কর্তৃপক্ষের কাছে প্রাণভিক্ষা চাই।
এলজিইডির অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রকৌশলী মো. মোজাম্মেল হক বলেন, ভাঙনের শুরুতে পানি উন্নয়ন বোর্ড কিছু জিওব্যাগ ফেলেছিল। বর্তমানে বিআইডব্লিউটিএ নদী খননের মাধ্যমে গতিপথ পরিবর্তন করে ভাঙন এলাকায় বালু ভরাট করছে। ভরাটের পর কার্পেটিং করে দ্রুত সড়কপথে চলাচল স্বাভাবিক করা হবে।