Image description

রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারাচ্ছেন পথচারীরা। গত ছয় বছরে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের ৪২ শতাংশই পথচারী। আর এসব দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে রাতে। বেপরোয়া গতির ভারী যানবাহন, পর্যাপ্ত সড়কবাতির অভাব এবং পথচারীবান্ধব অবকাঠামো না থাকায় রাতের রাজধানীর সড়ক পথচারীদের জন্য হয়ে উঠেছে মৃত্যুফাঁদ।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক সময়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত রাজধানীতে ১ হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৮৪ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫৯২ জনই পথচারী। নিহতদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫৩৬ জন মোটরসাইকেল আরোহী। এ ছাড়া বাস, রিকশা ও সিএনজিসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালক ও যাত্রী নিহত হয়েছেন ২৫৬ জন।

নির্দিষ্ট সময়ের হিসাব করলে দেখা যায়— রাতেই সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে। গত ছয় বছরে রাতে নিহত হয়েছেন ৫১৯ জন, যা মোট মৃত্যুর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এ ছাড়া সকালে ২৫৮ জন, দুপুরে ১৯৫ জন, বিকালে ১৭৪ জন, ভোরে ১৪২ জন এবং সন্ধ্যায় ৯৬ জন নিহত হয়েছেন।

 

 

সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি দুর্ঘটনায়ও এর ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। চলতি মাসের শুরুতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক প্রতিবেশীকে দেখে বাড়ি ফেরার পথে রাত পৌনে ১টার দিকে শনির আখড়া ফুটওভার ব্রিজের নিচে কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় নিহত হন মো. সোলাইমান দেওয়ান (৪৩)। গত মাসের মাঝামাঝি রাত ৯টার দিকে উত্তরা জসিমউদ্দীন রোডে রাস্তা পার হওয়ার সময় দ্রুতগতির ট্রাকের চাপায় নিহত হন আনোয়ারুল হক।

এর আগে ৭ জুন মগবাজার ওয়্যারলেস গেটে দ্রুতগতির মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ছিটকে পড়ে আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের বাসের নিচে পিষ্ট হয়ে নিহত হন এক পথচারী। ১৪ এপ্রিল ভোর ৫টার দিকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় লরির ধাক্কায় প্রাণ হারান কামাল হোসেন (৪৫)।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পথচারীদের নিরাপদে চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবই এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের ভাষ্য, ঢাকার সড়কে পথচারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার বেশির ভাগই নেই। সরকার ফুটপাত নির্মাণ করলেও পরে সেগুলো দখল হয়ে যায়। যেখানে ফুটওভার ব্রিজ প্রয়োজন, সেখানে অনেক সময় তা নেই। আবার যেগুলো রয়েছে, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলোর অনেকগুলোই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে পথচারীরা বাধ্য হয়ে মূল সড়ক ব্যবহার করছেন।

‘বাইপাস সড়ক না থাকায় রাত ১০টার পর রাজধানীর সড়কে ভারী যানবাহনের চলাচল বেড়ে যায়। এসব যানবাহন অনেক সময় অতিরিক্ত গতিতে চলাচল করে। ট্রাকের হেডলাইটের আলোও পথচারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। পাশাপাশি দীর্ঘ যানজটে চালকদের মানসিক অসহিষ্ণুতা, একই সড়কে দ্রুত ও ধীরগতির যানবাহনের মিশ্র চলাচল এবং অপরিকল্পিত রুট পারমিটও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ’—উল্লেখ করলেন সাইদুর রহমান।

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সরকারের কাছে বেশ কিছু সুপারিশ দিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এর মধ্যে রাজধানীর পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক বাস সার্ভিস চালুর পরামর্শ রয়েছে। পাশাপাশি বিআরটিএ, বিআরটিসি, ডিটিসিএ, সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে বহুমুখী কার্যক্রম পরিচালনার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

রাজধানীর রাস্তাগুলো নির্মাণের ক্ষেত্রে যানবাহন গুরুত্ব পেলেও উপেক্ষিত পথচারীরা বলে মনে করেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদীউজ্জামান। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ঢাকার সড়কের অবকাঠামো মূলত যানবাহনের চলাচলকে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। অনেক সময় সড়ক প্রশস্ত করতে গিয়ে ফুটপাত সংকুচিত করা হয়। অথচ রাজধানীর প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ পায়ে হেঁটে কর্মস্থলে যাতায়াত করেন।

তার ভাষ্য, মাত্র তিন হাজার কিলোমিটার সড়কে ৩ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করলেই পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।

রাতে দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে যানবাহনের অতিরিক্ত গতিকে দায়ী করে বুয়েটের এই অধ্যাপক বলেন, রাতে যানবাহনগুলো তুলনামূলক বেশি গতিতে চলাচল করে। সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে নতুন করে স্পিড মিটার বসানো প্রয়োজন। অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালালে তাৎক্ষণিকভাবে চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া গেলে রাতে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকটাই কমে আসবে।