রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজারে ১৯২ কোটি টাকায় স্থাপিত হতে যাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) হাব। এই প্রকল্পে পরামর্শক ব্যয়ই ধরা হয়েছে ৬২ কোটি টাকা। এমন অত্যধিক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। সেই সঙ্গে তা কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার সুপারিশ করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কেন্দ্র করে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তৈরি’র প্রকল্প নিতে যাচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। এতে গুরুত্ব দেওয়া হবে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি ও তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন। প্রকল্পটি বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বা তিন বছর ছয় মাসে এটি বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৩৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। বাকি ১৫৯ কোটি টাকা বা ১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান দেবে কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (কোইকা)। এ অনুদানের বিষয়ে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বাংলাদেশ সরকার ও কোইকার মধ্যে চুক্তি সই হয়েছে বলে জানিয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)।
প্রকল্পটি কারওয়ান বাজারে অবস্থিত সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে (এসটিপি-২) বাস্তবায়ন হবে। এর আওতায় এসটিপি-২-এর চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলায় অভ্যন্তরীণ সজ্জা এবং কারওয়ান বাজারে অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কাজ করা হবে।
প্রকল্পে অর্থায়ন নিয়ে কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (কোইকা) সঙ্গে চুক্তি সই
প্রকল্পের মূল কার্যক্রম
জাতীয় পর্যায়ে উৎকর্ষ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং অন্যান্য অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি-সম্প্রসারণের জন্য একটি পুনরাবৃত্তিযোগ্য মডেল তৈরি করা প্রকল্পের মূল কাজ। থাকবে উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন এআই হাব প্রতিষ্ঠা এবং এআই ডিজিটাল প্রযুক্তি যেমন- এআই (বেসিক), এআই (অ্যাডভান্সড), বিগ ডেটা, ক্লাউড কম্পিউটিং, স্মার্ট ফ্যাক্টরি, সাইবার সিকিউরিটি, ব্লকচেইন, থ্রিডি মডেলিং ইত্যাদিতে প্রশিক্ষিত নতুন বিশেষজ্ঞ তৈরি।
সেই সঙ্গে এআই ডিজিটাল প্রযুক্তিভিত্তিক ১০টি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ, ৩০টি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠা ও উদ্যোগ সৃষ্টি, প্রশিক্ষণার্থীদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের হার ৮০ শতাংশ নিশ্চিত করাসহ কোরিয়ান ভাষা প্রশিক্ষণে ২৫০টি কর্মসূচি পরিচালনা করা প্রকল্পের প্রধান কাজ।
বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কেন্দ্র করে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তৈরির প্রকল্পের প্রস্তাব এসেছে। সামনে এটা নিয়ে সভা হবে। সভা করার আগে আমরা কিছু মতামত দিয়েছি প্রকল্পের ব্যয়ের বিষয়ে।- আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের যুগ্মপ্রধান লুৎফর রহমান
প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যমাত্রা
আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন এআই হাব স্থাপন ও এর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সমন্বিত মোট পাঁচতলা ভবন নির্মাণ। টেকসই পরিচালন কাঠামো তৈরি, সক্ষমতা উন্নয়ন এবং সমন্বিত এআই ডিজিটাল প্রযুক্তি কারিকুলাম ও প্রশিক্ষণ উপকরণ তৈরি। পাশাপাশি কারিগরি ডিগ্রি প্রোগ্রামের মাধ্যমে মূল জনবল প্রশিক্ষণ, কার্যকর প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা গঠন, শিল্প সংযুক্তি ও একাডেমিয়া অংশীদারত্ব জোরদার করা হবে। স্টার্টআপ ও শিল্প-ইকোসিস্টেমের সঙ্গে মেলানোও প্রকল্পের অন্যতম কাজ। ব্যবসায়িক উদ্ভাবনে উদ্যোগ সমর্থন দেওয়া এবং নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতেও বিশেষ গুরুত্ব পাবে এআই হাব।
হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ জানায়, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে উদীয়মান প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ এবং প্রস্তুত করতে একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এআই হাব প্রতিষ্ঠা করাই প্রকল্পের প্রধান কাজ। এটি শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিল্প-শিক্ষা সংযোগ জোরদার করা, স্টার্টআপ তৈরি ও নতুন প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। পাশাপাশি জাতীয় আইসিটি নীতিমালা ও জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা, ২০২৪-এর আলোকে একটি আন্তর্জাতিক মানের এবং প্রতিযোগিতামূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আলোচ্য প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি ও আইসিটি খাতে নতুন সম্ভাবনা উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাত এবং বিশেষ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে এআই। এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের জন্য গতিশীল ও বিশ্বমানের প্রবৃদ্ধি অর্জন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এআই হাব সামাজিক-অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজারে অবস্থিত সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে (এসটিপি-২)
মূল্যায়নের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব
প্রকল্প প্রস্তাবটি বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (এসপিইসি) জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। সেখানে ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগ। সেই সঙ্গে প্রকল্পটি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন এনেছে। এছাড়া পরামর্শক সংস্থা ও পরামর্শক সেবা নিয়ে আরও বিশদ আলোচনা দরকার বলে জানিয়েছে।
কমিশন জানায়, হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা। কিন্তু অর্থ পরিপত্র অনুযায়ী তাদের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) সরকারি অর্থায়নের অংশে অর্থ বিভাগের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। প্রস্তাবিত অর্থের অর্থায়নের ধরন ডিপিপিতে সংযোজন করতে হবে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ খাতে ৪২ কোটি ৩৫ লাখ ৫৩ হাজার টাকা ব্যয়ে এক হাজার ৭৫ জনের বিভিন্ন বিষয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধির সংস্থান রাখা হয়েছে। এই প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা, অংশগ্রহণকারীর বিবরণ ও সংখ্যা, প্রশিক্ষণের বিষয় এবং ব্যয় নির্ধারণের ভিত্তি সম্পর্কে জানতে চেয়েছে কমিশন।
নানা ত্রুটি চিহ্নিত ও প্রশ্ন উত্থাপন
প্রস্তাবিত প্রকল্পের ত্রুটি চিহ্নিত করে কমিশন জানায়, প্রকল্পে জনবলের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে অর্থ বিভাগের আন্তঃমন্ত্রণালয় জনবল নির্ধারণ সংক্রান্ত কমিটির সুপারিশ ডিপিপিতে সংযোজন করা হয়নি। জনবলের প্রস্তাব ও বেতন-ভাতা খাতে ব্যয় প্রাক্কলন অর্থ বিভাগের জনবল কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে বলে জানিয়েছে কমিশন।
এছাড়া প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়নের সংস্থান থাকায় ইআরডির অনাপত্তি-সম্মতিপত্র ডিপিপিতে সংযোজন করার বিষয়ে জানতে চেয়েছে কমিশন। প্রকল্পের আওতায় কার্যালয় ও হাবে অভ্যন্তরীণ সজ্জা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে ১৩ কোটি ৯৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। প্রকল্প প্রস্তুতকালে অবকাঠামো প্রস্তুত এবং বরাদ্দের মাত্রা প্রাক্কলনের এই যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কমিশন।
প্রকল্পে ১৫৯ কোটি টাকা কোইকা অনুদান দেবে। তাদের জনবলই আমাদের ট্রেনিং দেবে। এই টাকা তাদের জন্যই ব্যয় হবে।- হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের পরিচালক রফিকুল ইসলাম
প্রকল্পের আওতায় সরঞ্জামের দুই খাতে সাড়ে ৪১ কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। এসব সরঞ্জামের বাজারদর নিয়ে প্রশ্ন করেছে কমিশন। সেই সঙ্গে দুটি যানবাহনে ৯৮ লাখ টাকা এবং প্রচলিত আসবাবপত্র কেনায় ১৫ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। এ বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে কমিশন। পাশাপাশি প্রকল্পের অপারেশন, ব্যয় পরিকল্পনা ও কারিগরি দক্ষতা অবকাঠামোগত বিভাগের প্রাক্কলন করার বিষয়ে আরও বিশদ আলোচনার সুপারিশ করেছে।
যা বলছে কর্তৃপক্ষ
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের যুগ্মপ্রধান (প্যামস্টেক উইং) মুহাম্মদ লুৎফর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কেন্দ্র করে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তৈরির প্রকল্পের প্রস্তাব এসেছে। সামনে এটা নিয়ে (প্রকল্পের বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির) সভা হবে। সভা করার আগে আমরা কিছু মতামত দিয়েছি প্রকল্পের ব্যয়ের বিষয়ে। বাকিটা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বলবে।’
যোগযোগ করা হলে হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের পরিচালক (কারিগরি) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, প্রকল্পের আওতায় তরুণদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। স্থানীয়ভাবে মাস্টার ট্রেইনার তৈরি করা হবে। এক হাজার ৭৫ জনের বিভিন্ন বিষয়ে সক্ষমতা তৈরি করা হবে।
১৯২ কোটির প্রকল্পে ৬২ কোটি টাকার পরামর্শক ব্যয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পে ১৫৯ কোটি টাকা কোইকা অনুদান দেবে। তাদের জনবলই আমাদের ট্রেনিং দেবে। এই টাকা তাদের জন্যই ব্যয় হবে।’