Image description

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী বিএনপি গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে। দায়িত্বে প্রথম ছয় মাসে সরকারকে ঘিরে অনলাইনে ছড়ানো অপতথ্যের চিত্র তুলে ধরেছে রিউমর স্ক্যানার। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সময়ে সরকার, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিষয়কে কেন্দ্র করে মোট ৪৬৪টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর প্রায় ৯১ শতাংশই সরকারের বিপক্ষে বা নেতিবাচক বার্তা তৈরির উদ্দেশ্যে ছড়ানো।

রিউমর স্ক্যানার বলেছে, এসব অপতথ্যে সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অপপ্রচারের প্রধান কৌশলগুলোর মধ্যে ছিল ভুয়া বক্তব্য, নকল ফটোকার্ড, পুরোনো ছবি-ভিডিও, সার্কাজম পেজ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর কনটেন্ট।

তারেক রহমানকে ঘিরে ১৫৭ অপতথ্য

সরকারের প্রথম ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের লক্ষ্য ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁকে ঘিরে মোট ১৫৭টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর প্রায় ৭৮ শতাংশ ছিল নেতিবাচক।

তারেক রহমানকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩৪টি অপতথ্য এসেছে সার্কাজম পেজের পোস্ট থেকে। তাঁর নামে ৩০টি ভুয়া বক্তব্য ছড়ানো হয়েছে। গণমাধ্যমের আদলে তৈরি ২২টি ভুয়া ফটোকার্ডও শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।

এ ছাড়া এআই ব্যবহার করে তৈরি বা সম্পাদিত ১৯টি কনটেন্ট পাওয়া গেছে। পুরোনো ছবি-ভিডিওকে নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার ৭টি এবং সম্পাদিত ছবি ব্যবহারের ৫টি ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে।

মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের ঘিরে ২৬২ অপতথ্য

সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সহকারীদের ঘিরে একই সময়ে অন্তত ২৬২টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর প্রায় ৯৯ শতাংশই ছিল নেতিবাচক।

মন্ত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের লক্ষ্য ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁকে ঘিরে ৪৮টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে ঘিরে ৩৩টি এবং বর্তমানে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি এবং সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ঘিরে ২৬টি অপতথ্য পাওয়া গেছে।

সংসদে স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে হাফিজ উদ্দিন আহমদকে ঘিরে ২৩টি অপতথ্য শনাক্ত হয়। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীকে ঘিরে ১৬টি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে ঘিরে ১৫টি এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে ঘিরে ১৪টি করে অপতথ্য পাওয়া যায়।

সংসদ সদস্যদের নিয়েও অপতথ্য

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন দলের সংসদ সদস্যদের ঘিরে মোট ৩০৮টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। বিএনপির সংসদ সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৬টি অপতথ্য ছিল ফজলুর রহমানকে ঘিরে। ক্ষমতাসীন দলটির সংসদ সদস্যদের নিয়ে মোট ৪৫টি অপতথ্য পাওয়া গেছে।

বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের ঘিরে মোট ১১৬টি অপতথ্য শনাক্ত হয়। এর মধ্যে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানকে ঘিরে ছড়ানো হয়েছে সর্বোচ্চ ৫৮টি অপতথ্য। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্যদের ঘিরে মোট ১২৪টি অপতথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে হাসনাত আবদুল্লাহকে ঘিরে ছড়ানো হয়েছে ৫৯টি এবং নাহিদ ইসলামকে ঘিরে ২৭টি।

নারী নেত্রীদের ঘিরেও অপতথ্য

সরকারি দল বিএনপি ও সংসদে থাকা অন্যান্য দলের নারী নেত্রীদের ঘিরেও অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদকে ঘিরে ৪টি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা আফরোজা খানম রিতাকে ঘিরে ১টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। দুজনকে ঘিরে শনাক্ত সব অপতথ্যই ছিল নেতিবাচক।

সংসদ সদস্যদের মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ডা. মাহমুদা মিতুকে ঘিরে ২৬টি এবং নুসরাত তাবাসসুমকে ঘিরে ৫টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। বিএনপির সংসদ সদস্য মানসুরা আলমকে ঘিরে ৩টি এবং নিলোফার চৌধুরী মনিকে ঘিরে ২টি অপতথ্য পাওয়া গেছে।

নারীদের মধ্যে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাকে ঘিরে শনাক্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি ২২টি অপতথ্য। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজকে ঘিরে ১২টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।

জ্বালানি সংকট নিয়ে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য

ইস্যুভিত্তিক বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য ছড়িয়েছে জ্বালানি সংকট নিয়ে। ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত এই ইস্যুতে ৫৮টি অপতথ্য শনাক্ত করে রিউমর স্ক্যানার।

এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিক্ষোভ নিয়ে ৪৫টি, এমপি গাজী নজরুল ইসলামের ভিডিওকে কেন্দ্র করে ৪২টি এবং বন্যা নিয়ে ৪১টি অপতথ্য শনাক্ত হয়। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নিয়ে ৩৮টি এবং জুলাই-সংক্রান্ত বিষয়ে ৩৭টি অপতথ্যও পাওয়া গেছে।

রিউমর স্ক্যানারের পর্যবেক্ষণ বলছে, সরকারের প্রথম ছয় মাসে অপতথ্য শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। জ্বালানি, শিক্ষা, বন্যা, অপরাধ, ধর্মীয় বিষয় এবং বিভিন্ন সমসাময়িক ঘটনাও অপতথ্য ছড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল।