Image description

আজ ৩০ আগস্ট, আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয় এই দিনটি। প্রতিবছর দিনটি বিশেষভাবে নাড়া দেয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) শিক্ষার্থীদের। মনে করিয়ে দেয় ১৪ বছরেরও বেশি সময় আগে গুম হওয়া দুই ইবি শিক্ষার্থী ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাসের কথা।

আওয়ামী শাসনামলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আল ফিকহ্ এন্ড লিগ্যাল স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ওয়ালিউল্লাহ ও আল হাদিস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আল মুকাদ্দাস ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে নিখোঁজ হন। এরপর দীর্ঘ ১৪ বছর পার হলেও তাদের কোনও সন্ধান পায়নি পরিবার। তারা উভয়েই শিবিরের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় যান মুকাদ্দাস। এরপর ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে তিনি ও তার বন্ধু ওয়ালিউল্লাহ রাজধানীর কল্যাণপুর থেকে কুষ্টিয়াগামী হানিফ পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন। বাসের সুপারভাইজারের বরাতে স্বজনেরা জানান, বাসটি দিবাগত রাত ১২টার দিকে সাভারের নবীনগর এলাকায় পৌঁছালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ৮ থেকে ১০ জন লোক বাসে উঠে মুকাদ্দাস ও ওয়ালিউল্লাহকে নামিয়ে নিয়ে যান। এরপর থেকে তাদের আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।

ঘটনার পর ৬ ফেব্রুয়ারি মুকাদ্দাসের নিখোঁজের বিষয়ে তার চাচা আবদুল হাই রাজধানীর দারুস সালাম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। অন্যদিকে ওয়ালিউল্লাহর নিখোঁজের ঘটনায় ৮ ফেব্রুয়ারি তার বড় ভাই খালেদ সাইফুল্লাহ আশুলিয়া থানায় একটি জিডি করেন।

পুলিশ ও র‍্যাবসহ প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে কোনও সুরাহা না পেয়ে নিখোঁজ দুই ছাত্রের পরিবার হাইকোর্টে দুটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি রিটের শুনানি শেষে বিচারপতি আবদুল আউয়াল ও বিচারপতি মো. আকরাম হোসেন চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ নিখোঁজদের কেন আদালতে সশরীর হাজির করা হবে না, তা জানতে চেয়ে স্বরাষ্ট্রসচিব ও আইজিপিসহ ৯ কর্মকর্তার প্রতি রুল জারি করেন।

তবে নির্ধারিত সময়ে কর্মকর্তারা আদালতকে জানান, তারা দুই ছাত্রের কোনও সন্ধান পাননি। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৯ মে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে লিভ টু আপিল করার নির্দেশ দেন। পরিশেষে লিভ টু আপিলের শুনানি শেষে হাইকোর্টের আদেশ বাতিল করে বিচারপতি বজলুর রহমান ও বিচারপতি আকরাম হোসেন চৌধুরীর বেঞ্চ পর্যবেক্ষণসহ রিটটি খারিজ করে দেন।

আরও জানা যায়, ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাস অপহরণ ২০১২ সালে সংগঠিত বাংলাদেশের গুমের ইতিহাসের একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা। এই গুমের ঘটনায় তৎকালীন সরকার প্রবল সমালোচনার সম্মুখীন হয়। এই ঘটনায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানায়। জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের কার্যকরি বিভাগ বাংলাদেশে গুম হওয়া ৭৬ জন ব্যক্তির তালিকায় এই দুইজনকে ৯ ও ১০ নং সিরিয়ালে সংজ্ঞায়িত করেছিল। এছাড়াও বিশ্ব নির্যাতন বিরোধী সংস্থা, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস এই গুমের সমালোচনা ও তাদের স্ব-স্ব তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ওয়ালিউল্লাহ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ইবি শাখার তৎকালীন অর্থ সম্পাদক এবং আল-মুকাদ্দাস সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন।

ইবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইউসুফ আলী বলেন, ২০১২ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের সহায়তায় তাদের গুম করা হলেও ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত তাদের কোনও সন্ধান মেলেনি। এটি রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা। গুমের পরিকল্পনায় জড়িত শিক্ষক-কর্মকর্তারা এখনও স্বপদে বহাল থাকায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে অনতিবিলম্বে কুশীলবদের আইনের আওতায় আনা এবং দুই শিক্ষার্থীর সন্ধান নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানান তিনি। অন্যথায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে কঠোর আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, সন্তানহারা অসুস্থ বাবা-মায়ের দীর্ঘদিনের আহাজারি বন্ধে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে যেন আর কোনও মায়ের বুক যেন খালি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনও স্বাধীনচেতা নাগরিক যেন আর গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার না হন, সে বিষয়ে অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে দেশে যে-কোনও ধরনের নতুন ফ্যাসিবাদের অপছায়া অঙ্কুরেই উপড়ে ফেলতে তিনি দেশের সচেতন নাগরিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধ ও সজাগ থাকার আহ্বান জানান।

এ বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, ‘সরকার এ ব্যাপারে কাজ করছে। আশাকরি এটা নিয়ে পদক্ষেপ নেবে সরকার।’