রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনার তদন্তভার কোতয়ালি থানা থেকে বদল করে গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) দেওয়া হয়েছে। অধিকতর স্বচ্ছ তদন্তের জন্যই তদন্ত সংস্থা বদল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে, খুনের প্রকৃত রহস্য বের করতে দরকার হলে আলামত পরীক্ষা করা হবে বলে মন্তব্য করেছেন নতুন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ওসি জিন্নাত আলী।
আজ সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এই হত্যা মামলায় নতুন মাত্রা যোগে বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। দ্রুতই একটা ভালো খবর পাবেন। চাঞ্চল্যকর ৪ খুনের তদন্তভার পেয়েছি। মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রপক্ষ মনে করেছে আমাকে দায়িত্ব দিলে তদন্ত হয়তো আরও ভালো হবে, ভালো ফল পাওয়া যাবে। সেই আশাবাদ আমারও। এই হত্যার বিষয়ে সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়গুলো মাথায় রেখে তদন্ত কাজ শুরু করেছি। প্রকৃত রহস্য এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করব।
তিনি বলেন, অনেক সময় দেখা যায়, অভিযুক্তরা নিজেকে বাঁচানোর জন্য অন্যকে ফাঁসাতে জবানবন্দি দেন। কিন্তু এই মামলার ক্ষেত্রে অভিযুক্ত দুই জন কেউ কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করেননি। দুজনেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়ে জবানবন্দি দিয়েছেন। তারপরও এই ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কী না তা খতিয়ে দেখা হবে।
এর আগে গত রবিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ দাবি করেন, বাসার ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। বলা হয়, ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার রাতে ওই বাড়ির ছাদে উঠে মাদক (ইয়াবা) সেবন করছিল অভিযুক্তরা। বিষয়টি বাড়ির মালিক গণপতি চক্রবর্তী দেখে ফেলায় অপরাধ ঢাকতেই একে একে পরিবারের চার সদস্যকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন তারা। হত্যাকাণ্ডের পর বাড়ির ভেতরেই গোসল করে ফ্রিজ থেকে খাবার খায় এবং শুক্রবার জুমার নামাজের আগে ঘাতকরা সেখান থেকে সটকে পড়েন।
এই বক্তব্যের পর থেকেই হত্যাকাণ্ডের কারণ, পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। নিহত পরিবারের স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা, সচেতন নাগরিক ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকেও অধিকতর তদন্তের দাবি জানানো হয় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশে। এমনকি গ্রেপ্তার দুই তরুণের পরিবারও দু’জন মিলে চারজনকে খুন করার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। এর পেছনে কারা জড়িত তা খুঁজে বের করার দাবি তাদের। এর মধ্যেই মামলার তদন্তভার থানার কাছ থেকে ডিবিতে দেওয়া হলো। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী।
সোমবার বিকালে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জী গোয়েন্দা পুলিশের অফিসে এসে মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের ওসি জিন্নাত আলীর কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত ও নথিপত্র হস্তান্তর করেন। পরে পুরাতন ও নতুন দুই তদন্ত কর্মকর্তাই ঘটনাস্থল মাছুয়াপাড়ায় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি পরিদর্শন করেন। প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলের বিষয়ে ব্রিফ করেন নতুন তদন্ত কর্মকর্তাকে।
ডিবির উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, রবিবার গভীর রাত পর্যন্ত দুই অভিযুক্ত ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। আদালত সূত্রে জানতে পেরেছি পুলিশ কমিশনার স্যার ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের যেটা বলেছেন, দেশবাসীকে যেটা জানিয়েছেন, একই ঘটনা তারা বলেছেন। তারা কিছু কিছু ক্ষেত্রে যুক্তও করেছে, যেটা আমাদের বলেনি।
মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, গোয়েন্দা বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক জিন্নাত আলী এখন এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করার জন্যই তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি ঘটনার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখবেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেবেন।
রংপুর নগরীর কামালকাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশেই গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের বাড়ি। মুগ্ধ দাসের বাড়ি খানিকটা দূরে। তারা নিহত শিক্ষক পরিবারটির পরিচিত মুখ ছিল। শনিবার রাতে মরদেহ উদ্ধারের পর তাদের আটক করে পুলিশ। স্থানীয়রা জানান, গণপতি চক্রবর্তীকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতেন সিদ্ধার্থ। তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীকে ডাকতেন ‘কাকি’ বলে। এতটা কাছের প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তারা।
আজ মঙ্গলবার গণপতি চক্রবর্তীর ওই বাড়ির উঠানে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পাশে বসে স্বজনরা চোখের পানি ধরে রাখতে পাছিলেন না। এসময় কথা হয় নিহত গণপতির বড় ভাই ও হত্যা মামলার বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দুইজন মিলে চারাটা মানুষকে খুন করবে এটা কখনোই সম্ভব নয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী খুন করার পরও ওই বাড়িতে তারা দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করবে, গোসল করবে, খাবে-এটা হতেই পারে না। এর নেপথ্যে বড় কোনো শক্তি কাজ করেছে।’
পুলিশের শুরুর তদন্ত নিয়ে হতাশা কাজ করলেও মামলার তদন্তভার ডিবিকে দেওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন রংপুর জেলার সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, ‘মর্মান্তিক এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। নেপথ্যের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।’