Image description

অভাবের সংসারে আলো ফোটাতে পাড়ি দিয়েছিলেন প্রবাসে। রাশিয়ায় নির্মাণ শ্রমিকের কাজের কথা বলে নিয়ে গেলেও যোগ দিতে হয় যুদ্ধে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ড্রোন হামলার শিকার হয়ে কোমরের নিচ থেকে শক্তি হারান।

চার দিনে ৪ কিলোমিটার পথ বুকের উপর ভর দিয়ে পৌঁছান রাশিয়ান সৈন‍্যদের একটি ক‍্যাম্পে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসায় করা হয় নির্মম নির্যাতন। সেখানে বিনা চিকিৎসায় তিনদিন ফেলে রাখা হয়। তারপর নেওয়া হয় রাশিয়ার নিয়ন্ত্রনাধীন ইউক্রেনের একটি হাসপাতালে।

প্রায় দেড় মাস পর সেখান থেকে রাশিয়ার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবশেষে রাশিয়ার এক চিকিৎসকের সহায়তায় দূতাবাসের মাধ্যমে সম্প্রতি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় গয়েশপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন রাজন হোসেন (২২)।

 
 

নিজের জীবনের এমন জীবনের শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তের কথাগুলো জানান রাজন নিজেই। তিনি উপজেলার গয়েশপুর গ্রামের আব্দুল কাদের কালুর ছেলে। দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বশান্ত এখন রাজনের পরিবার।

 
 

রাজন হোসেন বলেন, চলতি বছরের মে মাসের ৭ তারিখে বাংলাদেশ থেকে মস্কো বিমান বন্দরে যাই। এরপর ৩০ বাংলাদেশিকে বাসে করে মস্কো থেকে ওয়ারেনবার্গ নিয়ে যায়। সেখানে হোটেলে ৩/৪ দিন রাখে আমাদের। ব্যাংক কার্ড, সিম কার্ড ও আকামার কথা বলে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। এরপর কাজের কথা বলে নিয়ে যায় সেনা ক্যাম্পে। সেখানে আমাদের একদিন রাখে। যুদ্ধের বিষয়টি বুঝতে পেরে আমরা যেতে অস্বীকৃতি জানাই।

 

তিনি আরও বলেন, ঈগর ও জুলিয়া নামে রাশিয়ার কোম্পানির দুইজনকে আমরা ৩০ জন পা জড়িয়ে ধরি। কিন্তু তারা কোনো কথা না শুনে সেনাবাহিনীর গাড়িতে করে একটা বাংকারে রাখে। এরপর সেখানে ১ ঘন্টা রাখার পর আমাদের ভাগ করে ফেলে। আমি ৬ জনের একটি গ্রুপে ছিলাম। পরে আমাদের রাশিয়া সেনাবাহিনীর পোশাক, অস্ত্রসহ যুদ্ধের সবকিছু দেয়। সেখানে ২১ দিন প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর আমরা ফ্রন্ট লাইনে যুদ্ধ করতে যায়।

তিনি জানান, প্রথম দিনেই ১৭ জন বাংলাদেশি ড্রোন হামলায় মারা যায়। ওইদিনই একটি ড্রোন তার কোমর বরাবর আঘাত করলে তিনি মাঠিতে লুটিয়ে পড়েন। এরপর কোমরের নিচ থেকে আর শক্তি পাচ্ছিলেন না। উঠে দাঁড়ানোর সক্ষমতা ছিল না। চার দিনে ৪ কিলোমিটার পথ বুকের উপর ভর দিয়ে রাশিয়ান সৈন‍্যদের একটি ক‍্যাম্পে পৌঁছান।

এরমধ্যে দুজন রাশিয়ার সেনার কাছে পানি চাইলেও তারা দেয়নি। বরং ফিরে আসায় ক্যাম্পের কমান্ডার মারধর করেছে। উপরে ড্রোন, নিচে মাইন আর সামনে ইউক্রেনের সেনা। সেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা একদমই ভালো ছিল না।

এরপর ইউক্রেন থেকে রাশিয়ার একটি হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ দিন পর একজন ডাক্তার তাকে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিয়ে যায়। এরপর ২১ আগস্ট সে ট্রাভেল পাস নিয়ে পরিবার থেকে টাকা পাঠানোর পর টিকিট কেটে ইথুপিয়া এয়ারলাইন্সে বাংলাদেশে আসেন। বাংলাদেশের জাবাল-ই-নূর রিক্রুটিং এজেন্সি আমাদেরকে রাশিয়ার প্রো-টেকনোলজির কাছে পাঠায়।

রাজনের বাবা আব্দুল কাদের বলেন, ধার-দেনা করে ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম একতারপুর গ্রামের লেন্টু হোসেনের কাছে। ৩ বছর ঘুরিয়ে গত মে মাসে শ্রমিকের কাজের কথা বলে আমার ছেলেকে প্রতারণা করে রাশিয়ায় যুদ্ধে পাঠায়। আমার ছেলে যুদ্ধে আঘাত পেয়ে দেশে ফিরেছে। ছেলেকে চিকিৎসা করাবো, সেই অর্থ এখন আমার কাছে নেই। আমার ছেলের সঙ্গে যারা এমন কাজ করেছে; তাদের শাস্তি চাই।

রাজনের মা মাহফুজ বেগম বলেন, আমার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সংসারের অভাবের কারণে বড় ছেলেকে বিদেশে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার সেই সুস্থ ছেলে এখন হাটতে পারে না। পরের কাছে সাহায্য চেয়ে এখন দিন চলছে। কিভাবে সংসার চালাবো সেই দুশ্চিন্তায় আছি।

কলেজ শিক্ষক মুসা করিম বলেন, ‘ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন আব্দুল কাদের। দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বশান্ত হয়ে গেছে পরিবারটি। খুবই অসহায় হয়ে পড়েছে।’ এসব দালালদের দ্রুতই আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

তবে কোনো প্রতারণা করেননি দাবি করে আবু তাহের লেন্টু বলেন, ‘আমার ভাগ্নে সোহেলের মাধ্যমে রাজনকে পাঠানো হয়েছিল। সরকারিভাবে তাকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়।’

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, ‘দালালের খপ্পরে পড়ে যেন কেউ এমন প্রতারণার শিকার না হয় সে ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে।’

এছাড়া রাশিয়া থেকে ফিরে আসা রাজনের পাশে উপজেলা প্রশাসন থাকবে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।