Image description

প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) সরকারি প্রণোদনার বকেয়া বাবদ ৮,৫৬৫ কোটি টাকারও বেশি অর্থের বোঝা বহন করছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। সরকারের ঘোষিত প্রণোদনার অর্থ সময়মতো ফেরত না পাওয়ায়—ব্যাংকগুলোকে নিজস্ব আমানত থেকে এই ভর্তুকির অর্থ মেটাতে হচ্ছে। এতে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট তীব্র হওয়ার পাশাপাশি সার্বিক মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সরকারি নীতি অনুযায়ী, দেশে আসা প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের ওপর প্রবাসীদের ২.৫ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা দেয় ব্যাংকগুলো। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হয়ে ব্যাংকগুলো এই অর্থ বিতরণ করে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে এই অর্থ তাদের ফেরত পাওয়ার কথা। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেকর্ড ৩,৫৫৯ কোটি (৩৫.৫৯ বিলিয়ন) ডলার প্রবাসী আয় আসা এবং টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ডলারে প্রণোদনার খরচ বেড়ে ৩ টাকায় পৌঁছানোয়—সরকারের কাছ থেকে এই অর্থ ফেরত পেতে প্রায় সাড়ে ৯ মাস বিলম্ব হচ্ছে।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হাতে আসা নথি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনের শেষে বকেয়া দাবির পরিমাণ ছিল ৮,১৮৫ কোটি টাকা। এরপর ২ আগস্ট ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হলেও, জুলাই মাসের নতুন ৮৭৯ কোটি টাকার দাবিসহ মোট বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮,৫৬৫ কোটি টাকায়।

 

বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বকেয়া দাবি রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের—১,৫১৩ কোটি টাকা। এরপরই রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক (৮৫০ কোটি টাকা), সিটি ব্যাংক (৩৩৫ কোটি টাকা), ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (২৫০ কোটি টাকা), পুবালী ব্যাংক (২৫০ কোটি টাকা) এবং সাউথইস্ট ব্যাংক (১৭০ কোটি টাকা)।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, প্রায় দুই বছর ধরে তাঁরা এই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। আমানতকারীদের তহবিল থেকে প্রবাসীদের এই প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে, যা ব্যাংকের মুনাফায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে। কারণ, এই অর্থ ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা হলে ব্যাংকগুলো অন্তত ৯ শতাংশ হারে সুদ পেতে পারত।

বেসরকারি একটি ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকের তহবিল সংগ্রহের খরচ (আমানতের সুদ) এবং সরকারের অর্থ ফেরতে বিলম্বের মধ্যে তৈরি হওয়া এই ব্যবধানের ফলে ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমছে। এটি আগামী মাসগুলোতে প্রবাসী আয় সংগ্রহের বিষয়ে ব্যাংকগুলোর উৎসাহ কমিয়ে দিতে পারে।

বেসরকারি একটি ব্যাংকের অপর এক জ্যেষ্ঠ নির্বাহী বলেন, "রাজস্ব আহরণ কমে যাওয়ার কারণে অর্থ মন্ত্রণালয় তহবিল সংকটে রয়েছে, যার ফলে অর্থ ছাড় করতে দেরি হচ্ছে।" বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান নিশ্চিত করেছেন যে, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে তহবিল পাওয়ার পরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা বিতরণ করে। ফলে অর্থ ছাড়ের সময়সূচি এখন পুরোপুরি সরকারের ওপর নির্ভর করছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, "এই বিলম্বের কারণে ব্যাংকগুলোকে বড় ধরনের অপোরচুনিটি কস্ট গুনতে হচ্ছে। ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের আমানত থেকে এই নগদ অর্থ পরিশোধ করছে—যার বার্ষিক খরচ ৭ থেকে ৮ শতাংশ। অথচ এই অর্থ ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করতে না পারায় ৯ শতাংশ বা তার বেশি আয় হাতছাড়া হচ্ছে।"

সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাসরুর আরেফিন বলেন, "ব্যাংকগুলোর ওপর এর প্রভাব ত্রিমুখী। প্রথমত, ঋণের জন্য ব্যবহারযোগ্য তারল্য কমে যায়। দ্বিতীয়ত, আমানতের ওপর সুদের দায় অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও— আটকে থাকা তহবিল থেকে কোনো আয় আসে না। এবং তৃতীয়ত, আয় বাড়ায় এমন সম্পদে বিনিয়োগের সুযোগ হারায় ব্যাংক।"

তিনি আরও বলেন, "বাজেট ও নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সরকার চাপের মধ্যে রয়েছে। প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত রেমিট্যান্স বাড়ায় প্রণোদনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণও অনেক বেড়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দ ও অর্থ ছাড় বাড়েনি।"

মাসরুর আরেফিন প্রস্তাব করেন, ব্যাংকগুলোকে তিন মাসের অগ্রিম তহবিল দেওয়ার আগের ব্যবস্থাটি আবার চালু করা উচিত। এ ছাড়া প্রতি মাসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংকগুলোর দাবি নিষ্পত্তি করা, রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখা এবং নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি দেরি হলে ব্যাংকগুলোর তহবিলের খরচ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি জানান, "বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ব্যাংকগুলোর উদ্বেগের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলে বকেয়া অর্থ পরিশোধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন।"

টাকার অবমূল্যায়নে বেড়েছে প্রণোদনার খরচ

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সরকার এর আগে ব্যাংকগুলোকে অগ্রিম প্রণোদনার অর্থ প্রদান করত। তবে এখন অর্থ পরিশোধে বিলম্ব হওয়ায় কোনো কোনো বকেয়া পরিশোধের মেয়াদ দুই বছর পর্যন্ত গড়াচ্ছে।

একজন ব্যাংকার বলেন, দুই বছর আগের তুলনায় এখন রেমিট্যান্সের প্রবাহ অনেক বাড়ায় প্রণোদনার দায়ও বেড়েছে।

এদিকে, ২০২৪ সালের আগস্টের আগে রেমিট্যান্সের জন্য প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১১৭ টাকা এবং ব্যাংকগুলো প্রণোদনা হিসেবে প্রতি ডলারে অতিরিক্ত ২.৯৫ টাকা প্রদান করত। বর্তমানে রেমিট্যান্সের বিনিময় হার বেড়ে ১২৩ টাকায় দাঁড়ানোয় ব্যাংকগুলোকে তাদের আমানত তহবিল থেকে প্রতি ডলারে ৩ টাকা করে প্রণোদনা দিতে হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি বকেয়ায় বহুবিধ ঝুঁকি

ব্যাংকাররা সতর্ক করে বলছেন, অর্থ পরিশোধের এই বিলম্ব দীর্ঘায়িত হলে তা বেশ কয়েকটি মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

প্রবাসী আয় আকৃষ্ট করতে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত বিনিয়োগ ও প্রচারণা চালানোর আগ্রহ কমে যেতে পারে। একই সাথে বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউস ও মানি ট্রান্সফার কোম্পানিগুলোর সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রাখার খরচ বহন করাও ব্যাংকগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।

ছোট ও তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর ওপর এই চাপ তুলনামূলক বেশি পড়বে।

সরকারি পাওনার বড় একটি অংশ অনাদায়ি হিসেবে পড়ে থাকায় ব্যাংকগুলোর সম্পদ-দায় ব্যবস্থাপনা (অ্যাসেট-লাইবিলিটি ম্যানেজমেন্ট) দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এ ছাড়া প্রণোদনা প্রদানে বিলম্ব গ্রাহকদের আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলের বদলে অবৈধ 'হুন্ডি' পদ্ধতির দিকে ঝুঁকে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।

এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার, চলতি হিসাবের ভারসাম্য এবং রিজার্ভে রেমিট্যান্সের যে ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে, তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।