আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক সময় জমির রেজিস্ট্রেশনকৃত দলিলে বিভিন্ন ধরনের ভুল থেকে যায়। এসব ভুলের কারণে পরবর্তী সময়ে জমির মালিককে নানা বিড়ম্বনা ও আইনি জটিলতায় পড়তে হয়। এসব সমস্যার সমাধান নিয়ে ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ শীর্ষক একটি বই লিখেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। বইটির ষষ্ঠ অধ্যায়ের ১৭৯ থেকে ১৮১ নম্বর পৃষ্ঠায় দলিল সংশোধনের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
বইটিতে বলা হয়েছে, ‘জমি রেজিস্ট্রির পর দলিলে দাগ, খতিয়ান, মৌজা, চৌহদ্দি বা নামের বানানে কোনো প্রকার ভুল ধরা পড়লে কিংবা দলিল লেখার বিবরণে বর্ণিত তারিখ, দলিল নম্বর কিংবা তথ্যের যথার্থ ভুল হলে কী করবেন, কীভাবে সংশোধন করবেন, সংশোধন না করলে আপনি কী কী সমস্যায় পড়তে পারেন, আর সংশোধনের জন্য আপনাকে কোথায় যেতে হবে, কত টাকা খরচ হবে—সেসব বিষয়ে আলোচনা জানুন।’
লেখক বলেন, ‘শুরুতেই জানিয়ে রাখি, এরকম অশুদ্ধ দলিল হলে আপনি যার কাছ থেকে জমি কিনেছেন কিংবা তার মৃত্যুর পর স্থলাভিষিক্ত ওয়ারিশগণ আপনার দাবি অনুযায়ী উক্ত দলিল সংশোধনে অনিচ্ছুক হলে তা সংশোধনের নিমিত্তে সংশ্লিষ্ট আদালতে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩১ ধারা অনুযায়ী দলিল সংশোধনের মোকদ্দমা করতে হয়।’

বইটিতে আরও বলা হয়েছে, ‘তবে দলিল রেজিস্ট্রির তারিখ থেকে ৩ বছরের মধ্যে দেওয়ানি আদালতে দলিল সংশোধনের মোকদ্দমা করতে হয়। তবে এ সময়ের মধ্যে দলিলের ভুল উদ্ঘাটিত না হলে তামাদি আইনের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী দলিলের ভুল উদ্ঘাটনের তারিখ থেকে ৩ বছরের মধ্যে মামলাটি আনয়ন করতে হয়। কারণ ৩ বছর পর এ ধরনের মোকদ্দমা তামাদির কারণে বারিত হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে তখন আর দলিল সংশোধনের মোকদ্দমা করা যায় না, তখন ঘোষণামূলক মোকদ্দমা করা যায়। এক্ষেত্রে আদালত কর্তৃক মামলার যে রায় দেওয়া হয়, সেটিই হচ্ছে সংশোধন দলিল। অর্থাৎ রায়ের একটি সার্টিফায়েড কপি আদালত থেকে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে পাঠানো হলে সাব-রেজিস্ট্রার উক্ত রায়ের আলোকে সংশ্লিষ্ট ভলিউম সংশোধন করে নেবেন। এক্ষেত্রে আর নতুন করে কোনো দলিল করার প্রয়োজন নেই।’
এতে আরও বলা হয়েছে, সিভিল আদালতের বিভিন্ন ধরনের মামলা সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের অধীনে পরিচালিত হয়। যেমন—স্বত্বের মামলা, দখল উদ্ধারের মামলা, চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের মামলা, দলিল সংশোধনের মামলা, চুক্তি বাতিলের মামলা, দলিল বাতিলের মামলা, ঘোষণামূলক মামলা ও নিষেধাজ্ঞার মামলা।
প্রতারণা বা পারস্পরিক ভুল
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের দলিল সংশোধনসংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী, প্রতারণা অথবা পক্ষগুলোর পারস্পরিক ভুলের কারণে কোনো লিখিত দলিল পক্ষগুলোর প্রকৃত অভিপ্রায় সঠিকভাবে প্রকাশ না করলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ বা তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি দলিল সংশোধনের জন্য মামলা করতে পারেন।

তবে দলিল সংশোধনের মামলায় প্রতারণা বা পারস্পরিক ভুলের বিষয়টি আদালতে প্রমাণ করতে হবে। শুধু এক পক্ষের সাধারণ ভুলের ভিত্তিতে সব ক্ষেত্রে দলিল সংশোধনের প্রতিকার পাওয়া যাবে—এমন নয়।
উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা
বইয়ে একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ধরা যাক, রহিম মিয়া লেখাপড়া জানেন না। কুষ্টিয়ার খোকসা মৌজায় ৫১, ৫২ ও ৫৩ দাগে তার তিন খণ্ড জমি ছিল। অভাবের কারণে তিনি ৫১ দাগের জমিটি আব্দুল ফজলু মিয়ার কাছে বিক্রি করেন।
ফজলু মিয়া দলিল লেখকের সঙ্গে যোগসাজশ করে দলিল রেজিস্ট্রির সময় ৫১ দাগের জমির সঙ্গে প্রতারণামূলকভাবে রহিম মিয়ার বাকি দুটি—৫২ ও ৫৩ দাগের জমিও দলিলে অন্তর্ভুক্ত করে নেন। নিয়ম অনুযায়ী দলিলটি রেজিস্ট্রি হয়ে যায়।
সহজ-সরল রহিম মিয়া পরবর্তী সময়ে ৫২ দাগের জমিটি তার ছোট ভাই সাদেক মিয়াকে দান করেন এবং ৫৩ দাগের জমিটি রাশেদ নামের এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেন। সাদেক ও রাশেদ জমির দখল নিতে গেলে ফজলু মিয়া বাধা দেন। তখন প্রতারণার বিষয়টি প্রকাশ পায়।

এ অবস্থায় দলিল সংশোধনের মামলা করলে ৫২ দাগের জমির ক্ষেত্রে রহিম মিয়া প্রতিকার পেতে পারেন। কারণ জমিটি তিনি তার ছোট ভাই সাদেক মিয়াকে দান করেছিলেন। কিন্তু ৫৩ দাগের জমির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। রাশেদ যদি যথাযথ মূল্য দিয়ে সরল বিশ্বাসে জমিটি কিনে থাকেন, তাহলে তার অর্জিত অধিকারে হস্তক্ষেপ করে দলিল সংশোধনের প্রতিকার নাও পাওয়া যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে রহিম মিয়া ফজলু মিয়ার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন।
বইটিতে বলা হয়েছে, দলিল সংশোধনের মামলার আরজিতে ক্ষতিপূরণের বিকল্প প্রার্থনা রাখা উচিত। তবে আরজিতে ক্ষতিপূরণের বিকল্প প্রার্থনা না থাকলেও আইনসিদ্ধ ক্ষেত্রে আদালত তার বিবেচনামূলক ক্ষমতা প্রয়োগ করে ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারেন।
কারা দলিল সংশোধনের মামলা করতে পারেন
লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতারণা, পক্ষগুলোর পারস্পরিক ভুল কিংবা পক্ষগুলোর প্রকৃত অভিপ্রায় দলিলে ভুলভাবে লিপিবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে সংশোধনের প্রশ্ন আসতে পারে। দলিল সংশোধনের মামলা করতে পারেন—দলিলের যে কোনো পক্ষ, স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি, দলিলের কোনো পক্ষের উত্তরাধিকারী, দলিলের কোনো পক্ষের কাছ থেকে হস্তান্তরগ্রহীতা এবং দলিলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।
কখন দলিল সংশোধন করা যায় না
বইয়ে বলা হয়েছে, কোনো তৃতীয় ব্যক্তি যথাযথ মূল্যের বিনিময়ে সরল বিশ্বাসে সম্পত্তি কিনে থাকলে তাঁর অর্জিত অধিকারে হস্তক্ষেপ করে দলিল সংশোধন করা যায় না।
এ বিষয়ে বইয়ে আরেকটি উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। ধরা যাক, কুলসুম খাতুন একটি নির্দিষ্ট দাগের সম্পত্তি হানিফা খাতুনের কাছে বিক্রি করেন। হানিফা খাতুন দলিল লেখকের সঙ্গে যোগসাজশ করে কুলসুম খাতুনের অন্য একটি সম্পত্তিও ওই দলিলে অন্তর্ভুক্ত করে নেন।

পরবর্তী সময়ে হানিফা খাতুন ওই সম্পত্তি চম্পা খাতুনের কাছে বিক্রি করেন। চম্পা খাতুন যদি যথাযথ মূল্য দিয়ে সরল বিশ্বাসে জমিটি কিনে থাকেন, তাহলে তাঁর অধিকারে হস্তক্ষেপ করে দলিল সংশোধনের প্রতিকার পাওয়া যাবে না। তবে কুলসুম খাতুন প্রতারণাকারীর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন।
কোন কোন দলিল সংশোধন করা যায়
বইটিতে বলা হয়েছে, রেজিস্ট্রিকৃত দলিল অর্থাৎ কবলা দলিল, লিখিত চুক্তিপত্র ও বন্ধকী দলিলসহ আইন অনুযায়ী সংশোধনযোগ্য লিখিত দলিল আদালতের মাধ্যমে সংশোধনের আবেদন করা যায়।
মামলার মূল্যমান ও বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে কোন দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে, তা নির্ধারিত হয়। মামলার মূল্যায়ন, কোর্ট ফি এবং সংশ্লিষ্ট আদালতের আর্থিক এখতিয়ারও বিবেচনায় নিতে হয়। সম্পত্তি যে এলাকায় অবস্থিত, সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারকে প্রয়োজন অনুযায়ী মোকাবিলা বিবাদী হিসেবে পক্ষভুক্ত করতে হতে পারে।
মনে রাখতে হবে, দলিল সংশোধনের মামলা করলেই আদালত স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশোধনের আদেশ দেবেন—এমন নয়। আদালত আইন, প্রমাণ ও মামলার পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করে তার বিচারিক বিবেচনামূলক ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। তবে এ ক্ষমতার প্রয়োগ স্বেচ্ছাচারী হতে পারে না।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।
তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।
তথ্যসূত্র: জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি প্রতিকার (লেখক: ড.পি. এম সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক), অ্যাডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট)