গতকাল বাংলাদেশের শীর্ষ স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে শিরোনাম হয়েছে, "৯৫ কারখানা, কাজ হারিয়েছেন ৬২ হাজার শ্রমিক"।
এরকম কয়েকটি শিরোনাম নিচে তুলে ধরা হলো:
দৈনিক ইত্তেফাক-- "ছয় মাসের অর্থনৈতিক পর্যালোচনা সিপিডির বন্ধ হয়েছে ৯৫ কারখানা, কাজ হারিয়েছেন ৬২ হাজার শ্রমিক"।
যমুনা টিভি-- "সরকারের ৬ মাসের অর্থনৈতিক পর্যালোচনা: তিন শিল্পাঞ্চলে কর্মহীন ৬২ হাজার শ্রমিক: সিপিডি"।
নিউ এইজ-- "95 factories shut, nearly 62,000 jobs lost in eight months"।
বণিক বার্তা-- "সিপিডির মিডিয়া সংলাপ জানুয়ারি-আগস্টে বন্ধ হয়েছে ৯৫ কারখানা, চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ৬২ হাজার"।
একইরকম শিরোনামে খবরটি প্রকাশিত হয়েছে আরও যেসব সংবাদমাধ্যমে সেগুলো হলো: বাংলা ট্রিবিউন (আর্কাইভ), ঢাকা ট্রিবিউন (আর্কাইভ), জাগোনিউজ (আর্কাইভ), একাত্তর টিভি (আর্কাইভ), নিউজ ২৪ (আর্কাইভ), দেশ রূপান্তর (আর্কাইভ), সময়ের আলো (আর্কাইভ), টাইমস অব বাংলাদেশ (আর্কাইভ), ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি (আর্কাইভ), সময় টিভি (আর্কাইভ), বাংলাদেশ প্রতিদিন (আর্কাইভ), আজকের পত্রিকা, বাংলা নিউজ২৪ (আর্কাইভ), ইনকিলাব (আর্কাইভ), চ্যানেল ২৪ (আর্কাইভ), এটিএন নিউজ, সংগ্রাম (আর্কাইভ), নিউজ বাংলা (আর্কাইভ), বাংলা ভিশন (আর্কাইভ), মাছরাঙ্গা টিভি, ঢাকা প্রকাশ (আর্কাইভ), ঢাকা মেইল (আর্কাইভ), আলোকিত বাংলাদেশ (আর্কাইভ), ফেস দ্য পিপল (আর্কাইভ), নিউজজি২৪ (আর্কাইভ), দৈনিক এদিন (আর্কাইভ), দৈনিক আজাদী (আর্কাইভ), একুশে সংবাদ (আর্কাইভ)।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বন্ধ হওয়া কারখানার তালিকাকে বর্তমান সরকারের বলে প্রচার
দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিবেদনের ভেতরে লেখা হয়েছে, "বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক চিত্রে বৈপরীত্য ফুটে উঠেছে। অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে প্রবাসী আয় ও রিজার্ভসহ ১২টি খাতে অগ্রগতি অর্জিত হলেও, মূল্যস্ফীতি ও মাথাপিছু ঋণসহ বাকি ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে অবনতি হয়েছে। জানুয়ারির পর থেকে এ পর্যন্ত প্রধান তিনটি শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি শিল্প-কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। কাজ হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন।"
এখানকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা হলো, ৯৫টি শিল্প-কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া এবং ৬১ হাজার ৮৮১ জনের চাকরি হারানো।
এই দুটি সংখ্যা সিপিডির বরাতে বাকি সব সংবাদমাধ্যমের খবরেও এসেছে। এবং এই বন্ধ হওয়া ও চাকরিহীন হওয়ার সময়কাল বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত; যার এক মাস ব্যতিত পুরোটা সময় বর্তমান বিএনপি সরকারের অধীনে।
কিন্তু কাকতালীয়ভাবে বন্ধ হওয়া কারখানার এবং চাকরিহীনতার হুবহু এই দুটি সংখ্যা (৯৫ এবং ৬১৮৮১) ২০২৫ সালের ৫ মার্চ দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে পাওয়া যায় এবং সেখানে সময়কাল হিসেবে বলা হয়েছে, "বিগত ৭ মাসে"।
অর্থাৎ, প্রথম আলো ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ এর ফেব্রুয়ারি-- এই ৭ মাসে শিল্প-কারখানা বন্ধ ও চাকরিহীন হওয়া মানুষের পরিসংখ্যান তাদের প্রতিবেদনে তুলে ধরেছিল এভাবে: "বিগত সাত মাসে গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। ... শিল্প পুলিশ জানায়, বন্ধ হওয়া কারখানার মধ্যে গাজীপুরে রয়েছে ৫৪টি, নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীতে ২৩টি ও সাভার-আশুলিয়ায় ১৮টি। এসব কারখানায় ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করতেন। বেকার শ্রমিকেরা প্রায়ই কারখানা খুলে দেওয়া ও বকেয়া পাওনার দাবিতে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছেন। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।"
এদিকে গতকাল সোমবার (২৪ আগস্ট) বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)’ ‘সরকারের ছয় মাস :একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপের আয়োজন করে। এতে একটি গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়।
সেই রিপোর্টের Industry and Trade সেকশনে বলা হয়েছে, "Between January and August 2026, 95 factories permanently shut down across three major industrial belts (Gazipur, Savar–Ashulia, and Narayanganj–Narsingdi), resulting in 61,881 direct job losses."
অর্থাৎ, জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে তিনটি প্রধান শিল্পাঞ্চল—গাজীপুর, সাভার–আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ–নরসিংদীতে—৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে সরাসরি ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মী চাকরি হারিয়েছেন।
অনুষ্ঠানে সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য একই পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, "২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়েছে বিশেষ করে এইটা হলো গাজীপুর সাভার আশুলিয়া নারায়ণগঞ্জ নরসিংদী এলাকাতে। এবং প্রায় ৬২ হাজার মানুষ কাজ হারিয়েছে বলে আমাদের হিসাব।"
দেড় বছর আগে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত পরিসংখ্যান কীভাবে সিপিডির বর্তমান পরিসংখ্যানের সাথে হুবহু মিলে গেল সে বিষয়ে দ্য ডিসেন্টের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল সংস্থাটির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের কাছে। তিনি বিস্তারিত শুনে "আমি ঢাকার বাইরে আছি" বলে ফোন কেটে দেন।
এরপর সিপিডির এডিশনাল রিসার্চ ডিরেক্টর তৌফিকুল ইসলাম খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তারা ঢাকা ট্রিবিউনের একটি রিপোর্ট থেকে তথ্যটি নিয়েছেন। এবং ঢাকা ট্রিবিউনের ওই রিপোর্টের লিংক শেয়ার করেন প্রতিবেদকের সাথে।
গত ২২ আগস্ট ঢাকা ট্রিবিউনের প্রকাশিত প্রতিবেদনটির শিরোনাম "Energy, work order deficits shut 457 factories down in 2 years"।
প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, "Between January and August 2026, 95 factories permanently shut down across three major industrial belts (Gazipur, Savar–Ashulia, and Narayanganj–Narsingdi), resulting in 61,881 direct job losses."
অর্থাৎ, বন্ধ হওয়া কারখানা এবং চাকরিহীন মানুষের সংখ্যাটি চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ের বলা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনটির লেখক গোলাম মাওলা। দ্য ডিসেন্ট এর পক্ষ থেকে তার সাথে যোগাযোগ করা হলে জানান, তিনি মূলত বাংলা ট্রিবিউনের জন্য প্রতিবেদন করেছিলেন। সেখান থেকে অনুবাদ করে ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশ করা হয়েছে।

উল্লিখিত পরিসংখ্যানগুলো কি চলতি বছরের নাকি ২০২৪/২৫ সালের, এমন প্রশ্নের জবাবে গোলাম মাওলা বলেন, "বাংলা ট্রিবিউনে আমার রিপোর্টে স্পষ্টভাবে বলা আছে এই পরিসংখ্যান ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে পরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭ মাসের। ঢাকা ট্রিবিউনের অনুবাদের সময় কোনোভাবে ভুলটা হয়েছে।"
দ্য ডিসেন্ট বাংলা ট্রিবিউনের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনটিতে যাচাই করে দেখেছে সেখানে উক্তি পরিসংখ্যানকে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের তথ্যেও ভুল
সিপিডির গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বর্তমান মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ৫৫, ১৩০ ডলার বা ৬৭ লক্ষ টাকার বেশি।
কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৭০০ ডলার বা ৮৫ হাজার টাকার কিছু বেশি।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সিপিডির এডিশনাল রিসার্চ ডিরেক্টর তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, "এটা আসলে ভুল হয়েছে। টাকার পরিবর্তে ডলার সাইন ব্যবহৃত হয়েছে রিপোর্টে।"